নিজস্ব প্রতিবেদক :
জুলাই অভ্যুত্থান কোনো একক দল বা ব্যক্তির নয় দাবি করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এটি গণতন্ত্র ও শান্তিকামী সব মানুষের অর্জন।
শনিবার (৪ জুলাই) ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি’ আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’ এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
তারেক রহমান বলেন, যারা জুলাই আন্দোলনে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, স্বজন হারিয়েছেন তাদের জন্য রাষ্ট্র তার সামর্থ্যমতো মূল্যায়নের চেষ্টা করবে। আপনাদের প্রতি যারা অন্যায়, অবিচার করেছে তাতে জড়িতদের দেশের আইন অনুযায়ী বিচার হবে। তবে বিচারের আগ খেয়াল রাখতে হবে যাতে কারও প্রতি অবিচার না হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার ও তার পরিবার এবং দেশের মানুষের ওপর বিগত ১৭ বছরে যে অবিচার করা হয়েছে- আল্লাহ তাকে এখন সেই সবের প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন। কিন্তু তিনি প্রতিশোধ নিতে চান না।
তারেক রহমান বলেন, তার ও তার পরিবার এবং দেশের মানুষের ওপর বিগত ১৭ বছরে যে অবিচার করা হয়েছে—আল্লাহ তাকে এখন সেই সবের প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন। কিন্তু তিনি প্রতিশোধ নিতে চান না। তিনি জানান, তার দায়িত্ব দেশকে ঐক্যবদ্ধ করা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি যদি এই মুহূর্তে আমার মাকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম—মা, গত ১৭ বছর আপনার ওপর যে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন হয়েছে, আপনি কি চান আমি তার প্রতিশোধ নিই। আমি যদি জিজ্ঞেস করতাম আপনার ওপর যে অবিচার-অন্যায় হয়েছে তার প্রতিশোধ আমি নিই…; কারণ সেই প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাকে দিয়েছেন। আমার মায়ের সন্তান হিসেবে আমি নিশ্চিত—আমার মা আমাকে বলতেন, তোমার দায়িত্ব দেশের সকলকে ঐক্যবন্ধ করে সামনে এগিয়ে যাওয়া। দেশকে সামনে নিয়ে যাওয়া। আমি যদি আমার ভাইকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, তুমি কি চাও—তোমার সাথে যে অন্যায় যে অবিচার হয়েছে—যেভাবে তোমাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যারা এর জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে আমি প্রতিশোধ নিই; কারণ সেই ক্ষমতা আল্লাহ আমাকে এখন দিয়েছেন…; আমি নিশ্চিত, দুই ভাই আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি, তাকে আমি চিনি, তাকে আমি জানি, একই রক্ত আমাদের শরীরে প্রবাহিত, আমার ভাইও আমাকে একই উত্ত দিতো, যে উত্তর আমাকে আমার মা দিতেন।
তিনি বলেন, আমি ১৭ বছর আগে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। দেশে ফিরে এসে আমার অনেক সহকর্মীকে পাইনি। আমার ছাত্রদলের অনেককে আমি রেখে গিয়েছিলাম। তাদের অনেককে পাইনি। অনেকে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।

তারেক রহমান বলেন, যারা জুলাই হত্যাকাণ্ডে দায়ী তাদের বিচার করা হবে। বিচারের নামে যেন অবিচার না হয়; সেটিও লক্ষ রাখতে হবে। সময় নিয়ে হলেও যে হত্যাকারী তার সঠিক বিচার নিশ্চিত করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঠিক কতজন নিহত হয়েছেন, তা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে। তবে তার হিসাবে, অন্তত ২ হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি। আর জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রাণ হারিয়েছে ৬০ শিশু। তিনি বলেন, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার করবে সরকার।
তারেক রহমান বলেন, দেশকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করতে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে।
বিগত শেখ হাসিনা সরকারের বিভিন্ন অন্যায়-অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রায় প্রতিটি মানুষই অতীতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অসংখ্য মানুষকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা হয়েছে। শুধু বিএনপিরই ৬০ লাখ নেতাকর্মী মিথ্যা মামলার কারণে বাড়িছাড়া হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, নিহত ও নির্যাতিত প্রতিটি মানুষের স্বপ্ন ছিল দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। তাই রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সবাইকে বিচারের নামে কারও প্রতি জুলুম না করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, এতে কবরে শুয়ে থাকা আমাদের স্বজনরা শান্তি পাবেন না। তাই বিচার করতে কিছুটা সময় লাগলেও সরকার ধৈর্যের সঙ্গে এগোবে, যাতে অপরাধীরা সঠিক বিচার পায়। আমরা প্রশ্নবিদ্ধ বিচার করতে চাই না। সব আইন অনুসরণ করেই বিচার সম্পন্ন করা হবে।
শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়ে তিনি বলেন, যে শহীদ হয়েছে, সে যদি ওপর থেকে দেখে যে তার হত্যার বিচার করতে গিয়ে আমরা অন্য কারো ওপর অন্যায়-অবিচারের আশ্রয় নিচ্ছি, তাহলে সেই শহীদ কষ্ট পাবে। আইন অনুযায়ী হত্যাকারীদের সঠিক বিচার করা হবে, প্রয়োজনে বিচার প্রক্রিয়ার জন্য সময় নেয়া হবে।
দেশে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিকে বিভক্ত করে দেশকে কোনোভাবেই সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া যায় না। দেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এই গণ-অভ্যুত্থানে প্রত্যেকের ত্যাগের মূল্যায়ন করা হবে, তবে তার মানে এই নয় যে কাউকে বঞ্চিত করে তা করা হবে।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে যে অর্জন এসেছে তা কোনো একক ব্যক্তি বা একক দলের নয়; এ অর্জন দেশের প্রতিটি শান্তিপ্রিয়, প্রতিটি গণতান্ত্রিক মানুষের। জুলাইয়ে যারা শহীদ ও আহত হয়েছেন, তাদের লক্ষ্য ছিল এ দেশের ব্যবস্থার পরিবর্তন, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্যেই আমাদের সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।

উপস্থিত শহীদ পরিবার ও সাধারণ মানুষের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ জুলাই শহীদদের সত্যিকারের সম্মান করতে হলে আমাদের কাজের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দেশকে যদি আমরা সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারি, তবেই ভবিষ্যতে আপনারা গর্ব করে বলতে পারবেন যে নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে আপনারা দেশের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পেরেছেন। সবার কাছে আমার এটাই প্রত্যাশা।
তারেক রহমান বলেন, শহীদ পরিবার এবং আহত যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।
তিনি বলেন, যারা অন্যায় করেছে, যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচার অবশ্যই হবে। তবে আমরা চাই, বিচারের নামে যেন আরেকটি অবিচার না ঘটে। বিচার হতে হবে ন্যায়সংগত ও আইনের ভিত্তিতে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাদের হারানো হয়েছে তারা আর কখনো ফিরে আসবেন না। কিন্তু তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দায়িত্ব এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গর্ব করে বলতে পারবে-এই পরিবর্তনের পেছনে শহীদদের আত্মত্যাগ রয়েছে।
বক্তব্যের শেষে জুলাই শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের আত্মত্যাগের লক্ষ্য বাস্তবায়নই হবে তাদের প্রতি প্রকৃত সম্মান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। স্মরণসভায় জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এতে মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পেশাজীবী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























