নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের কথার সঙ্গে কাজের মিল নেই। আবার তারাই আমাদের খোটা দেয়। হাজার জাতের খোটা। আমরা নাকি কোথায় জান্নাতের টিকিট বিক্রি করেছি।
শুক্রবার (১৯ জুন) দুপুর জামায়াতে ইসলামী নারায়ণগঞ্জ মহানগরী শাখার উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে কর্মী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ব্যাংক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন পদে নিজ দলীয় লোক বসিয়ে সরকার একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার চেষ্টা করছে। কিন্তু দেশের জনগণ এ একদলীয় শাসন ব্যবস্থা মেনে নেবে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিগত সময়ে সংসদে বিরোধী দলকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলতো আওয়ামী লীগ। তারা সবচেয়ে বেশি বলতো বিএনপিকে তারপর জামায়াতে ইসলামীকে। বর্তমান সরকারও বিরোধী দলকে বিভিন্ন রকমের ট্যাগ দিয়ে কথা বলে। কিন্তু দেশের জনগণ এগুলো খায় না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ২৪ হয়েছিল বলেই ২৬ সালের নির্বাচন হয়েছে। ২৪ না হলে ২৬ সালে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল না। তাদের রক্তের বিনিময়েই আমরা সরকারি ও বিরোধীদল হয়েছি। আমি অনুরোধ করবো এসব শহীদদের কেউ যেন খাটো করে না দেখেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে সরকার অনেক অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর নিয়োগ, ইসলামী ব্যাংকের দিকে কালো হাত, বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ভিসি নিয়োগ, জেলা পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দলীয় নেতা ও ক্যাডার নিয়োগ দিয়ে একদলীয় শাসন কায়েম করছে। শেখ মুজিবুর রহমানও একদলীয় শাসন কায়েম করেছিল। টিকতে পারেননি।
জামায়াত আমির বলেন, আমি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই ১৯৪৭, ৫২ ও ৭১সহ বিভিন্ন সময় যারা বুক চিতিয়ে সংগ্রাম করেছেন, ২০২৪ সালে যারা শহীদ হয়েছেন আমি সেসব শহীদ পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বিগত নির্বাচনে হাজারও জালিয়াতি, সন্ত্রাস ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরে আপনারা ১১ দলীয় জোটকে একটি আসন উপহার দিতে পেরেছিলেন। ভোটের মত রেজাল্ট গণনা সুষ্ঠু হলে অন্য আসনেও জোটের বিজয় হত।
ডা. শফিক বলেন, অনেকের আমাদের ওপর অভিমান- এ রায় কেন মেনে নিলেন। আমরা বলেছি ১৭ বছর দেশ ছিল স্বৈরাচারের কবলে। মানুষ তো ভোট দিয়েছে। নির্বাচনের আগে সব জায়গায় একই আওয়াজ উঠেছিল, দাঁড়িপাল্লা। একই দিনে দুটি ভোট হয়েছিল। আমাদের অবস্থান সুদৃঢ় ছিল। আমাদের মার্কা ও গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে। বর্তমান সরকার প্রথমে হ্যাঁ এর পক্ষে ছিল না। তারা গোপনে না এর পক্ষে ছিল। পরে জনরোষের মুখে রংপুরে আবু সাঈদের এলাকায় গিয়ে তিনি (তারেক রহমান) বলেছিলেন হ্যাঁ ভোট দিতে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি ইঙ্গিত করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, তিনি তো সংসদের নেতা। এই গণভোটে ৬৭ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে। তার মন্ত্রী বলেছে ভোটটা যাতে হয়ে যায় এজন্য হ্যাঁ ভোট চেয়েছেন। এগুলো করলে রাজনীতিবিদদের প্রতি জনগণের সম্মান কীভাবে থাকবে।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, যেহেতু প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ হ্যাঁ এর পক্ষে ভোট দিয়েছে সব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হবে। এখনও সময় আছে ফিরে আসুন, জনগণের রায় বাস্তবায়ন করুন। নয়তো জনগণ আপনাদের সামনে হিমালয় পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে।
