কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি :
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দ্রুত চার থেকে ছয় লেনে উন্নীত করা হবে। কৃষক ও লবণচাষীরা যাতে উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য পায় বিএনপি সরকার সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
শনিবার (১৩ জুন) সন্ধ্যায় কক্সবাজারের চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনালে চকরিয়া উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, গত ২৫ বছরে কক্সবাজার অঞ্চলের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। অচিরেই মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হবে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ বাস্তবতায় কক্সবাজার-চট্টগ্রাম সড়ককে আরও আধুনিক ও সক্ষম করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সরকারপ্রধান বলেন, আগামী দিনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও যানবাহনের ক্রমবর্ধমান চাপ বিবেচনায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি অন্তত ৬ লেনে উন্নীত হওয়া উচিত। এ সময় তিনি সড়কটি ৪ লেন থেকে ৬ লেনে উন্নীত করার ঘোষণা দেন এবং শিগগিরই এ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে জানান।

তারেক রহমান বলেন, সদ্য বাজেট ঘোষণার পর বাজারে জিনিসের দাম বাড়েনি। যারা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে তারা সকলেই বলেছেন, ঘোষিত বাজেট গণমুখী বাজেট। অথচ যারা ৭১ সাল থেকে ৮৬, ৯৬ ও ২০০৮ সালে দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করেছিল, আবার তারাই গণমুখী বাজেটের বিরুদ্ধে রাস্তায় প্রতিবাদ বিক্ষোভ করছে। এ দলটি জনগণের রাজনীতি করে না। এরা মিথ্যা টিকিট বিক্রি করে মানুষকে ঠকিয়ে ভোট নিয়ে ক্ষমতায় যেতে চায়। এখন কী আমরা ধরে নেব সিগারেট এবং মদের ট্যাক্স বাড়ানোই বিরোধী দল ক্ষুব্ধ হয়েছে।
কক্সবাজারের মাটি বিএনপির ঘাঁটি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঘোষিত বাজেটে কিডনি ডায়ালাইসিস, হার্টের চিকিৎসা, বাইপাস সার্জারি, চোখের সানি চিকিৎসা সামগ্রীতে ট্যাক্স ফ্রি ও কমিয়েছি। আমরা দেশের স্বাস্থ্যখাতে আমূল পরিবর্তন আনতে চাই।
তিনি বলেন, দেশের লাখো কোটি মা-বোনদের স্বাবলম্বী করার জন্য আমরা ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করেছি। কৃষক কার্ডের জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকার আগামী এক বছরে সারা দেশে পর্যায়ক্রমে ৪০ লাখ ফ্যামিলি ও কৃষি কার্ড বিতরণ করবে।
সদ্য ঘোষিত বাজেটের বিপক্ষে রাস্তায় নেমে মিছিল করায় জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। যারা বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় নেমে এর বিপক্ষে মিছিল করে তারা জনগণের বন্ধু হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

বাজেট নিয়ে সমালোচনা করায় জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, বাজেট নিয়ে কিছু কিছু মানুষ সমালোচনা করছে। বাজেট অধিবেশন শেষ হওয়ার আগেই কিছু মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ল। জনগণের বাজেট নিয়ে সমালোচনা করে যারা তারা জনগণের জন্য রাজনীতি করে না। তারা নির্বাচনের আগে টিকিট বিক্রি করে, তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করে, বন্ধু হতে পারে না।
লবণচাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের লবণচাষিরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতির পরিবর্তনে সরকার দ্রুত একটি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করবে, যাতে লবণচাষিরা উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পান।
তিনি বলেন, আজকে সকালে যখন আমি ঢাকা থেকে প্লেনে উঠলাম, প্লেনে পত্রিকা থাকে, আমি পত্রিকাগুলো দেখলাম কী কী নিউজ আছে। পত্রিকাগুলোর মধ্যে দেখলাম সবগুলো পত্রিকা কমবেশি একটি নিউজ করেছে যে, প্রতিবছর বাজেট উপস্থাপনের পরদিন বিভিন্ন জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যেত। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর রহমতে গত পরশুদিন বাজেট উপস্থাপনের পর এই প্রথমবারের মতো কোনো জিনিসপত্রের দাম বাড়েনি।
তিনি বলেন, যেই বাজেট উপস্থাপন করলে জিনিসের দাম বাড়ে না, সেই বাজেট জনগণের পক্ষের বাজেট। এই বাজেটে আমরা বিভিন্ন ওষুধপত্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন চিকিৎসার যে বিষয়গুলো ছিল, সেগুলোর ওপর থেকে আমরা ট্যাক্স কমিয়ে এনেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বাজেটে কিডনি ডায়ালাইসিসের ওষুধ থেকে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিটি ডায়ালাইসিসের রোগীদের ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা সাশ্রয় হবে। হার্টের বাইপাস ও স্টেন্টিংয়ে আগে যেখানে সোয়া লাখ টাকা খরচ হতো, তা কমে এখন প্রায় ৫০-৬০ হাজার টাকায় নেমে আসবে। একইভাবে চোখের লেন্সের ওপর থেকেও কর প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা বয়স্ক ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হবে।

