রংপুর জেলা প্রতিনিধি :
বিরোধী দল হাসিনার ভাষায় কথা বলছে বলে মন্তব্য করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিরোধী দল আগের মতো ভূমিকা পালন করে হাসিনার ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে। তারা সব সংকটের এখনই সমাধান চান। জনগণের মেজরিটি ম্যান্ডেট পাওয়া দল বিএনপি। সরকার দেশ চালাতে ব্যর্থ হলে তারপর কথা বলবেন।
রোববার (৯ জুলাই) দুপুরে রংপুরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চ্যারিটি সংস্থা লাভ শেয়ার বিডির আয়োজনে সুবিধাবঞ্চিতদের স্বাবলম্বীকরণ প্রকল্পের আওতায় চা-ঘর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আমাদের যে বিরোধী দল আছে, তারা আগের মতো ভূমিকা পালন করে হাসিনার ভাষায় কথা বলছে— চলতে দেবো না, কাজ করতে দেবো না। দেশের অনেক সমস্যা আছে। তা চার-পাঁচ মাসে সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
বিরোধীদল জামায়াত ও এনসিপির নাম উল্লেখ না করেই বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘তাদের ভাষা, এই মুহূর্তে সব সমস্যার সমাধান করে দিতে হবে।’ দেশে গ্যাসের সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ১৭ বছর ক্ষমতায় ছিল। তারা কোনো গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। আমরা কাজ শুরু করেছি।
তিনি বলেন, দিনাজপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমরা তা চালু করেছি। গ্যাসের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিদেশ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে তেল ও গ্যাস আমদানি করছি। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের কারণে আমাদের চার বিলিয়ন ডলার ক্ষতি করে আমদানি করতে হয়েছে। আমরা দ্রুত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে ছাত্র, নারী, শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ১৭ বছরে লাখ লাখ মামলা, গুম, হাজার হাজার খুন করা হয়েছে। এ ছাড়া আমেরিকা ও ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশে প্রায় চার বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। এ কারণে ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে।
এসময় গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে মির্জা ফখরুল বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে লিখতে না পারলেও এখন সত্য-মিথ্যা সবই লিখতে পারছেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা কালে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এখন দেখবেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এসবের কান না দেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানাই।’
তিনি বলেন, ‘মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে আমরা ওয়াদাবদ্ধ। জনগণের কাছে আমরা যেসব ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছি।’
রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের মানুষ বিদেশে যেতে চান না মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘লন্ডনে ১২ হাজারেরও বেশি রেস্টুরেন্ট আছে। সেখানে সিলেট অঞ্চলের মানুষ কাজ করছেন। কানাডাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নোয়াখালী, কুমিল্লা, কক্সবাজার, ফেনীসহ দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ কাজ করছেন। তাই ওই এলাকার মানুষ আর্থিকভাবে অনেক সচ্ছল। আর আমাদের এ অঞ্চলের মানুষ বিদেশে যেতেই চান না।’
তিনি বলেন, ‘আমার বাবা আমাদের এলাকায় নিউ মার্কেট নির্মাণ করেছিলেন। এলাকার লোকজনকে বলেছেন, দোকান কিনে ব্যবসা করার জন্য। অথচ তারা বলেছিল, আমরা দোকানদারি কেন করব। অথচ ওই সময় নোয়াখালী ও মুন্সিগঞ্জের লোক সুপার মার্কেটে দোকান করে তারা এখন ঠাকুরগাঁওয়ে সবচেয়ে ধনী হয়ে গেছে। আর আমাদের এলাকার লোকজন জমি বিক্রি করে সর্বস্বান্ত।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উত্তরাঞ্চলের মানুষ, তাঁর মা দেশনেত্রী খালেদা জিয়া এ অঞ্চলের মানুষ, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাড়ি বগুড়ায়। আমাদের সকলকে এ অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে হবে।’
রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান শামুকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘তাঁর উদ্যোগে আজকের এই আয়োজন। তিনি সকলকে রংপুর বিভাগের উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের নেতা তারেক রহমান নির্বাচনের সময় যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার সবগুলো বাস্তবায়ন করা শুরু করেছেন। ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। কৃষকদের কৃষি কার্ড দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের কৃষিঋণ বাবদ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি সীমাহীন নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘১৭ বছর ক্ষমতায় থাকা কালে আমাদের নেতা-কর্মীদের নামে ৬০ লাখ মামলা দিয়ে কারাগারে আটক করে রেখেছে লাখ লাখ নেতা-কর্মীকে। ২ হাজার ৭০০ নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে ৪ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘তারেক রহমান দেশে ফিরে বলেছিলেন, আমার একটা পরিকল্পনা আছে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছেন। নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের সময় যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তিন বছরের মধ্যে সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে।’
সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, একটি পরিবারকে দীর্ঘদিন সহায়তা দেওয়ার চেয়ে সেই পরিবারকে আয় করার সুযোগ করে দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ‘চা-ঘর’ প্রকল্পের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলো নিজেরাই আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। এ ধরনের উদ্যোগ দেশের প্রান্তিক মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
চ্যারিটি সংস্থা লাভ শেয়ার বিডির ‘চা ঘর’ হস্তান্তর অনুষ্ঠানের সাফল্য কামনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, তারা সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছেন। পরে তিনি ২৫ জনকে চায়ের দোকান হস্তান্তর করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনছারী, রংপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান শামু, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেজেকা সুলতানা ফেন্সি, জেলা প্রশাসক রুহুল আমিনসহ বিশিষ্ট নাগরিকেরা। সভাপতিত্ব করেন চ্যারিটি সংস্থা লাভ শেয়ার বিডির পরিচালক জাহিদ খান।
রংপুর জেলা প্রতিনিধি 





















