ভিনির জোড়া গোল, নেইমারের ফেরার দিনে স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে নকআউটে ব্রাজিল

  • স্পোর্টস ডেস্ক
  • প্রকাশের সময় : ০৬:৪২:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
  • ১৮৬ জন দেখেছেন

স্পোর্টস ডেস্ক :

ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে টানা তিন ম্যাচেই গোল করলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। প্রথম দুই ম্যাচে এক গোল করে করার পর শেষ ম্যাচে করলেন জোড়া গোল। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তার পারফরম্যান্সে ৩-০ ব্যবধানে জিতেছে সেলেসাওরা। এই জয়ে গ্রুপসেরা হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে জায়গা করে নিয়েছে হলুদ জার্সিধারিরা।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি স্টেডিয়ামে ‘সি’গ্রুপের ম্যাচে দারুণ শুরু করে ব্রাজিল। প্রথমার্ধে ভিনি দুই গোল করেন। শেষ গোলটি দ্বিতীয়ার্ধে করেন মাথেউস কুনহা। দুই অর্ধের খেলাতেই একচ্ছত্র আধিপত্য দেখায় ব্রাজিল। ম্যাচের ৭৬ মিনিটে ৩২ মাস পর নেইমার ব্রাজিলের জার্সিতে মাঠে নামলেও পাননি কোনো গোল।

এই জয়ের মাধ্যমে গ্রুপ পর্বের বাধা অনায়াসেই পার হলো ব্রাজিল। পুরো ম্যাচজুড়ে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং সংগঠিত আক্রমণভাগ স্কটল্যান্ডকে কোনো সুযোগই দেয়নি। অন্যদিকে, স্কটল্যান্ড চেষ্টা করেও ব্রাজিলের শক্তিশালী রক্ষণভাগ ভেঙে গোল আদায় করতে ব্যর্থ হয়। এই জয়ের ফলে দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে নকআউট পর্বে পা রাখছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

প্রথম দুই ম্যাচের চেয়ে ব্রাজিলের খেলায় আরও উন্নতি দেখা গেছে এই ম্যাচে। ৫৪ শতাংশ পজেশন রেখে গোলের জন্য ২১টি শট নিয়ে ৯টি লক্ষ্যে রাখতে পারে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। স্কটল্যান্ডের ১৪ শটের পাঁচটি লক্ষ্যে ছিল।

স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম গোলটির মাধ্যমে অনন্য এক ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন ভিনিসিয়ুস। ব্রাজিলের ইতিহাসের মাত্র পঞ্চম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই গোল করলেন তিনি। এর আগে ১৯৭০ বিশ্বকাপে জাইরজিনিও, ১৯৯৪ সালে রোমারিও এবং ২০০২ বিশ্বকাপে দুই কিংবদন্তি রোনালদো ও রিভালদো এই কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। ইতিহাসে আগের তিনবার যখনই কোনো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার এমনটা করেছেন, প্রতিবারই বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে সেলেসাওরা। এবারও কি তা–ই হবে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র তেমন কিছুরই ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে কড়া লড়াই দেখা যায়। প্রথম মিনিটেই মাঝমাঠে বল দখলের লড়াইয়ে স্কটল্যান্ডের লুইস ফার্গুসনের ধাক্কায় চিবুকে আঘাত পান ব্রাজিলের লুকাস পাকেতা। তবে সেই ধাক্কা সামলে ম্যাচের সপ্তম মিনিটেই লিড নেয় ব্রাজিল। নিজেদের ডি-বক্সের ভেতর বল পাস দিতে গিয়ে অলসতা করে বসেন স্কটিশ ডিফেন্ডার স্কট ম্যাককেনা। তাঁর কাছ থেকে ক্ষিপ্র গতিতে বল কেড়ে নেন ব্রাজিলের তরুণ ফরোয়ার্ড রায়ান। ছিটকে আসা বল বাম প্রান্তে ফাঁকায় পেয়ে যান ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। স্কটিশ গোলরক্ষক অ্যাঙ্গাস গানকে পরাস্ত করে ফাঁকা জালে বল জড়াতে কোনো ভুল করেননি এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।

