স্পোর্টস ডেস্ক :
বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে ম্যাচের শুরু থেকেই দাপুটে ফুটবল খেললো স্পেন। একের পর এক আক্রমণে ব্যস্ত রাখল আর্জেন্টিনার রক্ষণ। লামিন ইয়ামাল, রদ্রি, দানি ওলমোদের দুর্দান্ত পারফর্ম্যান্সে দারুণসব আক্রমণ শাণীয়েও প্রথমার্ধে গোলের দেখা পেল না স্প্যানিশরা। ওদিকে প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলাতেই হিমশিম খাওয়া আর্জেন্টাইনরাও মেলে ধরতে পারেছিলেন না নিজেদের। দ্বিতীয়ার্ধেও দেখা মিলল একই চিত্রের। লুই দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা বারবার গোলের কাছে গিয়েই খেই হারাচ্ছিলেন। আর রক্ষণ সামলে স্পেনের বক্সেই যেতে পারছিলেন মেসিরা, উল্টো যোগ করা সময়ে এঞ্জো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখলে আলবিসেলেস্তেরা পরিণত হয় দশ জনের দলে। এদিকে গোলখরার ম্যাচটি নির্ধারিত নব্বই মিনিট শেষে গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। আর অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধেই দুর্দান্ত আক্রমণ থেকে নিকো উইলিয়ামসের পাসে বল পেয়ে দারুণ এক ভলিতে গোল করলেন বদলি নামা ফেরান তোরেস। তাঁর এই গোলেই দশজনের আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে সোনালী ট্রফিটি নিজেদের করে নিল লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা।
২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম শিরোপা জিতেছিল স্পেন। সেবার নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্প্যানিশরা। প্রথম ট্রফি জয়ের ২৬ বছর পর এসে দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পেল ইউরোপিয়ান পরাশক্তি দলটি। একই সঙ্গে ইউরো জয়ের পর বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ডও গড়লেন লামিন ইয়ামালরা।
নিউইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে শিরোপার লড়াইয়ে দুই দলই নেমেছে শক্তিশালী একাদশ নিয়ে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের শুরু থেকেই দাপুটে ফুটবল খেলেছে স্পেন।
লিওনেল মেসিকে নাকি পুরোপুরি আটকে রাখা যায় না- অসম্ভব কাজটি কী দারুণভাবেই না করে দেখাল স্প্যানিশরা। দে লা ফুয়েন্তের কৌশল এতটাই দুর্দান্তভাবে মাঠে প্রয়োগ করলেন রদ্রি-ওলমোরা, তাতে প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরানোর সুযোগই পাননি রেকর্ড আটবারের বর্ষসেরা ফুটবলার।
ম্যাচের অন্যান্য পরিসংখ্যানে কিছুটা হলেও ফুটে উঠছে স্পেনের দাপট আর আর্জেন্টিনার নাজেহাল অবস্থা। প্রায় ৬৫ শতাশ সময় পজেশন রেখে গোলের জন্য ২০টি শট নিয়ে ১২টি লক্ষ্যে রাখতে পারে ২০১০ সালের বিশ্বকাপ জয়ীরা। আর দুটি শট নিয়ে একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা।
টানা ৩৭ ম্যাচে অপরাজিত থেকে ফাইনালে আসা ইউরো চ্যাম্পিয়নদের নিখুঁত ও গোছানো ফুটবলের সামনে কার্যত অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে আলবিসেলেস্তেদের।
ম্যাচের শুরু থেকেই মাঠে স্প্যানিশদের দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে আর্জেন্টাইন রক্ষণভাগকে তটস্থ করে রাখে ফুয়েন্তের দল। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটেই স্প্যানিশদের এগিয়ে নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামাল। বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম বড় সুযোগটি পায় লা রোজা। ইয়ামাল বক্সে ক্রস বাড়ানোর চেষ্টা করেন এবং বলটি ডিফ্লেক্ট হয়ে ওলমোর কাছে চলে যায়। ওলমো দারুণভাবে বলটি আবার তার দিকেই বাড়িয়ে দেন। ইয়ামাল বলটি নিয়ন্ত্রণে নেন। কিন্তু লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও এমিলিয়ানো মার্টিনেজের যৌথ প্রচেষ্টায় বলটি জালে জড়াতে পারেনি!
