নিজস্ব প্রতিবেদক :
শিশুদের সু-স্বাস্থ্যের জন্য মায়ের বুকের দুধের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
শনিবার (১ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
মায়ের দুধ পানে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আল্লাহ তায়ালা মায়ের দুধকে দুনিয়ার সেরা প্রোটিন হিসেবে তৈরি করেছেন। প্রথম ৪-৫ মাস একটি শিশুর বৃদ্ধির মূল উৎসই মায়ের দুধ। প্রসবের পরপরই শিশুকে শালদুধ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যা প্রোটিনের সর্বোচ্চ ভান্ডার। কোরআনসহ সকল ধর্মেও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মায়ের দুধ খাওয়ানোর কথা বলা হয়েছে। অথচ বর্তমানে সিজারিয়ানের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া এবং সচেতনতার অভাবে অনেক শিশু শালদুধ ও মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, অতীতে মানুষের জীবনযাত্রা ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু শিশুদের প্রতি ভালোবাসা ও যত্ন ছিল অকৃত্রিম। বর্তমানে শিক্ষিত ও বিত্তবান সমাজে শিশুদের প্রতি যত্ন অনেকটাই অনুপস্থিত।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে অনেক নবজাতক প্রয়োজনীয় মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের জন্য উদ্বেগজনক।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অতীতে পরিবারে শিশুর লালন-পালন এবং মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করার বিষয়ে যে সচেতনতা ও গুরুত্ব ছিল, আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চর্চা অনেক ক্ষেত্রে কমে এসেছে। জন্মের পরপরই নবজাতককে মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে রাখা, কর্মব্যস্ততা এবং পরিবর্তিত জীবনধারার কারণে অনেক মা তাঁর শিশুকে প্রয়োজনীয় সময় মাতৃদুগ্ধ পান করাতে পারছেন না।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমরা আধুনিক হয়ে যাওয়ার কারণে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নবজাতকের জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই শালদুধ পান নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, মায়ের দুধ শিশুর সর্বোত্তম ও প্রাকৃতিক খাদ্য। এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি, শারীরিক বৃদ্ধি এবং মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি মায়ের স্নেহ, স্পর্শ ও মাতৃদুগ্ধ শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের অন্যতম ভিত্তি। পরিবারে অশান্তি, অবহেলা কিংবা শিশুকে দীর্ঘসময় মায়ের কাছ থেকে দূরে রাখার নেতিবাচক প্রভাব শিশুর আচরণ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ে।
সাম্প্রতিক হাম (মিজলস) পরিস্থিতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, অপুষ্টির কারণে অনেক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে বেশি রয়েছে। মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করা গেলে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে এবং সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়বে। অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড গ্রহণ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং সুষম খাদ্যের অভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে শিশুর খাদ্য হিসেবে মায়ের দুধের পরিবর্তে বাজারজাত বিকল্প খাদ্যের ওপর অতিনির্ভরশীলতা কমানোর আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালনের মধ্যে সচেতনতা কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। সারা বছর জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এ লক্ষ্যে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেন তিনি। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সুস্থ, সক্ষম ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
মায়েদের উদ্দেশ্যে আবেগঘন অনুরোধ জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, মহান আল্লাহর দেওয়া মাতৃদুগ্ধের নিয়ামত থেকে যেন মায়েরা তাদের সন্তানদের কোনোভাবেই বঞ্চিত না করেন। মা যখন শিশুকে বুকে টেনে নেন, শিশু তখনই তার পরম নিরাপত্তায় কান্না থামায়। তাই কৃত্রিম বিকল্পের দিকে না গিয়ে শিশুদের প্রকৃতির এই স্বাভাবিক উপহার দেওয়া উচিত। একটি সুন্দর, সুস্বাস্থ্য ও শক্তিশালী শিশুগোষ্ঠী গড়ে তোলাই হোক আজকের দিনের প্রধান শপথ, যারা ভবিষ্যতে দেশের হাল ধরবে।
‘জীবনের সূচনায় মাতৃদুগ্ধ পান: টেকসই উদ্যোগ করি বেগমান’ প্রতিপাদ্যে মাতৃদুগ্ধ পান বাড়াতে সচেতনতা জন্য এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগ) শেখ মোমেনা মনি ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 