ডা. শফিক বলেন, সরকার গঠনের আগে ও পরে আপনারা চাঁদাবাজদের হাত আটকাতে পারেননি। ঘুষ দুর্নীতি বন্ধ করেননি, বরং সেটির মিটার আগের থেকে আরও বেড়ে গেছে। কিছু দলকানা মানুষ ও গোষ্ঠীর হয়ত ভাগ্য পরিবর্তন হবে। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না।
জামায়াত আমির বলেন, এই নারায়ণগঞ্জ একসময় প্রাচ্যের ড্যান্ডি ছিল। নারায়ণগঞ্জ তার গৌরব হারিয়ে ফেলেছে। একসময় এটা সন্ত্রাসের নগরী হিসেবে পরিনত হয়েছিল। ত্বকী আপনাদের সন্তান, তার হত্যার বিচার কি পেয়েছেন? একজন নেতা ছিল, বলতো খেলা হবে, এখন কোথায় খেলছে? অহংকার ভালো নয়। নতুন কোনো গডফাদার এখানে তৈরি হোক আমরা চাই না।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, আমি এখানে আসার আগে ব্যাবসায়ী বন্ধুদের সঙ্গে বসলাম। কী যেন আতংক তাদের তাড়া করছে। তারা কথা বলতে পারছেন না। একজন বলেই ফেললেন আমরা ভালো নেই। চাঁদাবাজরা আমাদের ভালো থাকতে দিচ্ছে না। দলের নেতা বলে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবে। আর ঘরে ঘরে চাঁদাবাজদের পৌঁছে দিয়েছে।
ডা. শফিক বলেন, আমরা চাই না আমাদের প্রিয় নারায়ণগঞ্জ অশান্তি ও চাঁদাবাজদের কবলে পড়ে থাকুক। ড্রেনের পানি দিয়ে যেমন অজু হবে না, তেমনি ভালো মানুষ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন হবে না। এমন মানুষ লাগবে যে আল্লাহকে ভয় করে। আমরা সৎ নেতৃত্ব কায়েম করবো জনগণকে তার অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে। আমাদের দাবি সব অনির্বাচিত প্রশাসক সরিয়ে দ্রুত নির্বাচন দেওয়া হোক।
জামায়াত আমির বলেন, নারায়ণগঞ্জ মহানগরীতে অনির্বাচিত প্রশাসক সরিয়ে দিয়ে অনতিবিলম্বে নির্বাচন দেওয়া হোক। আগামী নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এখানে প্রার্থী দেবে। আমি আপনাদের নেতা আব্দুল জব্বারকে এখানে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করছি। ২৭টি ওয়ার্ডের প্রতিটি ওয়ার্ডে আমরা জনগণের সেবা করতে পারে এমন প্রার্থী আমরা উপহার দেবো।
উপস্থিত লোকজনকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনারা কি কোথাও কোনো জান্নাতের টিকেট বিক্রি করেছেন? আপনাদের কাছে কি কেউ জন্নাতের টিকিট বিক্রি করেছে? আপনারা কেউ বিক্রি করেন নাই। আপনাদের কাছেও কেউ বিক্রি করে নাই। জান্নাতের টিকিট কারা বিক্রি করেছে, যারা ইলেকশনের সময় গিয়ে বলেছে, এই মার্কায় ভোট দিলে জান্নাত পাবেন। সেই ভিডিওগুলো কি হারিয়ে গেছে? কারা বিক্রি করেছেন, যারা বলেছে অমুক নেতার নাম ১শ বার জপলে আপনি জান্নাতে যাবেন, তমুক নেতার নাম বলার আগে অজু করা লাগবে।
জামায়াতে ইসলামীর নারায়ণগঞ্জ মহানগরী আমির মো. আবদুল জব্বারের সভাপতিত্বে কর্মী সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, ঢাকা মহানগর জামায়াতের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মঈনুদ্দিন আহমাদসহ অন্যরা।
পরে আসন্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের জন্য নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতের আমির আব্দুল জব্বারকে মেয়র প্রার্থী হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেন। একইসঙ্গে ২৭টি ওয়ার্ডে জামায়াত ইসলামীর কাউন্সিলর প্রার্থী দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি 





















