চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি :
ভারতের মাওলানা সাদ সাহেবের বাংলাদেশে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থিদের ইজতেমা আয়োজনের অনুমতি না দেওয়াসহ ৯ দফা দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ঐতিহাসিক আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া বাবুনগর মাদ্রাসায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় হেফাজতের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে এসব দাবি জানানো হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল, স্থানীয় সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমান।
হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব সাজিদুর রহমানের দেওয়া অভিনন্দনপত্রে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
অভিনন্দনপত্রে বলা হয়, ‘‘বিপ্লব, ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক রাহবার ও উলামায়ে কেরামের স্মৃতিবিজড়িত চট্টগ্রাম জেলার ঐতিহাসিক জনপদ ফটিকছড়ির বাবুনগর পুণ্যভূমিতে’ প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে উলামায়ে কেরাম ও জনগণের পক্ষ থেকে তাকে ‘প্রাণঢালা মহব্বত ও আন্তরিক মোবারকবাদ’’।
এতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও সাবেক আমির আল্লামা হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরী এবং ‘ইসলাম ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে আত্মত্যাগী সকল শহীদকে’ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
অভিনন্দনপত্রে বলা হয়, ফটিকছড়ি শুধু ভৌগোলিকভাবে গঠিত কোনো এলাকা নয়; এটি দেশের দ্বীনি শিক্ষা, ইসলামি সংস্কার ও আধ্যাত্মিক সাধনার একটি ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র। বাবুনগর মাদরাসা ও আশপাশের দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে আলেম গঠন, বিশুদ্ধ আকিদা চর্চা ও সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রেখে আসছে।
বিশেষ করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এবং বর্তমান আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর মতো প্রবীণ ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে এ অঞ্চলটি সমকালীন ইসলামি অন্যতম প্রধান মারকাজ হিসেবে স্বীকৃত বলে উল্লেখ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে ‘এই অঞ্চলের ইতিহাস ও রাজনৈতিক পরিক্রমায় এক নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অভিনন্দনপত্রে আরও বলা হয়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, জুলাই বিপ্লব, ২০১৩ সালের ‘নাস্তিক্যবাদবিরোধী লড়াই’, বাঙালি মুসলিম সমাজের ধর্মীয় চেতনা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামে আলেম সমাজের ভূমিকা সুদৃঢ় ও অবিচল ছিল।
এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়, তিনি সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলার ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস সংযোজন করে জাতীয় রাজনৈতিক ধারায় ইসলামি মূল্যবোধকে সম্মানের স্থানে বসিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী (প্রয়াত) বেগম খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গও উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, তিনি এদেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক সমমর্মিতা প্রদর্শন করেছেন। বিশেষ করে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার সমর্থন ও সহমর্মিতার কথা আলেম সমাজ গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে বলেও উল্লেখ করা হয়।
অভিনন্দনপত্রে বলা হয়, ‘শহীদ জিয়া পরিবারের সঙ্গে এদেশের আলেমসমাজ ও তৌহিদী জনতার এই যে আত্মিক ও নৈতিক বন্ধন, তা কেবল রাজনীতির সমীকরণে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক সুদৃঢ় প্রাচীর।’
হেফাজতের ৯ দাবি
১. মহান আল্লাহ, রাসুল (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস করা।
২. কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস না করা।
৩. ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে রাতের আঁধারে নৃশংস গণহত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা। ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের নারকীয় হত্যাযজ্ঞে জড়িত, হুকুমের আসামি ও খুনিদের বিচার নিশ্চিতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ন্যায়বিচার কায়েম করা।
৪. দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করার মাধ্যমে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য দেশ-বিদেশের সর্বত্র কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মোচন করা। বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে সরকারি মাদরাসার ডিগ্রির পাশাপাশি কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্সের সমমান) ডিগ্রির উল্লেখ করা।
৫. শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
৬. চরম দ্বীন বিকৃতিকারী কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা ও হিজবুত তাওহিদকে নিষিদ্ধ করা।
৭. পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি মিশনারিগুলোর ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বন্ধ করা।
৮. আলেমদের বিরুদ্ধে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ের মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার করে এদেশের আলেম-ওলামাকে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে অংশীদার করা।
৯. বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম ও টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছে। ভারতের বিতর্কিত মাওলানা সাদ সাহেবের বাংলাদেশে আগমনে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থীদের ইজতেমার অনুমতি না দেওয়া।
অভিনন্দনপত্রের শেষে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর ফটিকছড়ি সফর ‘কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সফর নয়; এটি দ্বীন ও রাষ্ট্রের মেলবন্ধনের এক অনন্য স্মারক।’ তার এই ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও আলেম সমাজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দেশের তৌহিদী জনতাকে একতাবদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করবে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সফর সফল, ফলপ্রসূ ও নিরাপদ হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা হয়। একই সঙ্গে তাকে নেক হায়াত, সহিহ সালামাত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তৌফিক দেওয়ার পাশাপাশি তার নেতৃত্বে বাংলাদেশকে ‘একটি স্বাবলম্বী, ন্যায়ভিত্তিক ও নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান রাষ্ট্র’ হিসেবে গড়ে তোলার হিম্মত দানের জন্য দোয়া করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি 




















