রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে কেপ ভার্দের বিপক্ষে কষ্টার্জিত জয়ে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা

  • স্পোর্টস ডেস্ক
  • প্রকাশের সময় : ১১:৫৬:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
  • ১৮৪ জন দেখেছেন

স্পোর্টস ডেস্ক : 

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে এমন কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে, ম্যাচের শুরুতে হয়তো খুব কম মানুষই ভেবেছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া কেপ ভার্দে লিওনেল মেসিদের ১২০ মিনিটের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চাপে রেখে ইতিহাস গড়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় ও রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলোয় জায়গা নিশ্চিত করেছে লিওনেল স্কালোনির দল।

শনিবার (৪ জুলাই) ভোরে মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্জেন্টিনার। তবে কেপ ভার্দের শক্ত রক্ষণ ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবলের কারণে সহজে গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা।

৬০ শতাংশের বেশি সময় পজেশন রেখে গোলের জন্য ২২ শট নিয়ে ১০টি লক্ষ্যে রাখতে পারে আর্জেন্টিনা। আর কেইপ ভার্ডের ১৬ শটের পাঁচটি ছিল লক্ষ্যে।

ম্যাচের শুরু থেকেই কেপ ভার্দে রক্ষণে অসাধারণ শৃঙ্খলা দেখায়। নিজেদের বিশ্বকাপ অভিষেকেই নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়া আফ্রিকার দলটি প্রথম ১৫ মিনিটে আর্জেন্টিনার আক্রমণকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে। এমনকি ম্যাচের প্রথম উল্লেখযোগ্য সুযোগটিও আসে কেপ ভার্দের পক্ষে। সপ্তম মিনিটে রায়ান মেন্ডেসের কাট-ইন থেকে নেওয়া শট নাহুয়েল মোলিনার গায়ে লেগে এমিলিয়ানো মার্তিনেজের হাতে চলে যায়।

আর্জেন্টিনা প্রথমদিকে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পাচ্ছিল না। চলতি বিশ্বকাপে প্রথম ১০ মিনিটে আলবিসেলেস্তেদের এটি ছিল মাত্র দ্বিতীয় শটের ম্যাচ। প্রথমদিকে মেসিকেও খেলায় খুব বেশি সম্পৃক্ত করতে পারেনি লিওনেল স্কালোনির দল। ১৫ মিনিটে অবশ্য রদ্রিগো ডি পলের পাস থেকে থিয়াগো আলমাদার চমৎকার কাটব্যাক পেয়ে সুযোগ তৈরি করেন মেসি। দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে নেওয়ার পর তার শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

১৭ মিনিটে জোভানে কাবরালের ফাউলে বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক পায় আর্জেন্টিনা। স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব নেন মেসি। তবে তার বাঁকানো শট নিরাপদেই ধরে ফেলেন ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা।

এই ম্যাচ দিয়ে তিনি চলতি বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে খেলা ৪০ বছরের বেশি বয়সী পঞ্চম ফুটবলার হিসেবে নাম লেখান। এর আগে এই তালিকায় ছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লুকা মদরিচ, এদিন জেকো ও মানুয়েল নয়্যার। ২০২৬ সালের আগে বিশ্বকাপ ইতিহাসে মাত্র দুইজন ৪০ ঊর্ধ্ব খেলোয়াড় নকআউটে খেলেছিলেন- দিনো জফ (১৯৮২) ও পিটার শিলটন (১৯৯০)।

প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে আর্জেন্টিনা ক্রমশ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ়ভাবে নিজেদের হাতে নেয়। ২৬ মিনিটে ডি পলের ক্রসে লওতারো মার্তিনেজকে খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও আক্রমণের চাপ অব্যাহত রাখে তারা।

অবশেষে ২৯ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। লিসান্দ্রো মার্তিনেজের নিখুঁত লম্বা পাস ধরে কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ ভেঙে দৌড়ে যান মেসি। অসাধারণ প্রথম টাচে বল নিয়ন্ত্রণে এনে দ্বিতীয় স্পর্শ ছাড়াই গোলরক্ষক ভোজিনহার পাশ কাটিয়ে বল জড়িয়ে দেন জালে। এই গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।

এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নতুন ইতিহাসও গড়েন মেসি। এটি ছিল নকআউটে তার ১২তম সরাসরি গোল-অবদান (৬ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট), যা ১৯৬৬ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ। তিনি এই কীর্তিতে পেছনে ফেলেছেন ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলে এবং ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপেকে।

শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপে এটি মেসির ২০তম গোল এবং টানা অষ্টম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কৃতিত্বও অর্জন করেন তিনি। চলতি আসরে এটি তার সপ্তম গোল।

গোল হজমের পর কেপ ভার্দে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা চালায়। ৩২ মিনিটে সিডনি কাবরালের দূরপাল্লার শট অনেক বাইরে দিয়ে চলে যায়। এরপর ৪২ মিনিটে জোভানে কাবরাল দারুণ টার্নে মোলিনাকে কাটিয়ে উঠলেও আর্জেন্টিনার রক্ষণ দ্রুত গুছিয়ে গিয়ে সেই আক্রমণ নস্যাৎ করে দেয়।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে আরও কয়েকটি সুযোগ তৈরি করে আর্জেন্টিনা। ৪৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের প্রথম স্পর্শের জোরালো শট দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন ভোজিনহা। যোগ করা সময়েও আর্জেন্টিনা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করে, তবে ব্যবধান আর বাড়াতে পারেনি।

প্রথমার্ধের পরিসংখ্যানও আর্জেন্টিনার আধিপত্যেরই প্রতিফলন। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার মোট ৩৬টি শটের মধ্যে ১৭টিই এসেছে মেসির পা থেকে, অর্থাৎ দলের মোট শটের ৪৭ শতাংশই নিয়েছেন অধিনায়ক। অন্যদিকে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ৬৩ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দে নিজেদের বিশ্বকাপ অভিষেকেই নকআউটে ওঠা সর্বনিম্ন র‌্যাঙ্কিংধারী দল হিসেবে ইতিহাস গড়েছে এবং প্রথমার্ধেও তারা দেখিয়েছে কেন এই পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিরতিতে তাই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও ম্যাচ এখনো পুরোপুরি নিজেদের করে নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। তবে মেসির রেকর্ডগড়া গোল এবং পুরো প্রথমার্ধে বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্কালোনির দলকে দ্বিতীয়ার্ধের আগে আত্মবিশ্বাসী অবস্থানেই রেখেছে।

গোলের পরও আর্জেন্টিনা আধিপত্য বজায় রাখে। এনজো ফার্নান্দেজের দূরপাল্লার শট দারুণভাবে ঠেকান ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। বিরতিতে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই মাঠ ছাড়ে আলবিসেলেস্তেরা।

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের চিত্র পাল্টে যায়। কেপ ভার্দে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ৫৪ মিনিটে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ দুর্দান্ত এক সেভ করে দলকে রক্ষা করেন। কিন্তু ৫৯ মিনিটে আর পারেননি। ডান প্রান্তে রায়ান মেন্দেসের কাটব্যাক থেকে ডেরয় দুয়ার্তে কঠিন কোণ থেকেও জোরালো শটে বল জালে পাঠিয়ে সমতা ফেরান।

সমতায় ফেরার পর আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণ চালায়। ৬২ মিনিটে লওতারো মার্টিনেজের পাস থেকে মেসির কাছ থেকে নিশ্চিত গোল বাঁচান ভোজিনহা। ৭২ মিনিটে মেসির দুর্দান্ত ফ্রি-কিকও অসাধারণ দক্ষতায় কর্নারের বিনিময়ে ফিরিয়ে দেন কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। শেষ দিকে মেসির আরও দুটি প্রচেষ্টা, পারেদেসের দূরপাল্লার শট এবং ম্যাক অ্যালিস্টারের সুযোগও কাজে লাগাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময় ১-১ সমতায় শেষ হয়।

অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই আবার এগিয়ে যায় বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ৯২ মিনিটে কর্নার থেকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ফ্লিকের পর লিসান্দ্রো মার্টিনেজ বল নিয়ন্ত্রণ করে বাঁ পায়ের শক্তিশালী শটে জালের ছাদে বল পাঠিয়ে স্কোর ২-১ করেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে অতিরিক্ত সময়ের তৃতীয় দ্রুততম গোল এটি।