ম্যাচের ২১ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন ভিনিসিয়ুস। এবারও স্কটিশ ডিফেন্ডার জ্যাক হেনরির ভুল থেকে বল কেড়ে নিয়ে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেছিলেন তিনি। তবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)-এর দীর্ঘ রিভিউ দেখে রেফারি জানান, বল কেড়ে নেওয়ার সময় হেনরিকে ফাউল করেছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ফলে ২৪ মিনিটে গোলটি বাতিল হলে গ্যালারিতে থাকা ব্রাজিলিয়ান সমর্থকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন।

৩৭ মিনিটে ব্রুনো গিমারেসের পাস থেকে তরুণ স্ট্রাইকার রায়ানের শট পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। ৪৪ মিনিটে আবারও গোলের খুব কাছে পৌঁছে যায় সেলেসাওরা। ভিনিসিয়ুসের নিচু ক্রসে ৬ গজের ভেতর পা ছুঁইয়েছিলেন মাথিয়াস কুনিয়া। তবে স্কটিশ ডিফেন্ডার ফার্গুসন ও গোলরক্ষক গানের গায়ে লেগে বলটি কর্নার হয়ে মাঠের বাইরে চলে যায়।

তবে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আর রক্ষা পায়নি স্কটল্যান্ড। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা বল নিয়ে নিজেদের রক্ষণভাগ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে প্রথমে মাথিয়াস কুনিয়া এবং পরে দানিলো দুর্দান্ত স্লাইডিং ট্যাকল করে বল কেড়ে নেন। সেখান থেকে বল পেয়ে ডান প্রান্ত ধরে চমৎকার এক ক্রস বাড়ান ব্রুনো গিমারেস। দূরেে পোস্টে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র দারুণ এক হেডে বল জালে জড়িয়ে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন। এবারের বিশ্বকাপে তার গোল হলো চারটি।

একটু পর আবার গোল পেতে পারত ব্রাজিল। এবার বক্সের ভেতর থেকে হায়ানের শট এগিয়ে এসে দারুণ দক্ষতায় ব্যর্থ করে দেন স্কটল্যান্ড গোলরক্ষক। বিরতিতে ২-০ গোলে এগিয়ে থাকে ব্রাজিল। প্রথমার্ধেই ১১টি শট নেয় সেলেসাওরা, লক্ষ্যে থাকে তিনটি। স্কটল্যান্ডের শট ছিল চারটি, কিন্তু একটিও লক্ষ্যে ছিল না।

দ্বিতীয়ার্ধে পরিবর্তন আনে স্কটল্যান্ড। অধিনায়ক অ্যান্ডি রবার্টসনের বদলে নামেন কিয়েরান টিয়ার্নি। ৪৯ মিনিটে প্রথমবার লক্ষ্যে শট নেয় স্কটল্যান্ড। বাঁ দিকের ক্রস থেকে স্কট ম্যাকটমিনে হেড করলেও আলিসন বেকার সহজেই বল ধরে ফেলেন।

৫১ মিনিটে আবার সুযোগ পান ভিনিসিয়ুস। লুকাস পাকেতার সুন্দর পাসে এগিয়ে গিয়ে শট নেওয়ার আগে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। দুর্বল শট ধরে ফেলেন গান। ৫৪ মিনিটে দূরপাল্লার শটও স্কটল্যান্ড গোলরক্ষকের হাতে জমা পড়ে।

৫৬ মিনিটে পেনাল্টির দাবি তোলে স্কটল্যান্ড। শ্যাঙ্কল্যান্ডের পাস থেকে কেনি ম্যাকলিন বক্সে ঢোকার সময় দানিলোর সঙ্গে ধাক্কা খান। তবে রেফারি সাড়া দেননি। ৫৯ মিনিটে পাকেতার শট যায় পোস্টের ওপর দিয়ে।

৬০ মিনিটে ম্যাচ কার্যত শেষ করে দেয় ব্রাজিল। ব্রুনো গিমারেস দারুণ পাস দেন কুনিয়াকে। বক্সের ডানদিকে ঢুকে একবার বাঁ দিকে, একবার ডান দিকে শরীর ঘুরিয়ে জায়গা বানান তিনি। এরপর তাক করে বল পাঠিয়ে দেন জালে। গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না। এই বিশ্বকাপে এটি ম্যানচেস্টার ইউনাইট্ডে তারকার তৃতীয় গোল।