ফাইনালটিতে শুরু থেকেই দুই দলের আক্রমণ ও প্রতিআক্রমণে এক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলেছে। ওয়ারজাবাল চমৎকার এক ফ্লিকে পোরোর উদ্দেশ্যে বল বাড়িয়েছিলেন। তাকে ম্যাক অ্যালিস্টার ফাউল করে ফেলে দেন। কিন্তু রেফারি স্লাভকো ভিনসিক ফাউলের সেই আবেদন নাকচ করে দেন!
দুই দলের মধ্যে স্পেনই শুরুটা ভালো করেছে, তবে আর্জেন্টিনাও ভীতি ছড়ায়। এর ঠিক কিছুক্ষণ আগে ৭ মিনিটে সিমন দ্রুত নিজের লাইন ছেড়ে সামনে এগিয়ে এসে মেসিকে নিশ্চিত গোলের সুযোগ পাওয়া থেকে দুর্দান্তভাবে রুখে দেন!
প্রথম ২৩ মিনিটে মাত্র ৩২ শতাংশ বল দখলে রাখতে পেরেছে আর্জেন্টিনা। তাদের তিন ফরোয়ার্ড লিওনেল মেসি, নিকো গঞ্জালেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ মিলে মাত্র ১৭ বার বলে পা ছুঁতে পেরেছেন।
স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি পুরো মাঠ জুড়ে খেলছেন। এমনকি ডিফেন্সেও তৃতীয় সেন্টার ব্যাকের ভূমিকায় তিনি। বল দখলেও রাখছেন দারুণ অবদান। এছাড়া আর্জেন্টিনার অর্ধেও চাপ তৈরি করছেন। স্পেনের তীব্র আক্রমণের সঙ্গে পেরে উঠছে না আর্জেন্টিনা।
স্পেন তাদের আক্রমণের চাপ আরও বাড়ায়। ৩৯ মিনিটে লাপোর্তে, রদ্রি ও বায়েনা নিজেদের মধ্যে দারুণ বোঝাপড়ায় বল দেওয়া-নেওয়া করেন। এরপর ফাবিয়ান আলতো টোকায় বল বাড়িয়ে দেন ওয়ারজাবালের দিকে। তিনি বক্সের প্রান্ত থেকে প্রথম সুযোগেই বাম পায়ের এক জোরালো শট নেন। কিন্তু মার্টিনেজ নিচে নেমে এসে দারুণভাবে বলটি রুখে দেন।
৪১ মিনিটে ওয়ারজাবালকে ফাউল করে বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। দুই মিনিট পর ইনজুরির লক্ষণ নিয়ে তিনি নিকোলাস ওতামেন্দির বদলি হন। পর্তুগাল ম্যাচের পর থেকে স্পেনের প্রতি ম্যাচেই প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় ইনজুরি নিয়ে মাঠ ছাড়লেন। একই সময়ে কুকুরেয়ার দারুণ একটি প্রচেষ্টা ডানপাশের পোস্টের সামনে দিয়ে মাঠের বাইরে যায়।
হাফটাইমের আগে ৬৫ শতাংশ বল পজেশনে রেখেছিল স্পেন। মাত্র ৩৫ শতাংশ আর্জেন্টিনা। লক্ষ্যে লা রোজারা শট রেখেছে দুটি। পাসেও দ্বিগুণ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল স্পেন। আর্জেন্টিনার ১৫৫ নিখুঁত পাসের বিপরীতে তাদের ৩১৩! পুরোটা সময় লক্ষ্যে তো বটেই, কোনো শট নিতে পারেনি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। স্পেনের গোলকিপার উনাই সিমন দুইবার ক্লিয়ার সুইপ করে তাদের প্রচেষ্টা নষ্ট করে দেন। স্পেন ফাইনাল থার্ডে ৩৫ বার ঢুকেছে, যেখানে আর্জেন্টিনা মাত্র ১৮ বার।
