নিজস্ব প্রতিবেদক :
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে (সিইসি) কিছু দাবি নিয়ে এসেছিলাম। এসব দাবি মানতেই হবে। নইলে স্থানীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।
মঙ্গলবার (০১ সেপ্টেম্বর) আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ কথা বলেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সিইসির কাছে আমরা কয়েকটি দাবি নিয়ে ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য তফসিলের প্রসঙ্গে আজকের বৈঠকে আসা। কিছু দাবি আগেও ইসিকে জানানো হয়। সেগুলোর ফলোআপ, কতটুকু এগোলো তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, কমিশন তাদের একটি মিটিংয়ে অনুমোদন দিয়েছে এমপিওভুক্ত শিক্ষক যারা আছেন তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। এটা বাতিল করতে বলেছি। এটি সংবিধানের আর্টিকেল ২৭, ২৮ এ উল্লেখ করা সমতা ও বৈষম্যহীনতার পরিপন্থী। এটি সংবিধানের লঙ্ঘন। রাজনৈতিক কার্যক্রম সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ এমন দলের কাউকে (পদবী হোল্ড করছেন) নির্বাচনে রাখা যাবে না বলে আমরা জানিয়েছি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ইসিতে সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া শামসুল আলম সরাসরি একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য। তাকে এডিশনাল সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটিও সংবিধানের লঙ্ঘন। ইসি তাদের ব্যবস্থা জানাবে বলেছে। এও বলেছে নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার তাদের (ইসির) নেই। সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাতে নির্বাচনের আগের সময়ে তারা মাঠ তৈরি করতে পারে। এটার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর তারা পদত্যাগ করলেও হবে না। যারা প্রশাসক তাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে বলে আমরা দাবি জানিয়েছি। মন্ত্রী এমপিরা যেন স্থানীয় নির্বাচনের প্রচারণায় অংশ নিতে না পারে সেটিও বলেছি আমরা।
সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য হয়েছে শুধু জাতীয় নির্বাচনের জন্য। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটের শরিকদের সঙ্গে সংঘাত হবে না।
জামায়াতের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে বাতিল করা। জামায়াত এই নেতা বলেন, সুদীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের শিক্ষকরা প্রতিটি স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ছাড়াও রাজনীতি ও ভোটাধিকার প্রয়োগে অংশগ্রহণ করে আসছেন। এমনকি সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তারা অংশ নিয়েছেন। এমতাবস্থায় কেবল স্থানীয় নির্বাচনে শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত নাগরিকদের সমানাধিকারের নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি এবং একটি সুস্পষ্ট বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। নির্বাচন কমিশনকে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে, অন্যথায় তা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
প্রতিনিধিদলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল, যেসব রাজনৈতিক দলের রাজনীতি ও যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, সেই দলের পদ-পদবিধারী নেতারা যেন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারেন। নিষিদ্ধ কোনো দলের পদধারী নেতা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাটাও এক ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে পড়ে এবং এটি জনগণের ধারণারও পরিপন্থি। তাই স্বচ্ছতার স্বার্থে যেকোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি জানায় জামায়াত। তবে সাধারণ সমর্থকদের বিষয়ে কোনো বিধিনিষেধের কথা তারা উল্লেখ করেননি।
বৈঠকে সম্প্রতি ইসি সচিবালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব শামসুল আলমের নিয়োগ নিয়েও তীব্র আপত্তি জানানো হয়। গোলাম পরওয়ার বলেন, ওই কর্মকর্তা সরাসরি বিএনপির নির্বাচন বিষয়ক সাব-কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন, যা সম্পূর্ণ সংবিধান ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থার খেলাফ। গত বৈঠকেও এ বিষয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল উল্লেখ করে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, কমিশন তাদের এই উদ্বেগের সত্যতা স্বীকার করলেও নিজেদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ না হওয়ার অজুহাতে বিষয়টি কেবল সরকারকে জানানোর প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ রেখেছে। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের রাজনৈতিক নিয়োগ দ্রুত বাতিল করার জোর দাবি জানানো হয়।
উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোতে সম্প্রতি দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াত। দলটির অভিযোগ, সরকারি অর্থ, এডিপি বরাদ্দ ও অন্যান্য সুবিধা ব্যবহার করে আসন্ন নির্বাচনে দলীয় সুবিধা হাসিলের পথ তৈরি করতেই তাদের এই পদে বসানো হয়েছে। তাই নির্বাচনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে এসব পদে নিয়োজিত প্রশাসকদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ স্থায়ীভাবে রদ করার দাবি জানান তারা।
জামায়াত স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এসব পদ থেকে পদত্যাগ করলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যেন এই নির্বাচনে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন, সেই নিয়ম বলবৎ করতে হবে। এছাড়া নির্বাচনে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ব্যক্তিবর্গের যে কোনো ধরণের প্রচারণা বন্ধে কঠোর আচরণবিধি প্রণয়নেরও দাবি জানানো হয়।
সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার জানান, ইসি কিছু বিষয়ে একমত হলেও মূল জায়গায় তারা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে। তবে তারা আশাবাদী যে জনদাবি ও সিভিল সোসাইটির পর্যালোচনার মুখে কমিশন এসব মেনে নিতে বাধ্য হবে। স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে, স্থানীয় নির্বাচন যেহেতু দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না, তাই দল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে না; বরং স্বতন্ত্র ভিত্তিতে যার যার জায়গা থেকে আগ্রহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
জাতীয় নির্বাচনের জন্য গঠিত ১১ দলীয় ঐক্যের কথা তুলে ধরে তিনি স্পষ্ট করেন, সেই ঐক্য কেবল জাতীয় নির্বাচনের জন্যই সীমাবদ্ধ, স্থানীয় নির্বাচনে দলগতভাবে যার যার মতো অংশগ্রহণে কোনো বাঁধা বা সমঝোতার শর্ত থাকছে না।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