৬৩ মিনিটে বক্সের বাইরে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন দানিলো। সেখান থেকে সরাসরি ফ্রি-কিক নেন ফার্গুসন। আলিসন ভালো অবস্থানে থেকে সেটি ঠেকিয়ে দেন। ৬৫ মিনিটে টিয়ার্নির ক্রস থেকে ম্যাকটমিনের হেডও দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন ব্রাজিল গোলরক্ষক।

৬৬ মিনিটে কাসেমিরো ও পাকেতাকে তুলে গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি ও ফাবিনিয়োকে নামান আনচেলত্তি। ৭৩ মিনিটে ম্যাকলিনের ক্রসে সুযোগ পেয়েছিলেন শ্যাঙ্কল্যান্ড। তিনি ঠিকমতো বল লাগাতে পারেননি। ফিরতি বল ম্যাকটমিনের সামনে এলেও তার শটও চলে যায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে।

৭৬ মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। প্রায় ৯৮১ দিন পর মাঠে নামেন নেইমার। মাথেউস কুনিয়ার বদলি হিসেবে মাঠে এসে এবারের বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচ খেলেন ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। এটি তার চতুর্থ বিশ্বকাপ। হলুদ জার্সিতে তাকে আবার বিশ্বকাপ মঞ্চে দেখে গ্যালারিতে অন্যরকম সাড়া জাগে।

নেইমার নামার পর ব্রাজিলের আক্রমণে ছন্দ আরও বেড়ে যায়। ৭৯ মিনিটে বাঁ দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে নিচু শট নেন ভিনিসিয়ুস। দারুণ সেভে বল কর্নারে পাঠান স্কটিশ গোলরক্ষক। ৮১ মিনিটে দানিলোর ডান দিকের নিচু ক্রসে স্লাইড করে গোলের চেষ্টা করেন ভিনিসিয়ুস। কিন্তু বলের গতি বেশি থাকায় তিনি ঠিকমতো ছুঁতে পারেননি। হ্যাটট্রিকের অপেক্ষা আরও বাড়ল তার।

৮২ মিনিটে রায়ান ও দগলাস সান্তোসের বদলে নামেন এনদ্রিক ও আলেক্স সান্দ্রো। কিছুক্ষণ পর ফাউল করে ফাবিনিয়ো হলুদ কার্ড দেখেন।

৮৫ মিনিটে বাঁ দিক থেকে কর্নার নেন নেইমার। শ্যাঙ্কল্যান্ড হেডে বল বের করে দিলে আবার কর্নার পায় ব্রাজিল। ৮৬ মিনিটে নেইমারের বল যায় গাব্রিয়েলের দিকে। বক্সের ডান পাশে নিচু হয়ে সিজার-কিকের চেষ্টা করেন আর্সেনাল ডিফেন্ডার। ম্যাকলিন সামনে দাঁড়িয়ে সেটি ব্লক করে দেন।

৯০ মিনিটে প্রায় ৩০ মিটার দূর থেকে বাঁ দিকের ফ্রি-কিকে দাঁড়ান নেইমার। প্রথম শট প্রতিপক্ষের গায়ে লেগে ফিরে আসে তার কাছেই। দ্বিতীয়বার দূরপাল্লার শট নেন তিনি। তবে সেটি সোজা চলে যায় গানের হাতে।

যোগ করা সময় পঞ্চম মিনিটে স্কটল্যান্ড পায় ম্যাচের সবচেয়ে ভালো সুযোগ। ফ্রি-কিক থেকে বল বক্সে আসার পর ব্রাজিল প্রথমে বিপদ কাটালেও কর্নার পায় স্কটল্যান্ড। সেখান থেকে কাছাকাছি জায়গা থেকে শট নেন ম্যাকটমিনে। আলিসন কোনোভাবে তা ঠেকিয়ে দেন। এই সেভে নিজের ক্লিনশিটও ধরে রাখেন তিনি।

শেষ বাঁশি বাজতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুসের আলোয় ব্রাজিল হয় গ্রুপ ‘সি’র সেরা। অপরদিকে স্কটল্যান্ডের সামনে এখন অপেক্ষা, অন্য গ্রুপের ফল তাদের শেষ বত্রিশের আশাকে বাঁচিয়ে রাখে কিনা।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