তবে কেপ ভার্দে আবারও অবিশ্বাস্যভাবে ফিরে আসে। ১০৩ মিনিটে সিডনি লোপেজ ক্যাবরাল বাম দিক থেকে ভেতরে ঢুকে দূরের কোনায় দুর্দান্ত বাঁকানো শটে এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে কোনো সুযোগ না দিয়ে ম্যাচ ২-২ করেন। গোলটি সহজেই টুর্নামেন্টের সেরা গোলের দাবিদার।

ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছে, তখন ১১১ মিনিটে আসে ভাগ্যনির্ধারক মুহূর্ত। মেসির নেওয়া কর্নার থেকে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর হেড ডিনে বোর্জেসের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়িয়ে যায়। আত্মঘাতী গোল হিসেবে নথিভুক্ত হওয়া এই গোলেই ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।

শেষ মুহূর্তে কেপ ভার্দে আরও একবার সমতায় ফেরার খুব কাছে চলে গিয়েছিল। ১১৬ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে সিডনি ক্যাবরালের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক উড়ে যাচ্ছিল জালের কোণে, কিন্তু এমিলিয়ানো মার্টিনেজ অসাধারণভাবে ঝাঁপিয়ে কর্নারের বিনিময়ে বল ফিরিয়ে দেন। সেটিই হয়ে ওঠে ম্যাচের শেষ বড় সুযোগ।

ম্যাচজুড়ে কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা ছিলেন অসাধারণ। তিনি মোট আটটি সেভ করে আর্জেন্টিনাকে বারবার হতাশ করেন। অন্যদিকে মেসি একাই পাঁচটি শট অন টার্গেটে রাখলেও শেষ পর্যন্ত তার দলকে জয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হয় প্রতিপক্ষের আত্মঘাতী গোলের।

বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা শেষ পর্যন্ত জয় পেলেও এই ম্যাচে কেপ ভার্দে দেখিয়ে দিল, বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা কেবল চমক নয়, বড় দলগুলোর জন্যও ভয়ংকর প্রতিপক্ষ।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

চুয়াডাঙ্গায় আলমসাধুর ধাক্কায় পাখিভ্যানচালকের মৃত্যু

রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে কেপ ভার্দের বিপক্ষে কষ্টার্জিত জয়ে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা

প্রকাশের সময় : ১১:৫৬:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬

স্পোর্টস ডেস্ক : 

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে এমন কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে, ম্যাচের শুরুতে হয়তো খুব কম মানুষই ভেবেছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া কেপ ভার্দে লিওনেল মেসিদের ১২০ মিনিটের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চাপে রেখে ইতিহাস গড়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় ও রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলোয় জায়গা নিশ্চিত করেছে লিওনেল স্কালোনির দল।

শনিবার (৪ জুলাই) ভোরে মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্জেন্টিনার। তবে কেপ ভার্দের শক্ত রক্ষণ ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবলের কারণে সহজে গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা।

৬০ শতাংশের বেশি সময় পজেশন রেখে গোলের জন্য ২২ শট নিয়ে ১০টি লক্ষ্যে রাখতে পারে আর্জেন্টিনা। আর কেইপ ভার্ডের ১৬ শটের পাঁচটি ছিল লক্ষ্যে।

ম্যাচের শুরু থেকেই কেপ ভার্দে রক্ষণে অসাধারণ শৃঙ্খলা দেখায়। নিজেদের বিশ্বকাপ অভিষেকেই নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়া আফ্রিকার দলটি প্রথম ১৫ মিনিটে আর্জেন্টিনার আক্রমণকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে। এমনকি ম্যাচের প্রথম উল্লেখযোগ্য সুযোগটিও আসে কেপ ভার্দের পক্ষে। সপ্তম মিনিটে রায়ান মেন্ডেসের কাট-ইন থেকে নেওয়া শট নাহুয়েল মোলিনার গায়ে লেগে এমিলিয়ানো মার্তিনেজের হাতে চলে যায়।