অন্যদিকে পুরো প্রথমার্ধে কার্যত নিষ্প্রভ ছিলেন মেসি। স্পেনের উচ্চ প্রেসিংয়ের কারণে খুব কমই বল পেয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বিরতির আগে আর্জেন্টিনা গোলমুখে উল্লেখযোগ্য কোনো শটই নিতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধেও একই চিত্র। স্পেন একের পর এক সুযোগ তৈরি করলেও দুর্দান্ত গোলরক্ষণে দলকে ম্যাচে রাখেন মার্তিনেস।
দ্বিতীয়ার্ধে লিওনেল স্কালোনি পরিবর্তন আনেন দলে। প্রথমবার শুরুর একাদশে সুযোগ পাওয়া নিকো গঞ্জালেজকে উঠিয়ে নামান লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে। দ্বিতীয়ার্ধের দ্বিতীয় মিনিটে স্পেন ভালো সুযোগ তৈরি করেছিল। ওয়ারজাবালের পাস ধরে বায়েনা শট নেন। তার দুর্বল শট মাটিতে লাফিয়ে মার্টিনেজের হাতে পড়ে।
বিরতির পর মাঠে নামার পর থেকেই পারদেসের জন্য এই বিশ্বকাপ ফাইনালের শুরুটা যেন একটি দুঃস্বপ্নের মতো হয়েছে! তিনি অযথাই রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেন এবং এই ঘটনার জন্য তাকে হলুদ কার্ড দেখানো হয়। এই সিদ্ধান্তের পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা রেফারিকে ঘিরে ধরেন এবং শেষ পর্যন্ত ওলমো মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
৫৫ মিনিটে ওতামেন্দির শেষ মুহূর্তের ট্যাকল! স্পেন ফাবিয়ানের মাধ্যমে পেছন থেকে পাল্টা আক্রমণ করে। বলটি ওয়ারজাবালের কাছে পৌঁছালে তিনি ফাবিয়ানকে পাস দেন। তিনি শট নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে বলটি পেছনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওতামেন্দি এগিয়ে এসে বলটি বিপদমুক্ত করেন!
পরের মিনিটে আক্রমণে গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল স্পেন। আর্জেন্টিনার বক্সের ডানপ্রান্ত থেকে ওলমোর ব্যাকপাস গোলপোস্টের সামনে কুকুরেয়ার পায়ে পড়ার আগেই গঞ্জালো মন্তিয়েল ক্লিয়ার করেন। দুই মিনিট পর নাহুয়েল মলিনাকে তার বদলি মাঠে নামান স্কালোনি।
৬২ মিনিটে স্পেন দুটি পরিবর্তন আনে। ফাবিয়ানের জায়গায় পেদ্রি এবং ওয়ারজাবালের পরিবর্তে ফেরান তোরেস মাঠে নামেন। দুই মিনিট পর ওলমোর বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া শট রুখে দেন মার্টিনেজ। তিনি বল ধরে রাখতে না পারলেও মাঠের বাইরে যায়।
আর্জেন্টিনার ডানপ্রান্ত থেকে ইয়ামাল দারুণ একটা সুযোগ তৈরি করে দেন। আলভারেজ ও ম্যাকঅ্যালিস্টারকে পেছনে ফেলে বাইলাইন থেকে বার্সা তারকার বাঁ পায়ের ক্রস। তোরেস নিচু হেড করেন। কিন্তু মার্টিনেজের হাতে পড়ে বল।
৭০ মিনিটে আর্জেন্টিনা দুটি পরিবর্তন আনেন। মিডফিল্ডার রদ্রিগো দে পলকে তুলে নিয়ে ফরোয়ার্ড জিউলিয়ানো সিমিওনেকে নামায় তারা। আর ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর বদলে ডিফেন্সে জায়গা পান ফাকুন্দো মেদিনা। ৭৫ মিনিটে স্পেন দুটি পরিবর্তন আনে। ওলমোর জায়গায় মিকেল মেরিনো ও বায়েনার জায়গায় নিকো উইলিয়ামস আসেন।
