ঠাকুরগাঁওয়ে স্কুলছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণে ৩ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন তিনজনের

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি :

ঠাকুরগাঁওয়ে ১৪ বছর আগে এক সপ্তম শেণির স্কুলছাত্রীকে তুলে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর মামলায় তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অপর তিনজনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

রোববার (১৯ জুলাই) দুপুর ১২টার দিকে ঠাকুরগাঁও শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আলী মনসুর আসামিদের উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন।

আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া আসামিরা হলেন- ঠাকুরগাঁও শহরের গোয়ালপাড়া এলাকার ইউনুস কসাইয়ের ছেলে মো. আনিস রানা, একই এলাকার মাইরুদ্দিনের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম ও শহরের মুন্সিপাড়া এলাকার ভোট কসাইয়ের ছেলে মো. দুলাল।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- শহরের মুন্সিপাড়া এলাকার সেলিমের ছেলে মো. আনিছুর, বাংরু মোহাম্মদের ছেলে মো. খতিবুর ওরফে খতু ও বজলুর ছেলে মো. লালু।

পাশাপাশি আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া আসামিদের দুই লাখ টাকা করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়াদের এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড; অনাদায়ে আরও এক বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ২১ অক্টোবর বিকেলে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী তার এক বান্ধবীর বাড়িতে বেড়াতে যায়। সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফেরার সময় ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় সড়কের পাশে একটি পেট্রোলপাম্প সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে প্রথমে দুই যুবক কিশোরীর মুখ চেপে ধরে তাকে জোর করে পেট্রোলপাম্পের পেছনের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। পরে মোবাইল ফোনে আরও কয়েকজনকে ডেকে আনা হয়। সেখানে তিনজন পালাক্রমে কিশোরীকে ধর্ষণ করেন এবং অপর তিনজন এ অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করেন।

একপর্যায়ে কিশোরীর চিৎকার শুনে পাশ দিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তি ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে এলে আসামিরা পালিয়ে যান। পরে ওই ব্যক্তি ভুক্তভোগীকে কাপড়ের ব্যবস্থা করে তার পরিচিতদের কাছে পৌঁছে দেন। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতে পেরে তাকে চিকিৎসার জন্য ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন।

ঘটনার তিন দিন পর, ২০১১ সালের ২৫ অক্টোবর ভুক্তভোগীর বাবা ঠাকুরগাঁও সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করলে মামলার বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ, আলামত উপস্থাপন এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত এ রায় দেন।

রায়ে আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯ (৩) ধারায় আসামি মো. আনিছ ওরফে রানা, মো. সাইফুল ইসলাম ও মো. দুলালকে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে।

রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা পাবেন না। অর্থাৎ বিচারাধীন অবস্থায় হাজতে কাটানো সময় তাদের দণ্ডের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে না। পাশাপাশি তারা জেল কোড অনুযায়ী কোনো ধরনের সাজা মওকুফ বা রেমিশনের সুবিধা পাবেন না।

অন্যদিকে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি আইন অনুযায়ী বিচারাধীন অবস্থায় কারাভোগের সময় ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা পাবেন।

আদালত আরও নির্দেশ দেন, দণ্ডিতদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য হবে। যদি দণ্ডিতরা অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হন, তাহলে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে সেই অর্থ আদায় করতে হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায় কার্যকরের অংশ হিসেবে আদালত পাঁচ দণ্ডিত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. আনিছ ওরফে রানা পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আদালত উল্লেখ করেন, তিনি গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণের পর থেকে তার সাজা কার্যকর হবে।

২০১১ সালে সংঘটিত এ ঘটনাটি সে সময় ঠাকুরগাঁও জেলায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ঘোষিত এ রায়ে মামলার ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পন্ন হলো।

রায় ঘোষণার পর সরকার পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বদরুল চৌধুরী বলেন, আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে এ রায় দিয়েছেন। দীর্ঘদিন পর হলেও ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেয়েছেন। এ রায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে।

 

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

ঠাকুরগাঁওয়ে স্কুলছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণে ৩ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন তিনজনের

