একসময় সাংবাদিকরা পয়সা ও হুমকির কাছে মাথা নত করেননি : রিজভী

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেন, একসময়ের সাংবাদিকরা সত্যিকার অর্থেই সাহিত্যশাসিত, স্বাধীনভাবে যা সত্য, যা বস্তুনিষ্ঠ সেটাই ছাপাতেন, প্রচার করতেন। তারা পয়সা বা কোনো হুমকির কাছে, ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেননি।

রোববার (৩০ আগস্ট) পিআইবির অডিটরিয়ামে সাংবাদিক আবদুস সালাম স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

পিআইবির প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক এবং পাকিস্তান অবজারভার ও বাংলাদেশ অবজারভারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও ভাষাসৈনিক আবদুস সালামের ১১৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এ সভার আয়োজন করা হয়।

তিনি বলেন, একটি সমাজ ও রাষ্ট্র যখন সংকটের মুখে পড়ে, তখন বিবেকবান ও শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব হলো সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো। সাংবাদিকদেরও সেই দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত না হয়ে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করে যেতে হবে।

রিজভী বলেন, নোম চমস্কি বলেছেন, স্বৈরাচারী শাসনে ডান্ডা-লাঠি খুবই অপরিহার্য, মানে জনগণকে দমন করে রাখার জন্য। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যাদের অন্তরে স্বৈরাচারের বৈশিষ্ট্য আছে, তারা মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করেন ডান্ডার মতো করে। এটা নোম চমস্কির একটা অবজারভেশন। তার মানে একসময়ের সাংবাদিকরা সত্যিকার অর্থেই সাহিত্যশাসিত, সত্যিকার অর্থেই স্বাধীনভাবে যা সত্য, যা বস্তুনিষ্ঠ সেটাই ছাপাতেন, প্রচার করতেন। তারা পয়সা বা কোনো হুমকির কাছে, কোনো ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেননি। মাথা বিক্রি করেননি, তাদের প্রতীক হচ্ছেন সাংবাদিক আবদুস সালাম।

বিএনপির এই নেতা বলেন, আবদুস সালাম শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা বিশ্বে প্রয়োজন। আবার যদি আমাদেরকে সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন নাগরিক, স্বাধীনচেতা মানুষ এবং সত্য-মিথ্যার বিভাজনকারী একটি সীমারেখা যদি টানতে হয়, তাহলে আব্দুস সালামদের আজকের এই বিপন্ন পৃথিবীতে খুবই প্রয়োজন। তাদের মত মানুষ যদি আবার জেগে ওঠে, তাহলে আর দেশে-দেশে যুদ্ধ-বিগ্রহ, বোমাবাজি, সেটি হবে না- সত্য উদ্ভাসিত হবে, মিথ্যা অনুপস্থিত হবে।

সভায় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গে নোম চমস্কির বক্তব্য উল্লেখ করে রিজভী বলেন, স্বৈরাচারী শাসনে জনগণকে দমন করার জন্য যেমন লাঠি ব্যবহার করা হয়, তেমনি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বৈরাচারী মানসিকতার শাসকেরা গণমাধ্যমকে সেই লাঠির মতো ব্যবহার করতে পারেন।

ভারতের গণমাধ্যমের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আপনি পার্শ্ববর্তী ভারতেই দেখুন গদি মিডিয়া বলে একটা কথা এসেছে। যে দেশে একসময় বুদ্ধিজীবী বলতেই সেক্যুলার, বুদ্ধিজীবী বলতেই স্বাধীনচেতা, আজকে সেখানে সেটা নেই। সেখানে অধিকাংশ মিডিয়াকে বলা হচ্ছে গদি মিডিয়া। তারা শাসকের পক্ষে, তারা শাসকের অনুগত এবং এমন কায়দা করে সেটা করা হয়েছে যে, সেখান থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারবে না। উন্নত অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে হয়তো সেটার সংখ্যা কম, কিন্তু সেখানেও এমনটা বাড়ছে এবং পলিসি মেকাররা তাদের (মিডিয়াকে) ব্যবহার করছেন ঠিক লাঠির মতো করে। জনগণকে একবার চিরস্থায়ীভাবে দমন করার জন্য, ওখানে লাঠিটা দেখা যায় না, কিন্তু তারা বিভিন্নভাবে প্রচারযন্ত্রকে ব্যবহার করে মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন। যার ভয়ঙ্কর পরিণতি আমরা এখন ইন্ডিয়াতে দেখছি।