তারেক রহমান বলেন, আমরা বাজেটের দিন দেখলাম। বাজেটের পরেও দেখলাম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেগুলো আছে সেখানে দেখলাম। বিভিন্ন সংবাদ দেখলাম। বিভিন্ন ভিডিও দেখলাম। কী দেখলাম? কতগুলো রাজনৈতিক দল তারা বিএনপি সরকার যে বাজেট দিয়েছে, এই বাজেটের বিপক্ষে তারা প্রতিবাদ জানালো। তারা বলল এই বাজেট হচ্ছে গণবিরোধী বাজেট। এখন বিএনপি সরকার এই ওষুধপত্রের ওপরে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ওপরে ট্যাক্স কমিয়েছে, যাতে করে মানুষ একটু শান্তিতে, স্বস্তিতে থাকতে পারে। কিন্তু বিএনপি সরকার এই বাজেটে কিসের ওপরে ট্যাক্স বাড়িয়েছে বলেন তো ভাই? সিগারেটের ওপরে ট্যাক্স বাড়িয়েছে। মদের ওপরে ট্যাক্স বাড়িয়েছে। এখন যেই রাজনৈতিক দলগুলো ‘মানি না, মানবো না’ বলছে, তাহলে কী আমরা ধরে নেব তারা সিগারেট এবং মদের ওপরে কেন ট্যাক্স বাড়ালো সেই জন্য ‘মানি না, মানবো না’ করছে? তাহলে যারা মদের ওপরে ট্যাক্স বাড়ানোর প্রতিবাদ জানায়, সিগারেটের ওপরে ট্যাক্স বাড়ানোর প্রতিবাদ জানায়, তারা কি জনগণের জন্য রাজনীতি করে? জনগণের জন্য রাজনীতি করে না।
তিনি বলেন, আমরা নির্বাচনের আগেও দেখেছি, এরা গিয়ে জনগণের কাছে বিভিন্ন টিকিট বিক্রি করতো। শুনেছেন না, দেখেছিলেন না? এখন আর টিকিট বিক্রি করে? এখন আর টিকিটের কথা বলে? না। কেন বলে না? কারণ ওই টিকিট দেওয়ার কোনো মালিক বা ক্ষমতা তাদের নেই। তারা জনগণকে ঠকিয়ে শুধু জনগণের ভোটটা নিতে চেয়েছিল, জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল। এখন এই যে যারা মদের ওপরে ট্যাক্স বাড়ানোর জন্য বিক্ষোভ মিছিল করে, যারা সিগারেটের ওপরে ট্যাক্স বাড়ানোর জন্য বিক্ষোভ মিছিল করে, এরা তো জনগণের বন্ধু না। যারা জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের বিরোধিতা করে, তারা প্রকৃত অর্থে জনগণের স্বার্থের পক্ষে নয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা নির্বাচনের সময় বলেছিলাম যে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এই দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন করা এবং সেজন্যই আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছি। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, আমি যখন বিদেশ থেকে ১৭ বছর পরে এই দেশে ফিরে আসি, সেই সময় আমি আপনাদেরকে বলেছিলাম—‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। আজকে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য, আমাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করার জন্য, আমাদের মা-বোনদেরকে স্বাবলম্বী করার জন্য, আমাদের কৃষক ভাইদেরকে স্বাবলম্বী করার জন্য, এই দেশে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার জন্য, এই দেশের বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য, এই দেশের মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য যে সকল পরিকল্পনা—এগুলোই হচ্ছে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’-এর অংশ।
তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর থেকে আমরা দেখেছি, যখনই দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করেছে, যখনই শহীদ জিয়ার নেতৃত্বে, যখনই বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে শুরু করেছে, যখনই বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হতে শুরু করেছে, ঠিক সেই সময়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল। আমরা দেখেছি কীভাবে ১৯৮১ সালে শহীদ জিয়াকে হত্যা করা হয়েছিল। আমরা দেখেছি কীভাবে মাসের পর মাস হরতাল আহ্বান করে এই দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। অতীতের মতো এখনো কিছু মহল দেশের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। তবে জনগণের সমর্থন নিয়ে সরকার উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাবে।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ এনামুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, কক্সবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না।
কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি 


















