রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক যেন মরণ ফাঁদ

দেড় বছরে ৬২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫ জন

রাজবাড়ী জেলা প্রতিনিধি : 

রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক যেন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এ সড়কে গত দেড় বছরে ৬২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫ জন; আহত হয়েছেন ১১৫।

মহাসড়কটির রাজবাড়ী শহর থেকে পাংশা উপজেলার শিয়ালডাঙ্গি পর্যন্ত ৩১ কিলোমিটার অংশে গত বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন পাংশা হাইওয়ে থানার ওসি সৈয়দ আল মামুন।

মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহনের অবাধ চলাচল, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত গতি ও ট্রাফিক আইন না মানাকে এসব দুর্ঘটনার কারণ বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ১২ জুন থেকে ৩ অগাস্ট পর্যন্ত সময়েই এ সড়কে অন্তত সাতটি দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় ৫জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১২ জুন কালুখালীতে প্রাইভেটকার ও ব্যাটারিচালিত রিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে এক শিশু নিহত ও পাঁচজন আহত হন।

২২ জুন কালুখালীতে ট্রাক ও প্রাইভেটকারের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক যুবক নিহত এবং পাংশায় বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে তিনজন আহত হন। ২৯ জুন কালুখালীতে ট্রাক ও প্রাইভেটকারের সংঘর্ষে কৃষি কর্মকর্তাসহ ছয়জন আহত হন। পরে ১ জুলাই কালুখালীতে বাস ও পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত। পরদিন চন্দনী এলাকায় মুরগিবাহী পিকআপ ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত ও একজন আহত হন। সর্বশেষ ৩ অগাস্ট কালুখালীতে গোল্ডেন লাইন পরিবহন ও মাহেন্দ্রের মুখোমুখি সংঘর্ষে মাহেন্দ্রচালক নিহতসহ পাঁচজন আহত হন।

সরেজমিনে দেখা যায়, এই সড়ক দিয়ে চলাচল করা হাজার হাজার যানবাহনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, নছিমন, করিমন ও ভটভটিসহ বিভিন্ন ধরনের তিন চাকার যানও রয়েছে। যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক সড়কের নিয়ম না মেনেই ওভারটেকিং করছে। সাথে রয়েছে বেপরোয়া গতিও।

স্থানীয় বাসিন্দা খাইরুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কে তিনচাকার যান তো চলার কথা না। প্রশাসনের নাকের ডগায় থেকে কিভাবে চলে? আর যে যানবাহনগুলো চলে অধিকাংশেরই ফিটনেস নাই। যে কারণে ব্রেক করলে ডানে চলে যায়, বামে চলে যায়। তারপর তাদের যে বেপরোয়া গতি। যে কারণে মাঝে মধ্যে ঘটছে দুর্ঘটনা।

দুর্ঘটনার জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করেন তিন চাকার ধীরগতির বাহনের চালক ও দ্রুতগতির বড় গাড়ির চালকরা।

অনিক পরিবহনের বাসের চালক আরিফ হোসেন বলেন, মহাসড়কে দুর্ঘটনার কারণ হলো তিন চাকার গাড়ি। ওরা না জানে সিগন্যাল, না জানে নিয়ম কানুন। হর্ন দিলে সাইড পর্যন্ত দিতে চায় না। যে কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।

আরেক বাস চালক রাজ্জাক বলেন, তিন চাকার ছোট গাড়িগুলো বাস-ট্রাকের সাথে পাল্লা দেয়। কোন আইন জানে না ওরা। হুটহাট করে ব্রেক করে বসে থাকে, সে সময় আমাদের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যায় পড়তে হয়। আরেকটি সমস্যা হলো বৃষ্টির কারণে রাস্তা এত পিচ্ছিল হয় যে ব্রেক করতেই গাড়ি চলে যায় খাদে।

অন্যদিকে তিন চাকার মাহেদ্র চালক আব্দুল হালিম বলেন, বড় গাড়িআওলারা খালি দোষ দেয় ছোট গাড়ির জন্য অ্যাক্সিডেন্ট হয়। এটা একেবারেই মিথ্যা। আমরা তো আস্তে চালাই আমাদের সাইড দিয়ে। আর বড় গাড়ি বেপড়োয়া গতিতে চলে। ছোট গাড়িকে সাইড দিতেই চায় না। অ্যাক্সিডেন্ট কমাতে হলে বড় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে আগে।

আরেক ইজিবাইক চালক রমজান শেখ বলেন, আমরা গাড়ি চালাবো কোথায়? আমাদের তো আলাদা রোড নাই। আর আমাদের বলে অবৈধ গাড়ি! এই গাড়ি যারা তৈরি করেছে তাদের ধরেন। প্রশাসন সেখানে যেতে পারবে না, পারে খালি আমাদের সাথে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, দুর্ঘটনা কমাতে হলে মহাসড়ক থেকে সবার আগে যানবাহনগুলোর বেপরোয়া গতি কমাতে হবে। এরপর অবৈধ তিন চাকার যান ও ফিটনেস বিহীন যানবাহন সরিয়ে নিতে হবে। এছাড়াও দুর্ঘটনা কমাতে এই সড়কটি ফোরলেন করার দাবিও জানান তারা।

পাংশা হাইওয়ে থানার ওসি সৈয়দ আল মামুন বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে তিন চাকার যানবাহনের চলাচল, ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং অতিরিক্ত গতি। তবে অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গেলে ‘মব কালচার’-এর কারণে বাধার মুখে পড়তে হয়। তারপরও হাইওয়ে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ যানবাহন গুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

