গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি :
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে খালের ওপর সংযোগ সড়ক ছাড়াই নির্মিত হয়েছে ব্রিজ। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে সদ্য নির্মিত ব্রিজটি স্থানীয় ও ওই পথে চলাচলকারী মানুষের কোনো কাজেই আসছে না। পথচারীদের বাঁশ ও কাঠের তৈরি সাঁকো বেয়ে উঠতে হচ্ছে ব্রিজে। এতে তাদের ভোগান্তি যেন রয়ে গেছে আগের মতোই।
উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ বাড়াইকান্দি গ্রামে খালের ওপর কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেতু নির্মাণ করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ অধিদপ্তর। যার বাস্তাবায়ন ও কাজ তদারকির দায়িত্বে ছিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়।
সুন্দরগঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় (পিআইও) সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ অধিদপ্তরের গেল ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে শ্রীপুর ইউনিয়নের বাড়াইকান্দি খালের ওপর ১ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪ ফুট প্রস্থের একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। যার কাজের দায়িত্ব পায় রামিম এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গত ৩০ জুন সেতুটির নির্মাণকাজের মেয়াদ শেষ হয়েছে।
সূত্র জানায়, চুক্তি অনুযায়ী সেতুটির উভয় পার্শ্বে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করার কথা থাকলেও কাজের মেয়াদ শেষ হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তা করেননি। অভিযোগ রয়েছে, পিআইও অফিসের যোগসাজশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সংযোগ সড়ক নির্মাণ না করেই বিল তুলে নিয়েছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের শেষ সীমানা বাড়াইকান্দি (চরপাড়া) গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়াইকান্দি গ্রামের খালের ওপর বীরদর্পে দাঁড়িয়ে আছে নতুন ব্রিজ। কিন্তু দুই পাশেই সংযোগ সড়কের পরিবর্তে রয়েছে সরু বাঁশের সাকো। ব্রিজের নিচ ও দুই পাশের বাঁশের সাকোর নিচ দিয়ে বইছে নালার পানির স্রোতধারা। বাঁশের সাকো হয়ে সেতু দিয়ে হেঁটে পারাপার হচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীসহ শিশু-বৃদ্ধ সব বয়সীরাই চলছেন ওই পথে। সেতুর দুই দিক থেকে মানুষ সাইকেল চালিয়ে ব্রিজের কাছে এসে নেমে যাচ্ছে। অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন তারা।
স্থানীয়রা জানান, শ্রীপুর ইউনিয়নের চেংমারি, বড়ঘাট, গলবাড়িসহ কয়েকটি গ্রামের মানুষ এবং পাশের কাপাশিয়া ইউনিয়নসহ অন্তত ২০ হাজার মানুষ প্রতিদিন এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। অথচ সেতু নির্মাণের পর একদিনও চলাচল করতে পারেনি মোটরসাইকেল, রিকশা-ভ্যান কিংবা অন্য কোনো যানবহন। এখন বর্ষা মৌসুম চলছে, যা থাকবে আগামী আরো কয়েকমাস। তার ওপর বৃষ্টি হলেই কাঠের সাকো পিচ্ছিল হয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে বলে জানান তারা।
তাদের অভিযোগ, প্রায় তিন মাস আগে শেষ হয়েছে সেতুর নির্মাণকাজ। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হেয়ালিপনা আর পিআইও অফিসের দায়িত্বহীনতায় ব্রিজের সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হয়নি। সংযোগ সড়ক নির্মাণে ঠিকাদার ও পিআইও অফিস সংশ্লিষ্টদের একাধিকবার জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ তাদের। অথচ কাজ শেষ না হলেও পুরো বিল দেওয়া হয়েছে ঠিকাদারকে। দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সেতুটি চলাচলের উপযোগী করার দাবি এলাকাবাসীর।
অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা দিতে যাওয়া কামারজানী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়গামী দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহানা আক্তার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ব্রিজটা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কোনো কাজে আসছে না। আগেও আমাদের এই পথে বাঁশের সাকোতে হেঁটে যেতে হতো। এখন ব্রিজ হওয়ার পরও হেঁটেই যেতে হচ্ছে। দুই পাশে সড়ক না থাকার কারণে কোনো যানবাহন চলতে পারছে না।
দাঁড়িয়াপুর আমান উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মমিন মিয়া বলেন, আমরা বাড়ি থেকে সাইকেলে চড়ে এসে ব্রিজের পাড়ে নেমে পার হতে হয়। আবার ওপারে পার হয়ে আবার সাইকেলে চড়তে হয়। ব্রিজের দুই পারেই দুটি বাঁশের সাকো ঠেলে পার হতে হয়। যা আমাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টের।
স্থানীয় ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন বলেন, এই পথে কোনো মালামাল নিয়ে যাওয়া যায় না। সাইকেল নিয়ে এসেও হেঁটে যেতে হয়। কোনো যানবাহন যায় না। সংযোগ সড়কে মাটি দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
মনসুর আলী নামের আরেক পথচারী বলেন, কোটি টাকার ব্রিজ করে আমাদের কোনো কাজে আসছে না। আগেও কাঠের সাকো দিয়ে শুধু মানুষ পারাপার হয়েছে। এখনও শুধু মানুষ চলতে পারে এই পথে। অথচ সংযোগ সড়কটি হলে এদিক দিয়ে ধান, পাট, ভুট্টসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যেতে পারতো, বিভিন্ন যানবাহন চলতে পারতো। উপকার হতো হাজার হাজার মানুষের।
বাড়াইকান্দির স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আউয়াল বলেন, শ্রীপুর থেকে গাইবান্ধা শহরে যাওয়ার এটি শর্টকাট সড়ক। এই পথে প্রতিদিন শ্রীপুর ইউনিয়নে অনেকগুলো গ্রামের অন্তত ১৫-২০ হাজার মানুষ যাওয়া-আসা করে। এতে করে বটতলা হয়ে গাইবান্ধা শহরে যেতে তাদের দূরত্ব কমে ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার। ফলে ঝুঁকি নিয়েই মানুষ এই পথে চলাচল করে।
এসময় কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে আব্দুল হামিদ বলেন, সেতুর সংযোগ সড়কে মাঠি আটকানোর জন্য দুই পাশে যে চারটি পায়া থাকে। সেই কাজ সঠিকভাবে করা হয়নি। এখানে মাটি দিলেও মাটি আটকানো যাবে না, ধসে পড়বে। ব্রিজের তুলনায় পায়াগুলো অনেক নিচু করা হয়েছে।
এছাড়া সেতু সংলগ্ন জমির মালিক জেকেরুল্লাহ বলেন, সেতুর কাজ করার সময় বৃষ্টিতে নালায় পানি বাড়তে থাকে। সেসময় নির্মাণাধীন সেতুর নিচে নালা বন্ধ করা ছিলো। বলা হয়েছিলো কাজের সময় পানি নিষ্কাশনের জন্য বড় বড় কয়েকটি পাইপ দিতে। কিন্তু ঠিকাদার শোনেনি। ফলে আমাদের কয়েকজনের কারো ৩ শতক, কারো ২ শতক কারো ৭/৮ শতক জমি স্রোতে ভেঙে গিয়ে গভীর খাদ হয়েছে।
শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে ঠিকাদার ও পিআইওকে একাধিকবার বলা হয়েছে। এখন কাজ কবে-কখন করবে পিআইও আর ঠিকাদারই ভালো জানেন। আপনি পিআইওর সঙ্গে কথা বলেন।
এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে একাধিকবার ফোন করলেও কল রিসিভ করেননি সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মশিউর রহমান।
কাজের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স রামিম এন্টার প্রাইজের ঠিকাদার জিয়াউর রহমান বলেন, সেতুটির কাজের শেষ মুহূর্তে এসে খালে পানি হওয়ার কারণে দুইপাড়ের সড়ক করতে পারিনি। পানি কমে গেলে বা শুকিয়ে গেলে অতিদ্রুত সংযোগ সড়ক বেধে দেওয়া হবে। এসময় জমির মালিকদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ভেঙে যাওয়া জমিও ভরাট করে দেওয়া হবে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি পিআইও অফিসের বরাতে বলেন, ব্রিজের যে পরিমাণ কাজ বাকি আছে, এছাড়া কাজের বিল আটকানো আছে। নির্দেশনা দেওয়া আছে পানি কমে গেলেই দ্রুত সংযোগ সড়কের কাজ করে দেবে ঠিকাদার।
গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি 





















