চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি :
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীদের নির্মূল করা হবে। বাসিন্দাদের কাউকে উচ্ছেদ করা হবে না। সন্ত্রাসীরা যাদেরই আশ্রয়ে থাকুক না কেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রোববার (৩১ মে) দুপুর দেড়টায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য, মেয়র, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে তিনি সকালে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা পরিদর্শন করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে যারা চ্যালেঞ্জ করার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে, তাদের আশ্রয়স্থল কোথায় আমরা দেখতে চাই। তাদের সর্বশেষ আস্তানাও আমরা নির্মূল করব। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে কার্যকরভাবে এবং জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী। সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক না কেন, তা নির্মূল করতে হবে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক অভিযানে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, সামরিক বাহিনী ও হেলিকপ্টারসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে অংশ নিয়েছে। প্রায় চার হাজার সদস্যের যৌথবাহিনী এখানে কাজ করেছে। আমাদের প্রথম লক্ষ্য এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। সন্ত্রাসীরা যাদেরই আশ্রয়ে থাকুক না কেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর ও আশপাশের এলাকাকে সন্ত্রাসমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জঙ্গল সলিমপুর আর কোনও বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর এলাকা বা অভয়ারণ্য হিসেবে থাকবে না। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই এলাকায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, দেশে কার্যকরভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক না কেন, তা সম্পূর্ণ নির্মূল করা হবে। রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো দুঃসাহস যে সমস্ত সন্ত্রাসী দেখিয়েছে, তাদের সম্পূর্ণভাবে দমন করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সলিমপুর, জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরসহ পার্শ্ববর্তী সমগ্র এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। সেজন্য এই অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পরিকল্পিত সরকারি স্থাপনা ও একাডেমি নির্মাণের লক্ষ্যে আজ সব বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে ম্যাপ পর্যালোচনা করে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের বর্তমান কারাগারটি বায়েজিদ লিংক রোডের পাশের এলাকায় স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শিগগিরই স্থানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন। কারা অধিদফতর প্রথমে কারাগারের নির্ধারিত স্থানটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পরবর্তী উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করবে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি। অন্যান্য সরকারি দফতরের জন্য কোনও স্থানে কী স্থাপনা করা হবে, তাও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও যৌথ অভিযান প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে কেবল প্রচলিত ধারার পুলিশিং নয়, বরং র্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রের সব বাহিনী হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। রাষ্ট্রের কল্যাণে ও জননিরাপত্তা বিধানে সব বাহিনী একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। জঙ্গল সলিমপুরের মতো রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি ও বোয়ালখালীসহ সব অঞ্চলের সন্ত্রাসীদের তালিকা ও আস্তানা চিহ্নিত করে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্মূল করা হবে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর হামলাকারী ও আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের কোনও ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের সব আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জঙ্গল সলিমপুর, আলীনগর এবং আশপাশের এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, সরকারি স্থাপনা নির্মাণ ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সম্ভাব্য নতুন কারাগার স্থাপনের স্থানও পরিদর্শন করা হয়েছে। তবে এলাকাবাসীকে উচ্ছেদ করা হবে না এবং যাদের পুনর্বাসনের প্রয়োজন হবে তাদের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে মন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক, তা নির্মূল করতে হবে। সন্ত্রাসীরা যে দুঃসাহস দেখিয়েছে, আমরা রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে তা যথাযথভাবে অ্যাড্রেস করব। তাদের আশ্রয়স্থল যেখানেই হোক এবং যারাই তাদের প্রশ্রয় দিক না কেন, সবকিছু চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জঙ্গল সলিমপুর, সলিমপুর ও আলীনগর এলাকার সাধারণ বাসিন্দাদের উচ্ছেদের আশঙ্কার বিষয়ে আশ্বস্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো সাধারণ বাসিন্দাকে উচ্ছেদ করা হবে না। যারা সেখানে বিভিন্নভাবে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। তবে ওই অঞ্চলের উন্নয়ন এবং সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা ও একাডেমি গড়ে তোলার জন্য ম্যাপ অনুযায়ী জায়গা নির্ধারণের কাজ চলছে।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তরের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, লিংক রোডের পাশে কারাগারের জন্য প্রস্তাবিত জায়গাটি ভিজিট করা হয়েছে। কারা অধিদপ্তর ও আইজি প্রিজন জায়গাটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর সেখানে দ্রুত পরবর্তী উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হবে।
অভিযানের সক্ষমতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে শুধু প্রথাগত পুলিশিং নয়; বরং পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনীসহ প্রায় ৪ হাজার সদস্যের যৌথবাহিনী হেলিকপ্টার সহায়তায় অত্যন্ত সফল অভিযান পরিচালনা করেছে। সবাই রাষ্ট্রের কল্যাণে এবং জননিরাপত্তার স্বার্থে এক হয়ে কাজ করছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘তার বাহিনী’ উল্লেখ করে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কোনো বাহিনীর কোনো তফাৎ নেই। সবাই সরকারের অঙ্গ। রাষ্ট্রের সব বাহিনী জনগণের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থে কাজ করবে।
গণমাধ্যমের প্রতি সহযোগিতা কামনা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আপনারা যদি সঠিক তথ্য দেন এবং সহযোগিতা করেন, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য তা অত্যন্ত সহায়ক হবে। জনগণের নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, সরওয়ার জামাল নিজাম, এরশাদ উল্লাহ, মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, মোহাম্মদ এনামুল হক, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, জসীম উদ্দীন আহমেদ, সাঈদ আল নোমান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন, ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান, সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা প্রমুখ।
চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি 






