আর্জেন্টিনা প্রথমদিকে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পাচ্ছিল না। চলতি বিশ্বকাপে প্রথম ১০ মিনিটে আলবিসেলেস্তেদের এটি ছিল মাত্র দ্বিতীয় শটের ম্যাচ। প্রথমদিকে মেসিকেও খেলায় খুব বেশি সম্পৃক্ত করতে পারেনি লিওনেল স্কালোনির দল। ১৫ মিনিটে অবশ্য রদ্রিগো ডি পলের পাস থেকে থিয়াগো আলমাদার চমৎকার কাটব্যাক পেয়ে সুযোগ তৈরি করেন মেসি। দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে নেওয়ার পর তার শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

১৭ মিনিটে জোভানে কাবরালের ফাউলে বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক পায় আর্জেন্টিনা। স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব নেন মেসি। তবে তার বাঁকানো শট নিরাপদেই ধরে ফেলেন ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা।

এই ম্যাচ দিয়ে তিনি চলতি বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে খেলা ৪০ বছরের বেশি বয়সী পঞ্চম ফুটবলার হিসেবে নাম লেখান। এর আগে এই তালিকায় ছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লুকা মদরিচ, এদিন জেকো ও মানুয়েল নয়্যার। ২০২৬ সালের আগে বিশ্বকাপ ইতিহাসে মাত্র দুইজন ৪০ ঊর্ধ্ব খেলোয়াড় নকআউটে খেলেছিলেন- দিনো জফ (১৯৮২) ও পিটার শিলটন (১৯৯০)।

প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে আর্জেন্টিনা ক্রমশ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ়ভাবে নিজেদের হাতে নেয়। ২৬ মিনিটে ডি পলের ক্রসে লওতারো মার্তিনেজকে খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও আক্রমণের চাপ অব্যাহত রাখে তারা।

অবশেষে ২৯ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। লিসান্দ্রো মার্তিনেজের নিখুঁত লম্বা পাস ধরে কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ ভেঙে দৌড়ে যান মেসি। অসাধারণ প্রথম টাচে বল নিয়ন্ত্রণে এনে দ্বিতীয় স্পর্শ ছাড়াই গোলরক্ষক ভোজিনহার পাশ কাটিয়ে বল জড়িয়ে দেন জালে। এই গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।

এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নতুন ইতিহাসও গড়েন মেসি। এটি ছিল নকআউটে তার ১২তম সরাসরি গোল-অবদান (৬ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট), যা ১৯৬৬ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ। তিনি এই কীর্তিতে পেছনে ফেলেছেন ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলে এবং ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপেকে।

শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপে এটি মেসির ২০তম গোল এবং টানা অষ্টম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কৃতিত্বও অর্জন করেন তিনি। চলতি আসরে এটি তার সপ্তম গোল।

গোল হজমের পর কেপ ভার্দে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা চালায়। ৩২ মিনিটে সিডনি কাবরালের দূরপাল্লার শট অনেক বাইরে দিয়ে চলে যায়। এরপর ৪২ মিনিটে জোভানে কাবরাল দারুণ টার্নে মোলিনাকে কাটিয়ে উঠলেও আর্জেন্টিনার রক্ষণ দ্রুত গুছিয়ে গিয়ে সেই আক্রমণ নস্যাৎ করে দেয়।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে আরও কয়েকটি সুযোগ তৈরি করে আর্জেন্টিনা। ৪৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের প্রথম স্পর্শের জোরালো শট দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন ভোজিনহা। যোগ করা সময়েও আর্জেন্টিনা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করে, তবে ব্যবধান আর বাড়াতে পারেনি।

প্রথমার্ধের পরিসংখ্যানও আর্জেন্টিনার আধিপত্যেরই প্রতিফলন। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার মোট ৩৬টি শটের মধ্যে ১৭টিই এসেছে মেসির পা থেকে, অর্থাৎ দলের মোট শটের ৪৭ শতাংশই নিয়েছেন অধিনায়ক। অন্যদিকে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ৬৩ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দে নিজেদের বিশ্বকাপ অভিষেকেই নকআউটে ওঠা সর্বনিম্ন র‌্যাঙ্কিংধারী দল হিসেবে ইতিহাস গড়েছে এবং প্রথমার্ধেও তারা দেখিয়েছে কেন এই পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিরতিতে তাই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও ম্যাচ এখনো পুরোপুরি নিজেদের করে নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। তবে মেসির রেকর্ডগড়া গোল এবং পুরো প্রথমার্ধে বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্কালোনির দলকে দ্বিতীয়ার্ধের আগে আত্মবিশ্বাসী অবস্থানেই রেখেছে।

