বগুড়া জেলা প্রতিনিধি :
বগুড়ায় চোর সন্দেহে শামিম হোসেন (৩৫) নামে এক যুবককে নির্যাতনের পর পায়ের রগ কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছেন নিহতের স্বজনেরা।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বগুড়া সদর উপজেলার বারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত শামিম হোসেন বগুড়া সদর উপজেলার নামুজা ইউনিয়নের চৌমুহনী এলাকার আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে। তার মরদেহ বর্তমানে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
এ ঘটনায় নিশিন্দারা ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা এবিএম শাফি, তার ছেলে ছাত্রদল নেতা নাজমুল হোসেন কাইয়ুমসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন নিহতের স্বজনরা।
এদিকে শামিমের মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে মঙ্গলবার সকালে নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা বারপুর ও পীরব আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় তারা ইউনিয়ন পরিষদের সামনে সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। খবর পেয়ে বগুড়া সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
নিহতের স্ত্রী রুমানা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার স্বামীকে যারা মারছে, তাদের ফাঁসি চাই আমি। আমার দুই বাচ্চা এতিম হইছে, তাদের বাপ ছাড়া কেউ নেই। যারা আমার স্বামীকে বিনা দোষে মারছে, তাদের আমি মৃত্যুদণ্ড চাই।
একই অভিযোগ করেন নিহতের খালা শাশুড়ি বুলবুলি। তিনি বলেন, আমার জামাই মারা যাওয়ায় কাল মাটি দিতে আসছিল শামিম। সকালে আমরা ফজরের নামাজ পড়ব, তার আগেই তাকে মেরে শেষ করে দিছে। শাফি মেম্বারের ছেলেদের সঙ্গে আরো লোকজন মিলে শামিমকে মারছে। আমার বোনের বাড়িত আগেও দুইবার আগুন লাগায় দিছিল, আজ জামাইকে সুযোগ পেয়ে মেরে ফেলছে।
নিহতের শাশুড়ি ছোবেদা বেগম বলেন, মেয়ের জামাইয়ের দাফন কাজে অংশ নিতে শামিম বারপুর এলাকায় এসেছিল। রাতে ওই এলাকায় হাঁটাহাঁটি করছিল। এ সময় ইউপি সদস্য এবিএম শাফি, তার ছেলে নাজমুল হোসেন কাইয়ুমসহ কয়েকজন তাকে আটক করে মারধর করে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, একপর্যায়ে শামিমের পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ফেলে রাখা হয়। খবর পেয়ে গ্রাম পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা শামিম হোসেন বলেন, নিহত শামিম তাদের এলাকায় এক স্বজনের দাফন কাজে অংশ নিতে এসেছিলেন। রাতে শারীরিক সমস্যার কারণে তিনি ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন। তবে তাকে চোর সন্দেহে আটক করা হয়।
তিনি বলেন, শাফি মেম্বারের ছেলে ও আরও কয়েকজন তাকে আটক করে মারধর করে। একপর্যায়ে তার পায়ের রগ পর্যন্ত কেটে দেওয়া হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব।
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক ইউপি সদস্য শফিকুর রহমান শফি বলেন, আমি দুর্ঘটনায় মারাত্মক অসুস্থ হয়ে বেডরেস্টে আছি। রাত প্রায় তিনটার দিকে এলাকার ছেলেরা ফোন দিয়ে জানায় ডিপ টিউবওয়েলের তার চুরি করার সময় একজনকে ধরা হয়েছে। আমি তখন তাদের মারধর না করে পরিষদে নিয়ে যেতে বলি এবং গ্রাম পুলিশ গোবিন্দকে ফোন দিয়ে চোরকে হেফাজতে নিতে বলি। যেহেতু ডিউটিতে একা গ্রাম পুলিশ ছিল, তাই আমার ছেলেদেরও পাঠিয়েছিলাম যেন তাকে নিরাপদে পরিষদে সোপর্দ করা হয়। আমার দুই ছেলে গোবিন্দের হাতে শামিমকে তুলে দিয়ে চলে আসে। রাজনৈতিক আক্রোশ ও গ্রাম্য রাজনীতির কারণে আমাকে বা আমার ছেলেদের এ ঘটনায় ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বগুড়া সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী বলেন, নিশিন্দারার মারধরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়নি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নাইটগার্ড ও এলাকার চৌকিদারকে আনা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। নির্দোষ কাউকে অনর্থক হয়রানি করার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ঘটনার বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে এবং তা গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। নিহতের শাশুড়ি যে অভিযোগ করেছেন দাফনে অংশ নিতে আসার পথে ভুক্তভোগীকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়েছে সে সংক্রান্ত তথ্যও আমাদের হাতে এসেছে এবং আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।
ওসি বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছানোর পর স্থানীয়দের সড়ক অবরোধ তুলে নেওয়া হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ঘটনার পেছনে ইউপি সদস্য ও তার ছেলের সংশ্লিষ্টতা বা তাদের আত্মগোপনে থাকার বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না, বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
বগুড়া জেলা প্রতিনিধি 