ভিনির জোড়া গোল, নেইমারের ফেরার দিনে স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে নকআউটে ব্রাজিল

ভিনির জোড়া গোল, নেইমারের ফেরার দিনে স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে নকআউটে ব্রাজিল

প্রকাশের সময় : ০৬:৪২:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

স্পোর্টস ডেস্ক :

ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে টানা তিন ম্যাচেই গোল করলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। প্রথম দুই ম্যাচে এক গোল করে করার পর শেষ ম্যাচে করলেন জোড়া গোল। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তার পারফরম্যান্সে ৩-০ ব্যবধানে জিতেছে সেলেসাওরা। এই জয়ে গ্রুপসেরা হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে জায়গা করে নিয়েছে হলুদ জার্সিধারিরা।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি স্টেডিয়ামে ‘সি’গ্রুপের ম্যাচে দারুণ শুরু করে ব্রাজিল। প্রথমার্ধে ভিনি দুই গোল করেন। শেষ গোলটি দ্বিতীয়ার্ধে করেন মাথেউস কুনহা। দুই অর্ধের খেলাতেই একচ্ছত্র আধিপত্য দেখায় ব্রাজিল। ম্যাচের ৭৬ মিনিটে ৩২ মাস পর নেইমার ব্রাজিলের জার্সিতে মাঠে নামলেও পাননি কোনো গোল।

এই জয়ের মাধ্যমে গ্রুপ পর্বের বাধা অনায়াসেই পার হলো ব্রাজিল। পুরো ম্যাচজুড়ে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং সংগঠিত আক্রমণভাগ স্কটল্যান্ডকে কোনো সুযোগই দেয়নি। অন্যদিকে, স্কটল্যান্ড চেষ্টা করেও ব্রাজিলের শক্তিশালী রক্ষণভাগ ভেঙে গোল আদায় করতে ব্যর্থ হয়। এই জয়ের ফলে দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে নকআউট পর্বে পা রাখছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

প্রথম দুই ম্যাচের চেয়ে ব্রাজিলের খেলায় আরও উন্নতি দেখা গেছে এই ম্যাচে। ৫৪ শতাংশ পজেশন রেখে গোলের জন্য ২১টি শট নিয়ে ৯টি লক্ষ্যে রাখতে পারে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। স্কটল্যান্ডের ১৪ শটের পাঁচটি লক্ষ্যে ছিল।

স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম গোলটির মাধ্যমে অনন্য এক ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন ভিনিসিয়ুস। ব্রাজিলের ইতিহাসের মাত্র পঞ্চম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই গোল করলেন তিনি। এর আগে ১৯৭০ বিশ্বকাপে জাইরজিনিও, ১৯৯৪ সালে রোমারিও এবং ২০০২ বিশ্বকাপে দুই কিংবদন্তি রোনালদো ও রিভালদো এই কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। ইতিহাসে আগের তিনবার যখনই কোনো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার এমনটা করেছেন, প্রতিবারই বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে সেলেসাওরা। এবারও কি তা–ই হবে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র তেমন কিছুরই ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে কড়া লড়াই দেখা যায়। প্রথম মিনিটেই মাঝমাঠে বল দখলের লড়াইয়ে স্কটল্যান্ডের লুইস ফার্গুসনের ধাক্কায় চিবুকে আঘাত পান ব্রাজিলের লুকাস পাকেতা। তবে সেই ধাক্কা সামলে ম্যাচের সপ্তম মিনিটেই লিড নেয় ব্রাজিল। নিজেদের ডি-বক্সের ভেতর বল পাস দিতে গিয়ে অলসতা করে বসেন স্কটিশ ডিফেন্ডার স্কট ম্যাককেনা। তাঁর কাছ থেকে ক্ষিপ্র গতিতে বল কেড়ে নেন ব্রাজিলের তরুণ ফরোয়ার্ড রায়ান। ছিটকে আসা বল বাম প্রান্তে ফাঁকায় পেয়ে যান ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। স্কটিশ গোলরক্ষক অ্যাঙ্গাস গানকে পরাস্ত করে ফাঁকা জালে বল জড়াতে কোনো ভুল করেননি এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।

