চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি :
সৌদি আরবে জেল খেটে খালি হাতে দেশে ফিরেছে ৭৬ প্রবাসী। সোমবার (২০ জুলাই) সকালে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান তারা।শূন্য হাতে ফেরা এই রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ১৮ জনকে তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি সহায়তা দিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, (২০ জুলাই) সকাল ৭টা ৪৬ মিনিটে ওমানের ‘সালাম এয়ার’-এর ওভি-৪০১ ফ্লাইটে ওই প্রবাসীরা দেশে ফেরেন। ইমিগ্রেশন পুলিশ ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সহায়তায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ব্র্যাকের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত ‘প্রত্যাশা-২’ প্রকল্পের আওতায় বিদেশ-ফেরতদের তাৎক্ষণিক খাবার ও নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য যাতায়াত ভাতা দেওয়া হয়।
দেশে ফেরা প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা প্রত্যেকেই বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে বৈধ পথেই সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর বিপত্তি শুরু হয়। নির্দিষ্ট সময় শেষে অনেকের বৈধ নথিপত্র (আকামা) নবায়নের সুযোগ দেয়নি নিয়োগকর্তারা। আবার অনেকের বৈধ কাগজপত্রের কথা বলে চাকরিদাতারা মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রতারণা করেছেন। বৈধ নথিপত্র না থাকায় স্থানীয় পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। দেশে ফেরার আগে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাগারে মানবেতর জীবন কাটাতে হয়েছে।
ভুক্তভোগী নেত্রকোনার বাসিন্দা মো. রাসেল বলেন, চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে দালালের মাধ্যমে দুই বছর আগে সৌদি আরব গিয়েছিলাম। শুরুতে কোনো কাজ পাইনি। পরে মরুভূমিতে উটের খামারে কাজ জুটলেও ঠিকমতো বেতন দেয়নি। আকামার মেয়াদ না থাকায় ১৬ দিন জেল খেটে আজ এক কাপড়ে দেশে ফিরলাম। পকেটে বাড়ি যাওয়ার মতো এক টাকাও নেই।
আরেক ভুক্তভোগী খুলনার ইব্রাহীম শেখ। তিনি বলেন, ‘১৫ মাস বিদেশে ছিলাম। প্রথম ৫ মাস কোনো কাজই পাইনি। পরের ১০ মাস কাজ করলেও বেতন পেয়েছি মাত্র ৫ মাসের। বকেয়া বেতন চাইলে মালিক জানান, যে দালাল কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, তিনি সব টাকা নিয়ে গেছে। টিকতে না পেরে দেশে গরু বিক্রি করে আরেক দালালকে টাকা দিই দেশে পাঠানোর জন্য। কিন্তু ওই দালাল উল্টো আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। ২১ দিন জেল খেটে আজ খালি হাতে দেশে ফিরলাম।’
বাগেরহাটের সেলিম শিকদার আক্ষেপ করে বলেন, ‘১০ মাস আগে সৌদি আরব গিয়েছিলাম। ছয় মাস কাজ করেও ঠিকমতো বেতন পাইনি। পাওনা বেতন দাবি করায় উল্টো কফিল (মালিক) আমার নামে মামলা দিয়ে দেয়। ২২ দিন কারাভোগ করে আজ দেশে ফিরতে হলো।’
দেশে ফেরা প্রবাসীরা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে জানান, দেশি-বিদেশি দালাল ও এজেন্সির অভিনব ভিসা জালিয়াতির কারণে পদে পদে চরম আর্থিক ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন নিরীহ বাংলাদেশিরা। এতে সৌদি আরবে বাংলাদেশের বিশাল শ্রমবাজারও ক্রমশ হুমকির মুখে পড়ছে। এ বিষয়ে তারা সরকারের কঠোর আইনি পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেছেন। একই সঙ্গে দালালের প্রলোভনে পা না দেওয়ার জন্য বিদেশগামীদের অনুরোধ জানিয়েছেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৪৫ হাজারেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশফেরত অভিবাসীকে জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়েই ৫ হাজারের বেশি প্রবাসীকে এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি 






















