নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, আগামী সাড়ে চার বছরের মধ্যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় অল্প সময়ে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে কাজ করলে আগামী কয়েক বছরে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
রোববার (৯ আগস্ট) রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে ইউনিসেফ আয়োজিত ‘বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতি ত্বরান্বিতকরণ: মূল্যায়ন থেকে পদ্ধতিগত পদক্ষেপ’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ছয় মাসে শিক্ষা ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন এসেছে, এমন প্রশ্ন করা ঠিক নয়। শিক্ষা কোনো পোশাক পরিবর্তনের মতো বিষয় নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় টেকসই পরিবর্তন আনতে সময় প্রয়োজন।
প্রাথমিক শিক্ষায় ফাউন্ডেশনাল লার্নিংয়ের দুর্বলতা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মৌলিক বাংলা ও পড়ার দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। এ সমস্যা সমাধানে রিমিডিয়াল এডুকেশন বা পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তামূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ববি হাজ্জাজ বলেন, কোনো শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণিতে পড়লেও যদি সে প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির প্রয়োজনীয় পড়াশোনা না জানে, তাহলে তাকে পঞ্চম শ্রেণির পড়া দিয়ে এগিয়ে নেওয়া কঠিন। তাই শিক্ষার্থীর শেখার ঘাটতি চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, আউট অব স্কুল চিলড্রেন কমিয়ে সব শিশুকে বিদ্যালয়ের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েও কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নন ফরমাল এডুকেশন ব্যুরোর বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি স্কুলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে বিনামূল্যে স্কুল ইউনিফর্ম দেওয়ার পাইলট কার্যক্রম শুরু হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
মিড ডে মিল কর্মসূচি নিয়েও কথা বলেন তিনি। ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রথম পর্যায়ের কর্মসূচিতে যেসব সমস্যা দেখা গেছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা চলছে। তার মতে, একটি পাইলট প্রকল্প সফল কি না তা শুধু কতদূর বাস্তবায়ন হয়েছে তা দিয়ে বিচার না করে, এর মাধ্যমে কতগুলো সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধান করা গেছে সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর কথাও জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিটি শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি যেন আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়, সে জন্য প্রযুক্তিনির্ভর একটি ব্যবস্থা তৈরির কাজ চলছে।
পিইডিপি ৫ নিয়েও নতুনভাবে কাজ করার কথা জানান তিনি। ববি হাজ্জাজ বলেন, আগামী দিনে প্রকল্পগুলোকে আরও যৌক্তিক ও কার্যকর কাঠামোর মধ্যে আনা হবে। পিইডিপি ৫-এর আওতায় থাকা কার্যক্রমগুলো থাকবে, তবে সেগুলোকে আরও কার্যকর ও অপারেশনাল কাঠামোয় সাজানো হবে।
প্রাথমিক শিক্ষায় বিজ্ঞান, গণিত ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রিটিক্যাল থিংকিং বা সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা গড়ে তুলতে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই স্টিম শিক্ষা জোরদারের পরিকল্পনার কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ম্যাথ ল্যাব চালুর পাশাপাশি কারিকুলামে সায়েন্স টয়েজ ও ডিজাইনভিত্তিক কার্যক্রম যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা হাতে কলমে গণিত, বিজ্ঞান ও নকশা সম্পর্কে শেখার সুযোগ পাবে।
শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো এবং পুরো প্রশাসনিক ও মনিটরিং ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার ওপরও গুরুত্ব দেন ববি হাজ্জাজ। এ জন্য নতুন শিক্ষক সম্পর্কিত নীতি এবং মাঠপর্যায় থেকে বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক ও পুরো কমিউনিটির কল্যাণ নিশ্চিত করার কথাও বলেন প্রতিমন্ত্রী। তার মতে, শুধু শিক্ষার্থী বা শিক্ষক নয়, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সামগ্রিক সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্কুল ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হবে।
ববি হাজ্জাজ বলেন, সরকারের শিক্ষা বিষয়ক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, এনসিটিবি, নেপ, বিএনএফই এবং সহযোগী বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য সবার কাছ থেকে সৎ ও বাস্তবভিত্তিক মতামত প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ডাটা ডিপেন্ডেন্ট ও এভিডেন্স বেজড পদ্ধতিতে কাজ করে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনার লক্ষ্য রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাই সহযোগিতা করলে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনের উদাহরণ টেনে ববি হাজ্জাজ বলেন, আমার নিজের দুই কন্যার জন্যও প্রতিটি বিষয়ে আলাদা শিক্ষক রাখতে হচ্ছে। বাংলাদেশে এটি যেন এক ধরনের স্বাভাবিক মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। অভিভাবক হিসেবে প্রতি বিষয়ে গৃহশিক্ষক না রাখলে মনে হয় তিনি সন্তানকে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছেন– এমন একটি মানসিকতা তৈরি হয়েছে, যা পরিবর্তন করা দরকার। তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ কোরিয়া বা তাইওয়ানের মতো উন্নত দেশগুলোতেও প্রাইভেট টিউশনের ব্যাপকতা রয়েছে।
শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ফাউন্ডেশনাল লার্নিং বা মৌলিক শিখন নিশ্চিত করতে আমরা কাজ শুরু করেছি। বর্তমানে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থীর বাংলা শেখার মৌলিক দক্ষতা নেই। এমনকি দ্বিতীয় শ্রেণির পড়ার দক্ষতাও অনেক পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীর মধ্যে অনুপস্থিত। এ ধরনের পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে রেমিডিয়াল এডুকেশন অত্যন্ত জরুরি।’
শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে ও ঝরে পড়া রোধে নেওয়া সরকারের নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, কোনো শিশু যেন শিক্ষার বাইরে না থাকে, সে লক্ষ্যে আগামী ১৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রী বিনামূল্যে স্কুল ইউনিফর্ম বিতরণ কার্যক্রমের পাইলটিং উদ্বোধন করবেন। পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মিড-ডে মিল প্রকল্পের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে তা আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মমুখী ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সে লক্ষ্যে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ‘স্টিম’ এডুকেশন, আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা এবং বিজ্ঞান ও গণিতচর্চা বাড়াতে কারিকুলামে ‘সায়েন্স টয়েস’ ও ‘ম্যাথ ল্যাব’ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’’
একইসঙ্গে প্রতিটি শিক্ষার্থীর অগ্রগতি ট্র্যাকিংয়ের জন্য প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ, শিক্ষক নীতিমালা যুগোপযোগী করা, তদারকি ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার এবং প্রজেক্টগুলোকে দর্শন নির্ভর না করে বাস্তবমুখী ও কার্যকরী করার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব জেসমিন নাহার, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই), এনসিটিবি, ন্যাপ, বিএনএফই এবং ইউনিসেফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), ব্রিটিশ কাউন্সিল, রুম টু রিড ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