ম্যাচের ২১ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন ভিনিসিয়ুস। এবারও স্কটিশ ডিফেন্ডার জ্যাক হেনরির ভুল থেকে বল কেড়ে নিয়ে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেছিলেন তিনি। তবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)-এর দীর্ঘ রিভিউ দেখে রেফারি জানান, বল কেড়ে নেওয়ার সময় হেনরিকে ফাউল করেছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ফলে ২৪ মিনিটে গোলটি বাতিল হলে গ্যালারিতে থাকা ব্রাজিলিয়ান সমর্থকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন।

৩৭ মিনিটে ব্রুনো গিমারেসের পাস থেকে তরুণ স্ট্রাইকার রায়ানের শট পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। ৪৪ মিনিটে আবারও গোলের খুব কাছে পৌঁছে যায় সেলেসাওরা। ভিনিসিয়ুসের নিচু ক্রসে ৬ গজের ভেতর পা ছুঁইয়েছিলেন মাথিয়াস কুনিয়া। তবে স্কটিশ ডিফেন্ডার ফার্গুসন ও গোলরক্ষক গানের গায়ে লেগে বলটি কর্নার হয়ে মাঠের বাইরে চলে যায়।

তবে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আর রক্ষা পায়নি স্কটল্যান্ড। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা বল নিয়ে নিজেদের রক্ষণভাগ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে প্রথমে মাথিয়াস কুনিয়া এবং পরে দানিলো দুর্দান্ত স্লাইডিং ট্যাকল করে বল কেড়ে নেন। সেখান থেকে বল পেয়ে ডান প্রান্ত ধরে চমৎকার এক ক্রস বাড়ান ব্রুনো গিমারেস। দূরেে পোস্টে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র দারুণ এক হেডে বল জালে জড়িয়ে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন। এবারের বিশ্বকাপে তার গোল হলো চারটি।

একটু পর আবার গোল পেতে পারত ব্রাজিল। এবার বক্সের ভেতর থেকে হায়ানের শট এগিয়ে এসে দারুণ দক্ষতায় ব্যর্থ করে দেন স্কটল্যান্ড গোলরক্ষক। বিরতিতে ২-০ গোলে এগিয়ে থাকে ব্রাজিল। প্রথমার্ধেই ১১টি শট নেয় সেলেসাওরা, লক্ষ্যে থাকে তিনটি। স্কটল্যান্ডের শট ছিল চারটি, কিন্তু একটিও লক্ষ্যে ছিল না।

দ্বিতীয়ার্ধে পরিবর্তন আনে স্কটল্যান্ড। অধিনায়ক অ্যান্ডি রবার্টসনের বদলে নামেন কিয়েরান টিয়ার্নি। ৪৯ মিনিটে প্রথমবার লক্ষ্যে শট নেয় স্কটল্যান্ড। বাঁ দিকের ক্রস থেকে স্কট ম্যাকটমিনে হেড করলেও আলিসন বেকার সহজেই বল ধরে ফেলেন।

৫১ মিনিটে আবার সুযোগ পান ভিনিসিয়ুস। লুকাস পাকেতার সুন্দর পাসে এগিয়ে গিয়ে শট নেওয়ার আগে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। দুর্বল শট ধরে ফেলেন গান। ৫৪ মিনিটে দূরপাল্লার শটও স্কটল্যান্ড গোলরক্ষকের হাতে জমা পড়ে।

৫৬ মিনিটে পেনাল্টির দাবি তোলে স্কটল্যান্ড। শ্যাঙ্কল্যান্ডের পাস থেকে কেনি ম্যাকলিন বক্সে ঢোকার সময় দানিলোর সঙ্গে ধাক্কা খান। তবে রেফারি সাড়া দেননি। ৫৯ মিনিটে পাকেতার শট যায় পোস্টের ওপর দিয়ে।

৬০ মিনিটে ম্যাচ কার্যত শেষ করে দেয় ব্রাজিল। ব্রুনো গিমারেস দারুণ পাস দেন কুনিয়াকে। বক্সের ডানদিকে ঢুকে একবার বাঁ দিকে, একবার ডান দিকে শরীর ঘুরিয়ে জায়গা বানান তিনি। এরপর তাক করে বল পাঠিয়ে দেন জালে। গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না। এই বিশ্বকাপে এটি ম্যানচেস্টার ইউনাইট্ডে তারকার তৃতীয় গোল।