রিজভী বলেন, যারা প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, তারা শুধু রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতায় নয়, মানুষের স্বাধীনতা ও নাগরিক স্বাধীনতায়ও বিশ্বাস করেন। আর এ ধরনের স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ সবসময়ই নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

সাংবাদিক আবদুস সালামকে এমনই একজন স্বাধীনচেতা মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি কোনো ক্ষমতা, হুমকি কিংবা স্বার্থের কাছে মাথানত করেননি।

আবদুস সালামের শিক্ষাজীবনের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ওই সময়ে একজন বাঙালি মুসলমান হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করে পাস করা ছিল উল্লেখযোগ্য বিষয়। তিনি প্রথমে ভালো বেতনের সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। পরে সেই চাকরি ছেড়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।

রিজভী বলেন, শিক্ষিত মানুষের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করার যে ধারণা তিনি একটি উপন্যাসে পড়েছিলেন, আবদুস সালামের জীবন তারই বাস্তব উদাহরণ। লাভজনক সরকারি চাকরি ছেড়ে সাংবাদিকতায় আসা ছিল তার আদর্শ ও স্বাধীনচেতা মানসিকতার প্রকাশ।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আবদুস সালামের জীবনের নানা মিলের কথাও তুলে ধরেন রিজভী। তিনি বলেন, নজরুল কবির পাশাপাশি সাংবাদিকও ছিলেন। দুজনই তাদের লেখনীর কারণে কারাবরণ করেছেন এবং নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। ১৯৭৬ সালে দুজনই একুশে পদকে ভূষিত হন।

ভাষা আন্দোলনের সময় আবদুস সালামের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, পাকিস্তান আমলে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেও তাকে গ্রেফতার হতে হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি একটি কলামে ভাষার পক্ষে কথা বলেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়।

পরে আবদুস সালাম রাজনীতিতেও যুক্ত হন বলে জানান রিজভী। যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে সংসদ সদস্য হওয়ার পরও সাংবাদিকতার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। বিভিন্ন সময়ে চাকরি করে সংসার চালানোর পাশাপাশি তিনি আবার ‘অবজারভার’-এ কাজ করতেন।

আইয়ুব খানের ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স’ বইয়ের সমালোচনা করে আব্দুস সালামের লেখা প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, তিনি ওই বইয়ের কঠিন সমালোচনা করেছিলেন। এর পরদিনই অবজারভার বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সামরিক শাসন হোক কিংবা সীমিত গণতান্ত্রিক পরিবেশ, স্বাধীনচেতা সাংবাদিকদের ওপর বিভিন্ন সময়ে চাপ ও আক্রমণ এসেছে।

আবদুস সালামকে শুধু সাংবাদিক নয়, একজন ‘অ্যাক্টিভিস্ট সাংবাদিক’ হিসেবে উল্লেখ করেন রিজভী। তার ভাষ্য, সাংবাদিকতা শুধু ডেস্কে বসে লেখালেখির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজ ও রাষ্ট্র যখন বিপদের মুখে পড়ে, তখন একজন বিবেকবান ও শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব হলো সেই বিপদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। আবদুস সালাম সেই দায়িত্ব থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।

রিজভী আরও বলেন, স্বাধীনচেতা ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কারণে আবদুস সালাম শুধু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেই নয়, পাকিস্তানের প্রেস কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্বও পেয়েছিলেন। তার সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য ছিল বস্তুনিষ্ঠতা ও স্বাধীনতা।

আবদুস সালামের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের অজ্ঞতার বিষয়েও আক্ষেপ করেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, এত বড় মাপের একজন সাংবাদিক সম্পর্কে এখন যত বেশি জানা যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে তিনি যেন ইতিহাসের যবনিকার আড়ালে চলে গেছেন। নতুন প্রজন্মের অনেকেই তার সম্পর্কে জানে না।

রিজভী বলেন, আবদুস সালামের সময়ে সংবাদপত্রের মালিকপক্ষ রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত পোষণ করলেও সাংবাদিকের স্বাধীনতায় সব সময় হস্তক্ষেপ করত না। সেসময় সাংবাদিকতার একটি মানদণ্ড ছিল। মালিকপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হলেও সাংবাদিক তার স্বাধীন মতপ্রকাশ করতে পারতেন।

বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, লাভজনক সরকারি চাকরি ছেড়ে সাংবাদিকতা পেশায় আসার মতো দৃষ্টান্ত এখন খুবই কম। তরুণদের অনেকেই সাংবাদিকতার চেয়ে প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করেন। ফলে আবদুস সালামের মতো আদর্শ সাংবাদিকের জীবন বর্তমান প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, একসময় সাংবাদিকেরা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশকে তাদের দায়িত্ব মনে করতেন। অর্থ, হুমকি কিংবা ক্ষমতার কাছে তারা মাথানত করতেন না। আবদুস সালাম ছিলেন সেই সাংবাদিকতার প্রতীক।

তিনি আরও বলেন, আমরা তো গণতন্ত্রের কথা বলি। যখন খানিকটা দুর্বল গণতন্ত্র থাকে, তখনো যারা প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন—সে স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা নয়, মানুষের স্বাধীনতা, নাগরিক স্বাধীনতা—তারা সব সময় নিপীড়িত হয়েছেন।

রিজভী বলেন, স্বৈরাচারী শাসনে জনগণকে দমনে যেমন লাঠি ও ডান্ডা অপরিহার্য, তেমনি তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যাদের অন্তরে স্বৈরাচারী বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তারা মিডিয়াকে লাঠির মতো ব্যবহার করে। লাঠি যেমন খালি চোখে দেখা যায়, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের এই রূপটি সহজে দেখা যায় না; বরং প্রচারযন্ত্রকে ব্যবহার করে মানুষের মনকে শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালানো হয়।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক লোটন একরামের সঞ্চালনায় সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম, তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভুইয়া, টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিলের আহ্বায়ক ড. আবদুল হাই সিদ্দিক, সদস্যসচিব ও সময় টিভির সিইও জুবায়ের বাবু, সাংবাদিক আবদুস সালাম স্মৃতি সংসদের সভাপতি রেহানা সালামসহ অনেকেই।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

জাতিসংঘে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অতিরিক্ত দায়িত্বে হুমায়ুন কবির

একসময় সাংবাদিকরা পয়সা ও হুমকির কাছে মাথা নত করেননি : রিজভী

প্রকাশের সময় : ০৮:৫৬:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেন, একসময়ের সাংবাদিকরা সত্যিকার অর্থেই সাহিত্যশাসিত, স্বাধীনভাবে যা সত্য, যা বস্তুনিষ্ঠ সেটাই ছাপাতেন, প্রচার করতেন। তারা পয়সা বা কোনো হুমকির কাছে, ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেননি।

রোববার (৩০ আগস্ট) পিআইবির অডিটরিয়ামে সাংবাদিক আবদুস সালাম স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

পিআইবির প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক এবং পাকিস্তান অবজারভার ও বাংলাদেশ অবজারভারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও ভাষাসৈনিক আবদুস সালামের ১১৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এ সভার আয়োজন করা হয়।

তিনি বলেন, একটি সমাজ ও রাষ্ট্র যখন সংকটের মুখে পড়ে, তখন বিবেকবান ও শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব হলো সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো। সাংবাদিকদেরও সেই দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত না হয়ে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করে যেতে হবে।

রিজভী বলেন, নোম চমস্কি বলেছেন, স্বৈরাচারী শাসনে ডান্ডা-লাঠি খুবই অপরিহার্য, মানে জনগণকে দমন করে রাখার জন্য। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যাদের অন্তরে স্বৈরাচারের বৈশিষ্ট্য আছে, তারা মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করেন ডান্ডার মতো করে। এটা নোম চমস্কির একটা অবজারভেশন। তার মানে একসময়ের সাংবাদিকরা সত্যিকার অর্থেই সাহিত্যশাসিত, সত্যিকার অর্থেই স্বাধীনভাবে যা সত্য, যা বস্তুনিষ্ঠ সেটাই ছাপাতেন, প্রচার করতেন। তারা পয়সা বা কোনো হুমকির কাছে, কোনো ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেননি। মাথা বিক্রি করেননি, তাদের প্রতীক হচ্ছেন সাংবাদিক আবদুস সালাম।

