নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।
রোববার (৯ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে জোট শরিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ কথা জানান বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এর মধ্যে দিয়ে ১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি পদে দ্বিতীয় বারের মতো নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে এর আগে আলোচনা হয়েছিল, যাতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা যায়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরিতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো যায়, এসব বিষয় নিয়েও সংসদে প্রস্তাব এসেছিল। আমাদের প্রত্যাশা ছিল নির্বাচন শেষে নতুনভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংবিধান অনুসারে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হবে, এমনটাই আমরা আশা করেছিলাম।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে—রাষ্ট্রপতির নির্বাচনে আমরা ১১ দলের পক্ষ থেকে অংশ নেব। আমরা প্রার্থী দেবো। যেহেতু ১১ দল আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি পার্লামেন্টে এবং বাইরে গণভোটের জন্য, সেই জায়গায় আমাদের কমন প্রার্থী থাকবে, ঐক্যবদ্ধ প্রার্থী থাকবে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের পক্ষ থেকে এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী হবেন ১১ দলেরই শরিক দল এলডিপির চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশের একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ।
তিনি নারায়ণগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, বিভিন্ন সময় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন, ছয়বার তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং বীর বিক্রম মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। উনি ১১ দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী থাকবেন।
কর্নেল অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার কারণ ব্যাখ্যা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘১১ দলে আমরা মনে করি দেশের এই যে সংকট একটা চলছে, এই সময় দেশের যে ধরনের অভিভাবকত্ব প্রয়োজন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমরা মনে করি কর্নেল অলি আহমেদ উপযুক্ত এবং উনার অভিভাবকত্বে বা উনার নেতৃত্বে এই সংকটগুলো নিরসন হওয়া সম্ভব।’
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকার সংস্কার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করেনি। যারা জুলাই-পরবর্তী সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছেন তাদের নিয়ে কার্যকরভাবে অধিবেশনও ডাকেনি সরকার। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনকেও দলীয়করণ করা হচ্ছে। অথচ গত ১৬ বছর বিএনপির যে আন্দোলন ছিল তার অন্যতম দাবি ছিল, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করা।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, আমরা প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই বলেছিলাম, ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করে জুলাই সনদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি দিতে হবে। কিন্তু সেই রাষ্ট্রপতিকে আরও ছয় মাস রেখে দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তাকে এখন কোনো ধরনের প্রি-এক্সিট (আগাম অব্যাহতি) দেওয়া হয়েছে কি না, বিচার বা জবাবদিহির আওতায় আনা হবে কি না, এ নিয়েও আমাদের সন্দেহ রয়েছে। এ ছয় মাস সময় বাড়ানোর পেছনে কী ধরনের পরিকল্পনা বা পাঁয়তারা রয়েছে, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।
তিনি আরও বলেন, আমরা জানি, পরবর্তী পাঁচ বছর যে সময় অতিক্রম হবে সেই সময়ে এই (নতুন) রাষ্ট্রপতি থাকবেন। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা কী হবে, রাষ্ট্রপতি নিজে কী ভূমিকা পালন করবেন- এসব বিষয় জাতির সামনে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।
অতীতের রাজনৈতিক সংকটের প্রসঙ্গ তুলে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতা নিজেদের হাতে ধরে রাখার চেষ্টা দেখা গেছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে ১১ দলের বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। ১১ দলের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আমরা অংশ নেবো। ১১ দলের পক্ষ থেকে একজন প্রার্থী দেওয়া হবে। সংসদে ও সংসদের বাইরে আমাদের ১১ দলের নেতারা রয়েছেন। তাই আমাদের পক্ষ থেকে একজন দলীয় প্রধান রাষ্ট্রপতি প্রার্থী থাকবেন।
নাহিদ ইসলাম জানান, ১১ দলের জোটের শরিক দল এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘অলি আহমদ বাংলাদেশের একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তিনি রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এবং বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি একাধিকবার জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। আমরা মনে করি, দেশের বর্তমান সংকটের সময়ে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারবেন। তার নেতৃত্বে সরকারও সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে বলে আমরা মনে করি।’
বিএনপির সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি এখন পর্যন্ত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেনি। ফলে সর্বসম্মতভাবে একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে সুযোগ ছিল তা নষ্ট হয়েছে। বিএনপির একদলীয় এবং সংস্কারবিরোধী অবস্থানের কারণে দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১১ দলের এ সিদ্ধান্তকে চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন বলেও জানান নাহিদ ইসলাম।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য রক্ষায় ১১ দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজনীতির সর্বক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা প্রয়োজন।
জামায়াতের আমির বলেন, আমরা মনে করি যে সর্বক্ষেত্রে রাজনীতি স্বচ্ছ হওয়া উচিত, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়া উচিত। তাহলে গণতন্ত্রের গতি এবং তার সুস্বাস্থ্য ফিরে আসবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম ঘোষণা করার কথা জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, জোটের পক্ষ থেকে সর্বসম্মতিক্রমে তাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শফিকুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে যাকে আমাদের পক্ষ থেকে সর্বসম্মতিক্রমে প্রেসিডেন্ট ক্যান্ডিডেট হিসেবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তার নাম আপনারা জেনেছেন।
বৈঠককে সভাপতিত্ব করেন- জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, জাগপা সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ফুয়াদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ প্রমুখ।
সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালে একমাত্র বিরোধী দল থেকে প্রার্থী দেওয়ার নজির রয়েছে। সেই সময়ে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থেকে রাষ্ট্রপতি পদে বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে মনোনয়ন দিয়েছিল। সেই নির্বাচনে তিনি বিএনপি প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাসের কাছে ৮০ ভোটে পরাজিত হন। এরপর থেকে প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে বিএনপি ২১১ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আর জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট ৬৮টি আসন অর্জন করেছে। এছাড়া বিএনপি জোট শরিকদের মধ্যে বিজেপি, গণসংহতি আন্দোলন ও গনঅধিকার পরিষদ একটি করে আসন লাভ করে। জামায়াতে জোটের জাতীয় নাগরিক পার্টি ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২ টি ও খেলাফত মজলিস একটি আসন লাভ করে। এছাড়া স্বতন্ত্র ৭ জন ও ইসলামী আন্দোলন একটি আসন অর্জন করেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























