চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি :
গত ১৫ বছরে অপরিকল্পিতভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা, দুর্নীতি এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি অচল অবস্থায় পড়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
শনিবার (১ অগাস্ট) দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) মিলনায়তনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সভায় আরও বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
তিনি বলেন, গত দেড় দশকে স্বাস্থ্যখাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও পরিকল্পনার অভাব ও দুর্নীতির কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলেনি। শত শত কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হলেও সেগুলোর অধিকাংশই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কোনো হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় ১০ বছর আগে কেনা যন্ত্রের মোড়কও খোলা হয়নি। কোথাও যন্ত্র আছে, কিন্তু চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নেই। আবার কোথাও যন্ত্র থাকলেও রিএজেন্ট বা এক্স-রে প্লেটের অভাবে তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যখাতের সংকট কেবল ভবন নির্মাণ বা নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা। চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সমন্বিত টিম ছাড়া আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সরকার দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১০১ শয্যায় উন্নীত করার মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে বলে জানিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। হাসপাতালগুলোর আধুনিক ডিজাইন ও ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের ৭৫ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করেন এবং তাদের প্রাথমিক ভরসা এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো। আগে জেলা পর্যায়ে যে সেবাগুলো মিলত, তার সিংহভাগই এখন এই ১০১ শয্যার উপজেলা কমপ্লেক্সগুলোতে নিয়ে আসা হবে। এছাড়া আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতের বাজেট জিডিপির ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘শিশুদের বিশেষায়িত সেবার জন্য দেশের পাঁচটি শহরে পাঁচটি নতুন শিশু হাসপাতাল এবং নারী স্বাস্থ্যের জন্য পৃথক ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া নগর স্বাস্থ্যকে এখন সিটি করপোরেশন থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মূল কাঠামোর অধীনে এনে পুনর্গঠন করা হচ্ছে।’
বিগত সময়ের অনিয়ম তুলে ধরে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিকল্পনা ছাড়া শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, যা বহু জায়গায় অব্যবহৃত পড়ে আছে। সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এই অপচয় বন্ধ করা হবে।
চিকিৎসকদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ১০ জন করে আনসার বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের উদাহরণ তুলে ধরে ড. মুহিত বলেন, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ২০০ অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের পদ শূন্য রয়েছে। এই সংকটের মধ্যেই প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন, যেখানে হাসপাতালের ধারণক্ষমতা মাত্র ২ হাজার ২০০। একইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে বেসিক সায়েন্সের শিক্ষকেরও তীব্র সংকট রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে চায়। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা কথার ফুলঝুরি নয়, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান করতে চায় সরকার। বিগত প্রায় ২০ বছর ধরে এই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো যে অবহেলার শিকার হয়েছে, দেশের জনগণ যে বঞ্চনার শিকার হয়েছে, সব সেক্টরে, সব প্রতিষ্ঠানে যে সংকট তৈরি করা হয়েছে, সেই পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধানে সরকার কাজ করছে।’
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ৫ মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদ, আমরা দিনরাত নিরলসভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছি কীভাবে দেশের মানুষকে একটু স্বস্তি দেওয়া যায়, দেশের মানুষের জন্য একটু ভালো কিছু করা যায়। তার মধ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সে কারণে এবারের বাজেটে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ স্বাস্থ্যখাতে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আপনার দেখেছেন, সরকার গঠনের প্রথম দিন থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকাল ৯টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করছেন, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ এবং সরকারি কর্মকর্তারাও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে সময় মতো সরকারি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন। আমাদের এই সরকার পুরোনো ধারার যে রাজনীতি, বক্তব্য রাখার যে রাজনীতি সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে। যারা নতুন বন্দোবস্তের কথা বলেন, আমরা তাদের উদ্দেশে বলতে চাই-এটাই নতুন বন্দোবস্ত এবং নতুন বাংলাদেশের পথচলা।’
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ঐতিহ্যবাহী একটি প্রতিষ্ঠান, এটি বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল কলেজে ৫০টির মতো অধ্যাপক পদ এবং সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক পদে আরও ১৫০টি পদ শূন্য রয়ে গেছে। এটা দীর্ঘদিনের অবহেলার একটি চিত্র। আমাদের স্বাস্থ্য সমস্যাটা সামগ্রিক দিক থেকে দেখতে হবে।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কামটির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান।
চট্টগ্রাম মেডিকেলের কিডনি রোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. ফয়েজুর রহমানের সঞ্চালনায় সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন হৃদরোগ বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইফতেখারুল ইসলাম।
অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন, কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. আবদুর রব, সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মাসুদ করিম, হৃদরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. ইব্রাহিম চৌধুরী, কলেজের ৬৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম ইমন, ৩৬তম ব্যাচের (বিডিএস) শর্মী বড়ুয়া, ৬৪তম ব্যাচের মোহাম্মদ নাজমুল সাকিব।
মতবিনিময় সভায় মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবি দাওয়া তুলে ধরেন। তারা চট্টগ্রামের একটি পূর্ণাঙ্গ ডেন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা এবং চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘চিকিৎসক নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়নের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রতিমন্ত্রী তাদের বক্তব্য ধৈর্য সহকারে শোনেন এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
মতবিনিময় সভা শেষে প্রতিমন্ত্রী চমেক হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি রোগী ও তাদের স্বজনদের সাথে কথা বলেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি 


