গোলের পরও আর্জেন্টিনা আধিপত্য বজায় রাখে। এনজো ফার্নান্দেজের দূরপাল্লার শট দারুণভাবে ঠেকান ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। বিরতিতে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই মাঠ ছাড়ে আলবিসেলেস্তেরা।

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের চিত্র পাল্টে যায়। কেপ ভার্দে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ৫৪ মিনিটে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ দুর্দান্ত এক সেভ করে দলকে রক্ষা করেন। কিন্তু ৫৯ মিনিটে আর পারেননি। ডান প্রান্তে রায়ান মেন্দেসের কাটব্যাক থেকে ডেরয় দুয়ার্তে কঠিন কোণ থেকেও জোরালো শটে বল জালে পাঠিয়ে সমতা ফেরান।

সমতায় ফেরার পর আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণ চালায়। ৬২ মিনিটে লওতারো মার্টিনেজের পাস থেকে মেসির কাছ থেকে নিশ্চিত গোল বাঁচান ভোজিনহা। ৭২ মিনিটে মেসির দুর্দান্ত ফ্রি-কিকও অসাধারণ দক্ষতায় কর্নারের বিনিময়ে ফিরিয়ে দেন কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। শেষ দিকে মেসির আরও দুটি প্রচেষ্টা, পারেদেসের দূরপাল্লার শট এবং ম্যাক অ্যালিস্টারের সুযোগও কাজে লাগাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময় ১-১ সমতায় শেষ হয়।

অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই আবার এগিয়ে যায় বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ৯২ মিনিটে কর্নার থেকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ফ্লিকের পর লিসান্দ্রো মার্টিনেজ বল নিয়ন্ত্রণ করে বাঁ পায়ের শক্তিশালী শটে জালের ছাদে বল পাঠিয়ে স্কোর ২-১ করেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে অতিরিক্ত সময়ের তৃতীয় দ্রুততম গোল এটি।

তবে কেপ ভার্দে আবারও অবিশ্বাস্যভাবে ফিরে আসে। ১০৩ মিনিটে সিডনি লোপেজ ক্যাবরাল বাম দিক থেকে ভেতরে ঢুকে দূরের কোনায় দুর্দান্ত বাঁকানো শটে এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে কোনো সুযোগ না দিয়ে ম্যাচ ২-২ করেন। গোলটি সহজেই টুর্নামেন্টের সেরা গোলের দাবিদার।

ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছে, তখন ১১১ মিনিটে আসে ভাগ্যনির্ধারক মুহূর্ত। মেসির নেওয়া কর্নার থেকে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর হেড ডিনে বোর্জেসের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়িয়ে যায়। আত্মঘাতী গোল হিসেবে নথিভুক্ত হওয়া এই গোলেই ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।

শেষ মুহূর্তে কেপ ভার্দে আরও একবার সমতায় ফেরার খুব কাছে চলে গিয়েছিল। ১১৬ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে সিডনি ক্যাবরালের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক উড়ে যাচ্ছিল জালের কোণে, কিন্তু এমিলিয়ানো মার্টিনেজ অসাধারণভাবে ঝাঁপিয়ে কর্নারের বিনিময়ে বল ফিরিয়ে দেন। সেটিই হয়ে ওঠে ম্যাচের শেষ বড় সুযোগ।

ম্যাচজুড়ে কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা ছিলেন অসাধারণ। তিনি মোট আটটি সেভ করে আর্জেন্টিনাকে বারবার হতাশ করেন। অন্যদিকে মেসি একাই পাঁচটি শট অন টার্গেটে রাখলেও শেষ পর্যন্ত তার দলকে জয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হয় প্রতিপক্ষের আত্মঘাতী গোলের।

বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা শেষ পর্যন্ত জয় পেলেও এই ম্যাচে কেপ ভার্দে দেখিয়ে দিল, বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা কেবল চমক নয়, বড় দলগুলোর জন্যও ভয়ংকর প্রতিপক্ষ।