জামালপুর জেলা প্রতিনিধি :
জামালপুর শহরের একটি ভাড়া বাসা থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ার খবর পেয়ে দরজা ভেঙে এক ছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাত সাড়ে ১০টার দিকে শহরের দক্ষিণ কাচারিপাড়া এলাকার স্বপ্নপুরী আবাসিক এলাকার বকুল ভিলা ভবনের একটি কক্ষ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
লাশ উদ্ধার হওয়া ইশরাত জাহান রিমা মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুড়ি পন্ডিতপাড়া এলাকার মো. রশিদুল্ল্যাহ মণ্ডলের মেয়ে। তিনি জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের ইংরেজি বিভাগের স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
জামালপুর সদর থানা-পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় তিন মাস আগে রিমা ওই বাসা ভাড়া নেন। বাসা নেওয়ার সময় তিনি নিজেকে বিবাহিত বলে জানিয়েছিলেন। তিন-চার দিন ধরে তাঁর কক্ষের দরজা বন্ধ ছিল। একপর্যায়ে কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ বের হলে বিষয়টি বাসার মালিককে জানান পাশের বাসার লোকজন।
বাসার মালিক দরজা ভেতর থেকে বন্ধ এবং দুর্গন্ধ বের হতে দেখে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা বন্ধ পেয়ে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় রিমার মরদেহ দেখতে পান তাঁরা।
রিমার পরিবারের সদস্যরা জানান, এর আগে রিমার একটি বিয়ে হয়েছিল। ওই সংসারে তাঁর একটি ছেলেসন্তান রয়েছে। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় পরে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। সন্তানকে প্রথম স্বামীর কাছে রেখে রিমা বাবার বাড়িতে চলে আসেন।
এরপর ২০২৪ সালে মাদারগঞ্জ উপজেলার চাঁদপুর এলাকার জেবু তালুকদারের ছেলে শুভর সঙ্গে রিমার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাঁরা গোপনে বিয়ে করেন। বিয়ের পর রিমাকে আশেক মাহমুদ কলেজে ভর্তি করা হয়। তাঁদের বিয়ের বিষয়টি জানাজানি হলে শুভর পরিবারের সদস্যরা তা মেনে নেননি। পরে শুভর বাবা তাঁর ছেলেকে অন্যত্র বিয়ে দেন।
তবে এরপরও রিমার সঙ্গে শুভর যোগাযোগ ও একসঙ্গে বসবাস অব্যাহত ছিল বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। তাঁদের মধ্যে মাঝেমধ্যে মোবাইল ফোনে কথা-কাটাকাটি ও ঝগড়া হতো। কিছুদিন আগে শুভ কম্বোডিয়ায় গেলেও ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতায় দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার পরও রিমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বজায় ছিল। গত সপ্তাহেও তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন বলে পরিবারের দাবি।
তাঁদের অভিযোগ, রিমার সঙ্গে শুভর সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়ে থাকতে পারে। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে রিমা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বলে তাঁরা ধারণা করছেন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
রিমার সহপাঠী সানজিদা আফরিন বলেন, ‘রিমা অনেক মেধাবী ছিল। তাকে কখনো মন খারাপ করতে দেখিনি। সবার সঙ্গে মিশত।’
বাসার মালিক মোবারক হোসেনের ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, প্রায় চার মাস আগে রিমা বাসা ভাড়া নেন। বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় তিনি নিজেকে বিবাহিত এবং ওই ব্যক্তিকে তাঁর স্বামী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। রিমা আশেক মাহমুদ কলেজে পড়াশোনা করতেন।
সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ মনোয়ার হুসেন মুরাদ বলেন, ‘রিমার মর্মান্তিক খবরটি শুনে গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছি। রিমা আমাদের বিভাগের একজন শিক্ষার্থী ছিল। তার এমন মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। এখনো পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন হোক এবং সত্য সামনে আসুক, সেটিই প্রত্যাশা।’
জামালপুর সদর থানার ওসি (তদন্ত) মো. নাজমুল জান্নাত শাহ বলেন, ৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে যায়। পরে বদ্ধ কক্ষের দরজা ভেঙে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
জামালপুর জেলা প্রতিনিধি 






