৬৩ মিনিটে বক্সের বাইরে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন দানিলো। সেখান থেকে সরাসরি ফ্রি-কিক নেন ফার্গুসন। আলিসন ভালো অবস্থানে থেকে সেটি ঠেকিয়ে দেন। ৬৫ মিনিটে টিয়ার্নির ক্রস থেকে ম্যাকটমিনের হেডও দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন ব্রাজিল গোলরক্ষক।

৬৬ মিনিটে কাসেমিরো ও পাকেতাকে তুলে গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি ও ফাবিনিয়োকে নামান আনচেলত্তি। ৭৩ মিনিটে ম্যাকলিনের ক্রসে সুযোগ পেয়েছিলেন শ্যাঙ্কল্যান্ড। তিনি ঠিকমতো বল লাগাতে পারেননি। ফিরতি বল ম্যাকটমিনের সামনে এলেও তার শটও চলে যায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে।

৭৬ মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। প্রায় ৯৮১ দিন পর মাঠে নামেন নেইমার। মাথেউস কুনিয়ার বদলি হিসেবে মাঠে এসে এবারের বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচ খেলেন ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। এটি তার চতুর্থ বিশ্বকাপ। হলুদ জার্সিতে তাকে আবার বিশ্বকাপ মঞ্চে দেখে গ্যালারিতে অন্যরকম সাড়া জাগে।

নেইমার নামার পর ব্রাজিলের আক্রমণে ছন্দ আরও বেড়ে যায়। ৭৯ মিনিটে বাঁ দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে নিচু শট নেন ভিনিসিয়ুস। দারুণ সেভে বল কর্নারে পাঠান স্কটিশ গোলরক্ষক। ৮১ মিনিটে দানিলোর ডান দিকের নিচু ক্রসে স্লাইড করে গোলের চেষ্টা করেন ভিনিসিয়ুস। কিন্তু বলের গতি বেশি থাকায় তিনি ঠিকমতো ছুঁতে পারেননি। হ্যাটট্রিকের অপেক্ষা আরও বাড়ল তার।

৮২ মিনিটে রায়ান ও দগলাস সান্তোসের বদলে নামেন এনদ্রিক ও আলেক্স সান্দ্রো। কিছুক্ষণ পর ফাউল করে ফাবিনিয়ো হলুদ কার্ড দেখেন।

৮৫ মিনিটে বাঁ দিক থেকে কর্নার নেন নেইমার। শ্যাঙ্কল্যান্ড হেডে বল বের করে দিলে আবার কর্নার পায় ব্রাজিল। ৮৬ মিনিটে নেইমারের বল যায় গাব্রিয়েলের দিকে। বক্সের ডান পাশে নিচু হয়ে সিজার-কিকের চেষ্টা করেন আর্সেনাল ডিফেন্ডার। ম্যাকলিন সামনে দাঁড়িয়ে সেটি ব্লক করে দেন।

৯০ মিনিটে প্রায় ৩০ মিটার দূর থেকে বাঁ দিকের ফ্রি-কিকে দাঁড়ান নেইমার। প্রথম শট প্রতিপক্ষের গায়ে লেগে ফিরে আসে তার কাছেই। দ্বিতীয়বার দূরপাল্লার শট নেন তিনি। তবে সেটি সোজা চলে যায় গানের হাতে।

যোগ করা সময় পঞ্চম মিনিটে স্কটল্যান্ড পায় ম্যাচের সবচেয়ে ভালো সুযোগ। ফ্রি-কিক থেকে বল বক্সে আসার পর ব্রাজিল প্রথমে বিপদ কাটালেও কর্নার পায় স্কটল্যান্ড। সেখান থেকে কাছাকাছি জায়গা থেকে শট নেন ম্যাকটমিনে। আলিসন কোনোভাবে তা ঠেকিয়ে দেন। এই সেভে নিজের ক্লিনশিটও ধরে রাখেন তিনি।

শেষ বাঁশি বাজতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুসের আলোয় ব্রাজিল হয় গ্রুপ ‘সি’র সেরা। অপরদিকে স্কটল্যান্ডের সামনে এখন অপেক্ষা, অন্য গ্রুপের ফল তাদের শেষ বত্রিশের আশাকে বাঁচিয়ে রাখে কিনা।