বিএনপির এই নেতা বলেন, আবদুস সালাম শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা বিশ্বে প্রয়োজন। আবার যদি আমাদেরকে সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন নাগরিক, স্বাধীনচেতা মানুষ এবং সত্য-মিথ্যার বিভাজনকারী একটি সীমারেখা যদি টানতে হয়, তাহলে আব্দুস সালামদের আজকের এই বিপন্ন পৃথিবীতে খুবই প্রয়োজন। তাদের মত মানুষ যদি আবার জেগে ওঠে, তাহলে আর দেশে-দেশে যুদ্ধ-বিগ্রহ, বোমাবাজি, সেটি হবে না- সত্য উদ্ভাসিত হবে, মিথ্যা অনুপস্থিত হবে।

সভায় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গে নোম চমস্কির বক্তব্য উল্লেখ করে রিজভী বলেন, স্বৈরাচারী শাসনে জনগণকে দমন করার জন্য যেমন লাঠি ব্যবহার করা হয়, তেমনি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বৈরাচারী মানসিকতার শাসকেরা গণমাধ্যমকে সেই লাঠির মতো ব্যবহার করতে পারেন।

ভারতের গণমাধ্যমের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আপনি পার্শ্ববর্তী ভারতেই দেখুন গদি মিডিয়া বলে একটা কথা এসেছে। যে দেশে একসময় বুদ্ধিজীবী বলতেই সেক্যুলার, বুদ্ধিজীবী বলতেই স্বাধীনচেতা, আজকে সেখানে সেটা নেই। সেখানে অধিকাংশ মিডিয়াকে বলা হচ্ছে গদি মিডিয়া। তারা শাসকের পক্ষে, তারা শাসকের অনুগত এবং এমন কায়দা করে সেটা করা হয়েছে যে, সেখান থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারবে না। উন্নত অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে হয়তো সেটার সংখ্যা কম, কিন্তু সেখানেও এমনটা বাড়ছে এবং পলিসি মেকাররা তাদের (মিডিয়াকে) ব্যবহার করছেন ঠিক লাঠির মতো করে। জনগণকে একবার চিরস্থায়ীভাবে দমন করার জন্য, ওখানে লাঠিটা দেখা যায় না, কিন্তু তারা বিভিন্নভাবে প্রচারযন্ত্রকে ব্যবহার করে মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন। যার ভয়ঙ্কর পরিণতি আমরা এখন ইন্ডিয়াতে দেখছি।

রিজভী বলেন, যারা প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, তারা শুধু রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতায় নয়, মানুষের স্বাধীনতা ও নাগরিক স্বাধীনতায়ও বিশ্বাস করেন। আর এ ধরনের স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ সবসময়ই নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

সাংবাদিক আবদুস সালামকে এমনই একজন স্বাধীনচেতা মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি কোনো ক্ষমতা, হুমকি কিংবা স্বার্থের কাছে মাথানত করেননি।

আবদুস সালামের শিক্ষাজীবনের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ওই সময়ে একজন বাঙালি মুসলমান হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করে পাস করা ছিল উল্লেখযোগ্য বিষয়। তিনি প্রথমে ভালো বেতনের সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। পরে সেই চাকরি ছেড়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।

রিজভী বলেন, শিক্ষিত মানুষের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করার যে ধারণা তিনি একটি উপন্যাসে পড়েছিলেন, আবদুস সালামের জীবন তারই বাস্তব উদাহরণ। লাভজনক সরকারি চাকরি ছেড়ে সাংবাদিকতায় আসা ছিল তার আদর্শ ও স্বাধীনচেতা মানসিকতার প্রকাশ।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আবদুস সালামের জীবনের নানা মিলের কথাও তুলে ধরেন রিজভী। তিনি বলেন, নজরুল কবির পাশাপাশি সাংবাদিকও ছিলেন। দুজনই তাদের লেখনীর কারণে কারাবরণ করেছেন এবং নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। ১৯৭৬ সালে দুজনই একুশে পদকে ভূষিত হন।

ভাষা আন্দোলনের সময় আবদুস সালামের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, পাকিস্তান আমলে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেও তাকে গ্রেফতার হতে হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি একটি কলামে ভাষার পক্ষে কথা বলেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়।

