নিজস্ব প্রতিবেদক :
২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজসহ ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
রোববার (১৯ জুলাই) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এই প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে হস্তান্তর করে।
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, নথিপত্রগুলো বর্তমানে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তদন্তে এখন পর্যন্ত শুধু ঢাকাতেই ৩২ জন নিহত হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য মিলেছে।
তবে তদন্তের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকায় প্রকৃত নিহতের সংখ্যা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনাটি একটি পদ্ধতিগত অপরাধ। এটি ছিল ব্যাপক ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড সুপিরিয়র রেসপনসিবলিটি রয়েছে। একদম পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কারণ যখন ব্লগারদের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ করছিলেন, ঠিক তখনই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে এই সংগঠনটিকে একেবারে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য নানা পরিকল্পনা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এমন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, নারকীয় হত্যাকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্ত শেষে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে একটি খসড়া প্রতিবেদন দাখিল করেছেন তারা। প্রতিবেদনটি এখন পর্যালোচনা বা চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই করা হবে। যেন একটি সঠিক তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে স্বচ্ছ বিচার হয়। প্রকৃত আসামিরা যেন বিচারের সম্মুখীন হন। এজন্য হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে আজ খসড়া প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করেছি। শিগগিরই পূর্ণ প্রতিবেদন হাতে পাবো বলে আশা করছি।
আসামিদের তালিকায় কারা রয়েছেন জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম বলেন, এই প্রতিবেদনটি খসড়া। চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগ পর্যন্ত আসামিদের তালিকা আমরা প্রকাশ করতে পারছি না। তবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ মামলার প্রধান আসামি। তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এছাড়া সাবেক পুলিশপ্রধান, বিজিবি প্রধানসহ কয়েকজনেন বিরুদ্ধে খসড়া প্রতিবেদন এসেছে। এসব আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব।
তিনি আরও বলেন, খসড়া প্রতিবেদন হওয়ায় যাচাই-বাছাই শেষে আসামিদের নাম সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে। হেফাজত ইসলামের নেতারা এ ঘটনার জ্বলন্ত বা প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তারা এ বিষয়ে আরও বেশি ওয়াকিবহাল রয়েছেন। আমাদের তদন্তের ওপর তাদের আর কোনো বক্তব্য থাকলে নিশ্চয়ই বলবেন। তবে কে আসামি হবেন, আর কে হবেন না; তা ফরমাল চার্জ দাখিলের পরই সবাই জানতে পারবেন।
নিহতদের তালিকা প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা এ পর্যন্ত নিহত প্রায় ৬১ জনের একটি তালিকা পেয়েছিলাম। কিন্তু ৫৮ জনের পরিচয় এরই মধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। বাকিদের এখনও সম্ভব হয়নি। তবে আমাদের তালিকা ৬১ জনের।
নিহতের সংখ্যা ও হেফাজতের অবস্থান
এ সময় নিহতের সংখ্যা নিয়ে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘নিহতদের যে সংখ্যা, এই সংখ্যাটা আসছে আমাদের আলোচনাতেও এবং তদন্তের মধ্য দিয়ে তাদের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। আমরা আগাগোড়াই বলছি যে এখানে অনেক মিসিং (নিখোঁজ) আছে, যাদের কোনো হদিসই নাই। রাষ্ট্রীয়ভাবে তৎকালীন শাপলার শহীদদের গুম করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।
নিহতদের পরিচয় প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, ‘এখানে শহীদদের মধ্যে আমাদের স্টুডেন্টদের পোরশনটা (অংশ) কিন্তু খুবই কম।’
সমাজের সকল শ্রেণির মানুষ, ইউনিভার্সিটির ছাত্র, বুয়েটের ছাত্র, ট্রাক ড্রাইভার, শ্রমিক, তৎকালীন প্রায় সবগুলো বিরোধীদলের রাজনৈতিক কর্মীরাও এই শহীদদের তালিকার মধ্যে আছেন বলেও দাবি করেন হেফাজতের এই নেতা।
খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে সন্তুষ্টির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা যেটুকু দেখেছি, কিছু টুকটাক কারেকশন আছে। আমরা আরেকটু পর্যালোচনা করে দুই-একদিনের মধ্যেই কারেকশনের কথাগুলো উনাদেরকে বলব। তবে আমাদের যে এক্সপেক্টেশন (আশা) ছিল, আমাদের যে অভিযোগ ছিল, এই খসড়া রিপোর্ট তার কাছাকাছিই আছে।’
পুলিশের তদন্তে পক্ষপাতিত্বের শঙ্কা নাকচ
মামলার তদন্তে কোনো চাপ ছিল না জানিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ইফতেখারুল আলম বলেন, ‘এখানে কাউকে বাদ দেওয়া বা কাউকে ঢুকানোর ব্যাপারে আমাদের ওপর কোনো চাপ ছিল না। শুরু থেকে প্রসিকিউশন টিম আমাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে ছিল। প্রত্যেকটা বিষয়ে উনাদের কনসার্ন নেওয়া হয়।’
পুলিশ হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্তে নিরপেক্ষতা কতটুকু থাকছে— এমন প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আইন অনুযায়ী ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়া আছে। আমরা তো বহু পুলিশকে আসামি করেছি। কে পুলিশ, কে পাবলিক— এইভাবে দেখে ইনভেস্টিগেশন হয় না। আমরা অপরাধীকে দেখে ইনভেস্টিগেশন করি।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আপনাদের এই আশঙ্কা থাকার কোনো কারণ নাই যে পুলিশ হলে পুলিশের পক্ষপাতিত্বের কোনো জায়গা আছে। এই মামলার মধ্যেও দেখবেন যে, বেশি সংখ্যক মানুষ কিন্তু পুলিশই হবে।’
২১ মে ফরমাল চার্জ দাখিল
মামলার পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমাদের কোনো আসামি যদি নিরপরাধ হয় তাকে আমরা আনব না। কিন্তু কোনো দোষী আসামি যাতে বাদ না পড়ে যায়, সেজন্যে আমরা এই সতর্কতা অবলম্বন করছি। সেই কারণেই আমরা হেফাজতের নেতৃবৃন্দদের সঙ্গে আলোচনা করলাম, পরামর্শ নিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আশা করছি যে, আগামী ২১ তারিখে আমাদের ট্রাইব্যুনাল খোলার দিনই আমি বাদী হয়ে আমাদের ফরমাল চার্জটা দাখিল করতে চাই।’
মামলায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ছাড়াও তৎকালীন পুলিশ প্রধান, র্যাব মহাপরিচালক এবং ডিএমপি কমিশনারকে আসামি করা হয়েছে।
পাশাপাশি আসামির তালিকায় রয়েছেন একাত্তর টিভির সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু, সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপা এবং সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরসহ বেশ কয়েকজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিজীবী।
আগামী ২১ জুলাই নির্ধারিত সময়েই এই তদন্ত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হবে।
এদিকে মামলার অগ্রগতি জানতে রোববার সকালে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ১০ থেকে ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে যায়। সিনিয়র নায়েবে আমির আব্দুল হামিদ (মধুপুর পীর সাহেব)-এর নেতৃত্বে যাওয়া ওই দলে যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি মীর ইদ্রিসসহ সংগঠনের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ৫ মে ১৩ দফা দাবিতে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। দিনভর সংঘর্ষ ও উত্তেজনার পর গভীর রাতে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযানে সমাবেশস্থল খালি করা হয়। ওই অভিযানে বহু মানুষ নিহত হওয়ার অভিযোগের ঘটনাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্তাধীন রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