তেলআবিব-দুবাইয়ে ফ্লাইট স্থগিতের মেয়াদ বাড়াল এয়ার কানাডা

রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক যেন মরণ ফাঁদ

দেড় বছরে ৬২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫ জন

প্রকাশের সময় : ০১:১৫:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

রাজবাড়ী জেলা প্রতিনিধি : 

রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক যেন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এ সড়কে গত দেড় বছরে ৬২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫ জন; আহত হয়েছেন ১১৫।

মহাসড়কটির রাজবাড়ী শহর থেকে পাংশা উপজেলার শিয়ালডাঙ্গি পর্যন্ত ৩১ কিলোমিটার অংশে গত বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন পাংশা হাইওয়ে থানার ওসি সৈয়দ আল মামুন।

মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহনের অবাধ চলাচল, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত গতি ও ট্রাফিক আইন না মানাকে এসব দুর্ঘটনার কারণ বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ১২ জুন থেকে ৩ অগাস্ট পর্যন্ত সময়েই এ সড়কে অন্তত সাতটি দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় ৫জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১২ জুন কালুখালীতে প্রাইভেটকার ও ব্যাটারিচালিত রিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে এক শিশু নিহত ও পাঁচজন আহত হন।

২২ জুন কালুখালীতে ট্রাক ও প্রাইভেটকারের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক যুবক নিহত এবং পাংশায় বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে তিনজন আহত হন। ২৯ জুন কালুখালীতে ট্রাক ও প্রাইভেটকারের সংঘর্ষে কৃষি কর্মকর্তাসহ ছয়জন আহত হন। পরে ১ জুলাই কালুখালীতে বাস ও পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত। পরদিন চন্দনী এলাকায় মুরগিবাহী পিকআপ ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত ও একজন আহত হন। সর্বশেষ ৩ অগাস্ট কালুখালীতে গোল্ডেন লাইন পরিবহন ও মাহেন্দ্রের মুখোমুখি সংঘর্ষে মাহেন্দ্রচালক নিহতসহ পাঁচজন আহত হন।

সরেজমিনে দেখা যায়, এই সড়ক দিয়ে চলাচল করা হাজার হাজার যানবাহনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, নছিমন, করিমন ও ভটভটিসহ বিভিন্ন ধরনের তিন চাকার যানও রয়েছে। যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক সড়কের নিয়ম না মেনেই ওভারটেকিং করছে। সাথে রয়েছে বেপরোয়া গতিও।

স্থানীয় বাসিন্দা খাইরুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কে তিনচাকার যান তো চলার কথা না। প্রশাসনের নাকের ডগায় থেকে কিভাবে চলে? আর যে যানবাহনগুলো চলে অধিকাংশেরই ফিটনেস নাই। যে কারণে ব্রেক করলে ডানে চলে যায়, বামে চলে যায়। তারপর তাদের যে বেপরোয়া গতি। যে কারণে মাঝে মধ্যে ঘটছে দুর্ঘটনা।

দুর্ঘটনার জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করেন তিন চাকার ধীরগতির বাহনের চালক ও দ্রুতগতির বড় গাড়ির চালকরা।

অনিক পরিবহনের বাসের চালক আরিফ হোসেন বলেন, মহাসড়কে দুর্ঘটনার কারণ হলো তিন চাকার গাড়ি। ওরা না জানে সিগন্যাল, না জানে নিয়ম কানুন। হর্ন দিলে সাইড পর্যন্ত দিতে চায় না। যে কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।

আরেক বাস চালক রাজ্জাক বলেন, তিন চাকার ছোট গাড়িগুলো বাস-ট্রাকের সাথে পাল্লা দেয়। কোন আইন জানে না ওরা। হুটহাট করে ব্রেক করে বসে থাকে, সে সময় আমাদের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যায় পড়তে হয়। আরেকটি সমস্যা হলো বৃষ্টির কারণে রাস্তা এত পিচ্ছিল হয় যে ব্রেক করতেই গাড়ি চলে যায় খাদে।

অন্যদিকে তিন চাকার মাহেদ্র চালক আব্দুল হালিম বলেন, বড় গাড়িআওলারা খালি দোষ দেয় ছোট গাড়ির জন্য অ্যাক্সিডেন্ট হয়। এটা একেবারেই মিথ্যা। আমরা তো আস্তে চালাই আমাদের সাইড দিয়ে। আর বড় গাড়ি বেপড়োয়া গতিতে চলে। ছোট গাড়িকে সাইড দিতেই চায় না। অ্যাক্সিডেন্ট কমাতে হলে বড় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে আগে।

আরেক ইজিবাইক চালক রমজান শেখ বলেন, আমরা গাড়ি চালাবো কোথায়? আমাদের তো আলাদা রোড নাই। আর আমাদের বলে অবৈধ গাড়ি! এই গাড়ি যারা তৈরি করেছে তাদের ধরেন। প্রশাসন সেখানে যেতে পারবে না, পারে খালি আমাদের সাথে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, দুর্ঘটনা কমাতে হলে মহাসড়ক থেকে সবার আগে যানবাহনগুলোর বেপরোয়া গতি কমাতে হবে। এরপর অবৈধ তিন চাকার যান ও ফিটনেস বিহীন যানবাহন সরিয়ে নিতে হবে। এছাড়াও দুর্ঘটনা কমাতে এই সড়কটি ফোরলেন করার দাবিও জানান তারা।

পাংশা হাইওয়ে থানার ওসি সৈয়দ আল মামুন বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে তিন চাকার যানবাহনের চলাচল, ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং অতিরিক্ত গতি। তবে অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গেলে ‘মব কালচার’-এর কারণে বাধার মুখে পড়তে হয়। তারপরও হাইওয়ে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ যানবাহন গুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।