পরে আবদুস সালাম রাজনীতিতেও যুক্ত হন বলে জানান রিজভী। যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে সংসদ সদস্য হওয়ার পরও সাংবাদিকতার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। বিভিন্ন সময়ে চাকরি করে সংসার চালানোর পাশাপাশি তিনি আবার ‘অবজারভার’-এ কাজ করতেন।

আইয়ুব খানের ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স’ বইয়ের সমালোচনা করে আব্দুস সালামের লেখা প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, তিনি ওই বইয়ের কঠিন সমালোচনা করেছিলেন। এর পরদিনই অবজারভার বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সামরিক শাসন হোক কিংবা সীমিত গণতান্ত্রিক পরিবেশ, স্বাধীনচেতা সাংবাদিকদের ওপর বিভিন্ন সময়ে চাপ ও আক্রমণ এসেছে।

আবদুস সালামকে শুধু সাংবাদিক নয়, একজন ‘অ্যাক্টিভিস্ট সাংবাদিক’ হিসেবে উল্লেখ করেন রিজভী। তার ভাষ্য, সাংবাদিকতা শুধু ডেস্কে বসে লেখালেখির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজ ও রাষ্ট্র যখন বিপদের মুখে পড়ে, তখন একজন বিবেকবান ও শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব হলো সেই বিপদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। আবদুস সালাম সেই দায়িত্ব থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।

রিজভী আরও বলেন, স্বাধীনচেতা ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কারণে আবদুস সালাম শুধু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেই নয়, পাকিস্তানের প্রেস কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্বও পেয়েছিলেন। তার সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য ছিল বস্তুনিষ্ঠতা ও স্বাধীনতা।

আবদুস সালামের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের অজ্ঞতার বিষয়েও আক্ষেপ করেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, এত বড় মাপের একজন সাংবাদিক সম্পর্কে এখন যত বেশি জানা যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে তিনি যেন ইতিহাসের যবনিকার আড়ালে চলে গেছেন। নতুন প্রজন্মের অনেকেই তার সম্পর্কে জানে না।

রিজভী বলেন, আবদুস সালামের সময়ে সংবাদপত্রের মালিকপক্ষ রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত পোষণ করলেও সাংবাদিকের স্বাধীনতায় সব সময় হস্তক্ষেপ করত না। সেসময় সাংবাদিকতার একটি মানদণ্ড ছিল। মালিকপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হলেও সাংবাদিক তার স্বাধীন মতপ্রকাশ করতে পারতেন।

বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, লাভজনক সরকারি চাকরি ছেড়ে সাংবাদিকতা পেশায় আসার মতো দৃষ্টান্ত এখন খুবই কম। তরুণদের অনেকেই সাংবাদিকতার চেয়ে প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করেন। ফলে আবদুস সালামের মতো আদর্শ সাংবাদিকের জীবন বর্তমান প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, একসময় সাংবাদিকেরা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশকে তাদের দায়িত্ব মনে করতেন। অর্থ, হুমকি কিংবা ক্ষমতার কাছে তারা মাথানত করতেন না। আবদুস সালাম ছিলেন সেই সাংবাদিকতার প্রতীক।

তিনি আরও বলেন, আমরা তো গণতন্ত্রের কথা বলি। যখন খানিকটা দুর্বল গণতন্ত্র থাকে, তখনো যারা প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন—সে স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা নয়, মানুষের স্বাধীনতা, নাগরিক স্বাধীনতা—তারা সব সময় নিপীড়িত হয়েছেন।

রিজভী বলেন, স্বৈরাচারী শাসনে জনগণকে দমনে যেমন লাঠি ও ডান্ডা অপরিহার্য, তেমনি তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যাদের অন্তরে স্বৈরাচারী বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তারা মিডিয়াকে লাঠির মতো ব্যবহার করে। লাঠি যেমন খালি চোখে দেখা যায়, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের এই রূপটি সহজে দেখা যায় না; বরং প্রচারযন্ত্রকে ব্যবহার করে মানুষের মনকে শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালানো হয়।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক লোটন একরামের সঞ্চালনায় সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম, তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভুইয়া, টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিলের আহ্বায়ক ড. আবদুল হাই সিদ্দিক, সদস্যসচিব ও সময় টিভির সিইও জুবায়ের বাবু, সাংবাদিক আবদুস সালাম স্মৃতি সংসদের সভাপতি রেহানা সালামসহ অনেকেই।