দুই মিনিট পর গোল করার মতো জায়গা থেকে পেদ্রির শট মার্টিনেজের কারণে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কয়েক মুহূর্ত পর ইয়ামালের দারুণ এক প্রচেষ্টা মেদিনা ব্লক করেন। তবে বল পড়ে কুবারসির পায়ে। দূর থেকে তার নেওয়া শট দুর্ভাগ্যজনকভাবে মার্টিনেজের গায়ে লেগে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ৮০ মিনিটে উইলিয়ামসের ক্রসে ব্যাকপোস্টে আইমেরিক লাপোর্তের দুর্বল হেড তিনি রুখে দেন। ৮৭ মিনিটে তোরেসের একটি শট গোলবারের পাশ দিয়ে যায়।
ইনজুরি সময়ের তৃতীয় মিনিটে উইলিয়ামসের একটি শক্তিশালী শট রুখে দেন আর্জেন্টিনা কিপার। কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন এনজো ফার্নান্দেজ। কুবার্সিকে ফাউল করেন তিনি। শেষ মুহূর্তে পারেদেসের ফাউলের শিকার হন ইয়ামাল। বক্সের সামনে থেকে তার নেওয়া ফ্রি কিক দারুণভাবে রুখে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে রাখেন মার্টিনেজ।
অতিরিক্ত সময়ে প্রথমবার আর্জেন্টিনার জাল কাঁপায় স্পেন। নিকো উইলিয়ামস গোল করেন। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। ৯৬ মিনিটে স্পেন ভেবেছিল তারা এই বিশ্বকাপ ফাইনালে এগিয়ে গিয়েছে! বল স্পর্শ করার জন্য ইয়ামালের প্রচেষ্টা মেরিনোর কাছে পৌঁছায়। তিনি ওতামেন্দির চ্যালেঞ্জকে প্রতিহত করে শট নেন। কিন্তু মার্টিনেজ তা ব্লক করেন!
উইলিয়ামস আলগা বলটি লুফে নিয়ে জালে জড়ান। কিন্তু রেফারি ওতামেন্দির ওপর মেরিনোর ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করে দেন! অবশ্যই ভিএআর এটি পরীক্ষা করে দেখে গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এর কিছুক্ষণ পর দারুণ এক গোলে স্পেনকে এগিয়ে দিলেন তোরেস। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের ২৭ সেকেন্ডে পেদ্রো পোরোর ক্রসে উইলিয়ামসের শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে তিনি জালে বল জড়িয়ে দেন। ফাইনালে পঞ্চম বদলি খেলোয়াড় হিসেবে গোল করলেন তোরেস। সবশেষ ২০১৪ সালে জার্মানির গোৎসের গোলে হার দেখেছিল আর্জেন্টিনা।
১১৩ মিনিটে আরেকবার গোল করেছিলেন তোরেস। কিন্তু তিনি অফসাইডে থাকার কারণে গোলটি বাতিল হয়। ১২০ মিনিটে মেরিনো ও কুবার্সির প্রচেষ্টায় আর্জেন্টিনার একটি গোলের সুযোগ নষ্ট হয়। মেসির ফ্রি কিক থেকে গোলমুখের সামনে সিমিওনে বলে পা ছোঁয়াতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর তার আরেকটি শট গোলবারের উপর দিয়ে যায়।
শেষ বাঁশি বাজতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে স্প্যানিশ শিবির। দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে মাতে তারা, আর হতাশায় ভেঙে পড়েন মেসি ও তার সতীর্থরা।
স্পোর্টস ডেস্ক 