ঠাকুরগাঁওয়ে স্কুলছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণে ৩ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন তিনজনের

প্রকাশের সময় : ০৪:২২:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি :

ঠাকুরগাঁওয়ে ১৪ বছর আগে এক সপ্তম শেণির স্কুলছাত্রীকে তুলে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর মামলায় তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অপর তিনজনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

রোববার (১৯ জুলাই) দুপুর ১২টার দিকে ঠাকুরগাঁও শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আলী মনসুর আসামিদের উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন।

আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া আসামিরা হলেন- ঠাকুরগাঁও শহরের গোয়ালপাড়া এলাকার ইউনুস কসাইয়ের ছেলে মো. আনিস রানা, একই এলাকার মাইরুদ্দিনের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম ও শহরের মুন্সিপাড়া এলাকার ভোট কসাইয়ের ছেলে মো. দুলাল।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- শহরের মুন্সিপাড়া এলাকার সেলিমের ছেলে মো. আনিছুর, বাংরু মোহাম্মদের ছেলে মো. খতিবুর ওরফে খতু ও বজলুর ছেলে মো. লালু।

পাশাপাশি আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া আসামিদের দুই লাখ টাকা করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়াদের এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড; অনাদায়ে আরও এক বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ২১ অক্টোবর বিকেলে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী তার এক বান্ধবীর বাড়িতে বেড়াতে যায়। সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফেরার সময় ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় সড়কের পাশে একটি পেট্রোলপাম্প সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে প্রথমে দুই যুবক কিশোরীর মুখ চেপে ধরে তাকে জোর করে পেট্রোলপাম্পের পেছনের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। পরে মোবাইল ফোনে আরও কয়েকজনকে ডেকে আনা হয়। সেখানে তিনজন পালাক্রমে কিশোরীকে ধর্ষণ করেন এবং অপর তিনজন এ অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করেন।

একপর্যায়ে কিশোরীর চিৎকার শুনে পাশ দিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তি ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে এলে আসামিরা পালিয়ে যান। পরে ওই ব্যক্তি ভুক্তভোগীকে কাপড়ের ব্যবস্থা করে তার পরিচিতদের কাছে পৌঁছে দেন। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতে পেরে তাকে চিকিৎসার জন্য ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন।

ঘটনার তিন দিন পর, ২০১১ সালের ২৫ অক্টোবর ভুক্তভোগীর বাবা ঠাকুরগাঁও সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করলে মামলার বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ, আলামত উপস্থাপন এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত এ রায় দেন।

রায়ে আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯ (৩) ধারায় আসামি মো. আনিছ ওরফে রানা, মো. সাইফুল ইসলাম ও মো. দুলালকে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে।

রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা পাবেন না। অর্থাৎ বিচারাধীন অবস্থায় হাজতে কাটানো সময় তাদের দণ্ডের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে না। পাশাপাশি তারা জেল কোড অনুযায়ী কোনো ধরনের সাজা মওকুফ বা রেমিশনের সুবিধা পাবেন না।

অন্যদিকে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি আইন অনুযায়ী বিচারাধীন অবস্থায় কারাভোগের সময় ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা পাবেন।

আদালত আরও নির্দেশ দেন, দণ্ডিতদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য হবে। যদি দণ্ডিতরা অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হন, তাহলে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে সেই অর্থ আদায় করতে হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায় কার্যকরের অংশ হিসেবে আদালত পাঁচ দণ্ডিত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. আনিছ ওরফে রানা পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আদালত উল্লেখ করেন, তিনি গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণের পর থেকে তার সাজা কার্যকর হবে।

২০১১ সালে সংঘটিত এ ঘটনাটি সে সময় ঠাকুরগাঁও জেলায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ঘোষিত এ রায়ে মামলার ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পন্ন হলো।

রায় ঘোষণার পর সরকার পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বদরুল চৌধুরী বলেন, আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে এ রায় দিয়েছেন। দীর্ঘদিন পর হলেও ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেয়েছেন। এ রায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে।