গাইবান্ধায় প্রায় ২০ হাজার মানুষের ভরসা নড়বড়ে কাঠের সাঁকো

গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি :

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর ও বেলকা নবাবগঞ্জ গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা নদীর একটি শাখা। নদীটি খুব বড় নয়, দৈর্ঘ্যে মাত্র প্রায় ১২০ ফুট। কিন্তু এই ছোট্ট নদীটিই বছরের পর বছর ধরে দুই পাড়ের প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবনকে বিভক্ত করে রেখেছে। একপাশে বসতি, অন্যপাশে হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র আর জীবিকার পথ। নদীর এপার-ওপারের দূরত্ব হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু দুর্ভোগ আর অনিশ্চয়তার হিসাব সেখানে অনেক দীর্ঘ।

দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে এই নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা ছিল ছোট ছোট নৌকা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই নৌকাতেই চলাচল করতে হতো। কিন্তু বর্ষা এলেই বদলে যেত পুরো চিত্র। তিস্তার উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর তীব্র স্রোতে নদী ভয়ংকর রূপ নিত। তখন অনেক সময় নৌকাও চলাচল বন্ধ হয়ে যেত। দিনের পর দিন দুই পাড়ের মানুষ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তেন বাইরের দুনিয়া থেকে।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ত শিক্ষার্থীরা। স্কুল-কলেজে যেতে না পেরে অনেকের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হতো। পরীক্ষার দিনেও ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে গিয়ে আতঙ্কে থাকতে হতো শিশু-কিশোরদের। অসুস্থ রোগীদের অবস্থা ছিল আরও করুণ। সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারায় অনেক রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে উঠত। প্রসূতি মা, বৃদ্ধ কিংবা জরুরি রোগীদের নিয়ে স্বজনদের উৎকণ্ঠার শেষ থাকত না। অন্যদিকে কৃষকের কষ্টের ফসল ঘরে পড়ে থেকে নষ্ট হতো। হাটে নিতে না পেরে অনেক সময় অল্প দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হতেন তারা।

দীর্ঘদিনের সেই দুর্ভোগ লাঘবের কথা চিন্তা করে ২০১৭ সালে বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহীম খলিলুল্যাহ নিজ উদ্যোগে নদীর ওপর প্রায় ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি কাঠের সাঁকো নির্মাণ করেন। পরে ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ এবং তৎকালীন সংসদ সদস্যের সহযোগিতায় সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। সাঁকো নির্মাণের পর চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা সদর, জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়। কৃষকরা তুলনামূলক দ্রুত ফসল বাজারে নিতে পারেন, ব্যবসায়ীদের যাতায়াত বাড়ে, আর স্কুল-কলেজ ও মাদরাসাগামী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত চলাচলেও নতুন গতি আসে। বহুদিন পর যেন এই চরাঞ্চলের মানুষ একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেন।

সাঁকো তৈরির পর থেকে প্রতিবছরই ইউনিয়ন পরিষদের বার্ষিক বরাদ্দ থেকে চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহীম খলিলুল্যাহ নিজে তদারকি করে সাঁকোটি মেরামত ও সংস্কার করিয়ে আসছেন। কোনো বছর নতুন কাঠ লাগানো হয়েছে, কোনো বছর বাঁশ বদলানো হয়েছে, কোনো বছর পুরো একটি অংশ নতুন করে তৈরি করতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিবছর মেরামত করেও এই সাঁকোকে স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ এটি কাঠ আর বাঁশের তৈরি একটি অস্থায়ী কাঠামো, যার উপর প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ভার পড়ছে।

২০২০ সালের ভয়াবহ বন্যায় সাঁকোটি পুরোপুরি ভেঙে গেলে কয়েক মাস চরম দুর্ভোগে পড়েন এলাকাবাসী। সেবারও ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে নতুন করে সাঁকো নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার সেই একই চিত্র। ভাঙন, মেরামত, আবার ভাঙন। এই চক্রের মধ্যে বন্দী হয়ে আছে চরাঞ্চলের মানুষের জীবন।

এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নদীতে পানি বেড়েছে। সেই সঙ্গে ভেসে আসছে স্তূপ স্তূপ কচুরিপানা। সেই কচুরিপানা সাঁকোর নিচে আটকে জমে উঠছে। কচুরিপানার ভার আর পানির চাপে সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ এখন বেঁকে গেছে, দেবে গেছে। কোথাও কাঠ নরম হয়ে পচে গেছে, কোথাও বাঁশ আলগা হয়ে দুলছে। পুরো সাঁকোটিই এখন ভয়ঙ্করভাবে নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

এই পরিস্থিতিতে গ্রামবাসীরা নিজেরাই হাত লাগিয়েছেন। স্বেচ্ছাশ্রমে কেউ বাঁশ দিয়ে ঠেলে কচুরিপানা সরাচ্ছেন, কেউ নদীতে নেমে হাত দিয়ে টেনে তুলছেন। কিন্তু প্রতিদিন নতুন করে কচুরিপানা এসে জমছে। গ্রামবাসীর এই লড়াই যেন শেষ হওয়ার নয়।

সকাল হলেই সাঁকোটিতে শুরু হয় মানুষের ভিড়। কেউ স্কুলে যাচ্ছে, কেউ বাজারে, কেউ উপজেলা শহরে চিকিৎসার জন্য ছুটছে। কৃষকরা মাথায় সবজি, ধান, ভুট্টা বা মরিচ নিয়ে পার হচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা ব্যাগ কাঁধে সাবধানে পা ফেলছে। বৃদ্ধরা লাঠিতে ভর দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে যান। সামান্য ভুল হলেই নিচে নদীতে পড়ে যাওয়ার শঙ্কা। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে সাঁকোটি ভেজা আর পিচ্ছিল হয়ে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়। তারপরও জীবনের প্রয়োজনে এই সাঁকোই তাদের একমাত্র পথ। প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। কেউ পিছলে পড়ে আহত হচ্ছেন, কেউ সাইকেলসহ নদীতে পড়ে যাচ্ছেন। তবুও থামার উপায় নেই। কারণ এই সাঁকো ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।

স্কুলছাত্র মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এই সাঁকো পার হয়ে স্কুলে যেতে হয়। বর্ষাকালে সাঁকো আরও পিচ্ছিল হয়ে যায়। অনেক সময় বই-খাতা নিয়ে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করে। এখানে একটি স্থায়ী সেতু হলে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে।’

কৃষক আমজাদ আলী বলেন, ‘আমরা চরাঞ্চলের মানুষ অনেক কষ্ট করে ফসল ফলাই। কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবে সেই ফসল ঠিকমতো বাজারে নিতে পারি না। ব্যবসায়ীরা কম দামে ফসল কিনে নেয়। এখানে একটা ভালো সেতু হলে আমরা সরাসরি বাজারে যেতে পারতাম। এতে কৃষকরা ন্যায্য দাম পেতো, এলাকার অর্থনীতিও উন্নত হতো।’

তালুক বেলকা গ্রামের মুদি ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দোকানের মালামাল আনতে গেলে পরিবহন খরচ অনেক বেশি পড়ে। সাঁকো পার হয়ে মালামাল বহন করতে আলাদা লোক লাগাতে হয়। এতে ব্যবসা করতে গিয়ে লোকসানের মুখে পড়তে হয়। একটি সেতু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে এবং মানুষের জীবনযাত্রাও সহজ হবে।’

বেলকা নবাবগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা আকলিমা বেগম বলেন, ‘এই সাঁকোত উঠলে বুকডা একেবারে কাঁপে। খালি ঠ্যাং কাপে, হাত-পা থরথর করে। মনে হয় এই বুঝি নদীতে পড়ে যাই। প্রতিদিনই এই ভয় নিয়ে পার হই। এখানে যদি একটা পাকা ব্রিজ হইতো, তাইলে আমাদের এত কষ্ট হইতো না। আমরা শান্তিতে পার হইতে পারতাম।’

স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক শিহাব মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘এই অঞ্চলের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। নদীতে স্থায়ী সেতু না থাকায় কোনো অ্যাম্বুলেন্স সহজে এখানে আসতে চায় না। জরুরি রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে অনেক সময় নষ্ট হয়। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। একটি সেতু হলে চরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা অনেক সহজ হবে।’

বেলকা নবাবগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা ও মাদরাসা শিক্ষক মো. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের মানুষ নৌকায় পারাপার করলেও এখন কাঠের সাঁকোই একমাত্র ভরসা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এটি ব্যবহার করছে। শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, নারী ও বৃদ্ধ সবাইকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একটি স্থায়ী সেতু হলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই নয়, পুরো চরাঞ্চলের জীবনমান বদলে যাবে।’

শিক্ষক, কবি ও সমাজকর্মী মো. হাবিবুল্লাহ সরকার বলেন, ‘এই সাঁকোটি শুধু একটি পারাপারের পথ নয়, এটি এই চরাঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক। প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই নড়বড়ে কাঠের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, এটা দেখলে বুকটা ভারী হয়ে আসে। ছোট ছোট শিশুরা ভয়ে ভয়ে সাঁকো পার হয়ে স্কুলে যাচ্ছে, এই দৃশ্য যে কোনো সচেতন মানুষের মনকে নাড়া দেবে। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে হলে আগে নিরাপদ পথ দরকার, এটা কোনো বিলাসিতার দাবি নয়, এটা মানুষের ন্যূনতম অধিকার। এই অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও উন্নয়নের আলো থেকে বঞ্চিত, এটা আমাদের জন্য লজ্জার। প্রতিবছর সাঁকো ভাঙে, মেরামত হয়, আবার ভাঙে। এই ক্লান্তিকর চক্রের অবসান ঘটিয়ে এখানে একটি স্থায়ী পাকা সেতু নির্মাণ করা এখন আর শুধু দাবি নয়, এটা এই মাটির মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়।’

তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মো. জিয়াউর রহমান সরকার রয়েল বলেন, ‘আমি এই চরের মাটিতেই বড় হয়েছি, এই মাটিকে ভালোবেসে কৃষিতে উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার এই দুর্দশা আমাদের সব স্বপ্নকে আটকে রাখছে। আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি আনা যাচ্ছে না, সার-বীজ সময়মতো পৌঁছানো যাচ্ছে না, উৎপাদিত ফসল দ্রুত বাজারে নেওয়া যাচ্ছে না। এই সাঁকো পার হয়ে ভ্যানে মাল নেওয়া যায় না, ট্রলি চলে না, কোনো যানবাহনই পার হতে পারে না। ফলে মাঝখান থেকে লাভের গুড় খেয়ে যাচ্ছে ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা। একটি পাকা সেতু হলে এই এলাকার কৃষি অর্থনীতিতে বিপ্লব আসবে। তরুণরা কৃষিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে, গ্রাম থেকে শহরমুখী মানুষের স্রোত কমবে। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমাদের এই ন্যায্য দাবিটুকু পূরণ করুন।’

এলাকাবাসীর দাবি, স্বাধীনতার এত বছর পরও একটি সেতুর অভাবে হাজার হাজার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রতিবছর ইউনিয়ন পরিষদের সীমিত বরাদ্দ দিয়ে কাঠের সাঁকো মেরামত করে কতদিন আর চলবে। এভাবে বারবার অস্থায়ী সমাধানে কাজ হচ্ছে না, দরকার একটি স্থায়ী পাকা সেতু। তারা দ্রুত স্থায়ী সেতু নির্মাণের মাধ্যমে চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘবে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

ইউপি সদস্য মো. হাফিজার রহমান বলেন, ‘চরাঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট এই তিস্তার শাখা নদী। বছরের পর বছর মানুষ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। কাঠের সাঁকো দিয়ে সাময়িকভাবে যাতায়াত সম্ভব হলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। সরকারিভাবে একটি সেতু নির্মাণ হলে এই অঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আসবে।’

বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম খলিলুল্যাহ বলেন, ‘চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকেই এলাকার মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। এই তিস্তার শাখা নদীটি চরাঞ্চলের মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ২০১৭ সালে জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার জন্য নিজ উদ্যোগে এখানে কাঠের সাঁকো নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছরই ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ দিয়ে সাঁকোটি সংস্কার করে আসছি। কখনো আংশিক মেরামত, কখনো পুরোপুরি নতুন করে নির্মাণ করতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিবছর বন্যা আর কচুরিপানার চাপে সাঁকোটির অবস্থা আবার নাজুক হয়ে পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি শুধু একটি চলাচলের পথ নয়, এটি হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, রোগী সবাই এই সাঁকোর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কাঠের সাঁকো দিয়ে আর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি বিবেচনায় এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই অনুমোদন মিলবে এবং চরাঞ্চলের মানুষের বহুদিনের কষ্ট লাঘব হবে।’

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) তপন কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘ওই স্থানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। ইতোমধ্যে সেতু নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পেলেই দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ সেতুটি নির্মাণ হলে শুধু যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি হবে না, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

সাতক্ষীরা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশী আহত

গাইবান্ধায় প্রায় ২০ হাজার মানুষের ভরসা নড়বড়ে কাঠের সাঁকো

প্রকাশের সময় : ০৫:২২:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি :

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর ও বেলকা নবাবগঞ্জ গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা নদীর একটি শাখা। নদীটি খুব বড় নয়, দৈর্ঘ্যে মাত্র প্রায় ১২০ ফুট। কিন্তু এই ছোট্ট নদীটিই বছরের পর বছর ধরে দুই পাড়ের প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবনকে বিভক্ত করে রেখেছে। একপাশে বসতি, অন্যপাশে হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র আর জীবিকার পথ। নদীর এপার-ওপারের দূরত্ব হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু দুর্ভোগ আর অনিশ্চয়তার হিসাব সেখানে অনেক দীর্ঘ।

দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে এই নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা ছিল ছোট ছোট নৌকা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই নৌকাতেই চলাচল করতে হতো। কিন্তু বর্ষা এলেই বদলে যেত পুরো চিত্র। তিস্তার উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর তীব্র স্রোতে নদী ভয়ংকর রূপ নিত। তখন অনেক সময় নৌকাও চলাচল বন্ধ হয়ে যেত। দিনের পর দিন দুই পাড়ের মানুষ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তেন বাইরের দুনিয়া থেকে।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ত শিক্ষার্থীরা। স্কুল-কলেজে যেতে না পেরে অনেকের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হতো। পরীক্ষার দিনেও ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে গিয়ে আতঙ্কে থাকতে হতো শিশু-কিশোরদের। অসুস্থ রোগীদের অবস্থা ছিল আরও করুণ। সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারায় অনেক রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে উঠত। প্রসূতি মা, বৃদ্ধ কিংবা জরুরি রোগীদের নিয়ে স্বজনদের উৎকণ্ঠার শেষ থাকত না। অন্যদিকে কৃষকের কষ্টের ফসল ঘরে পড়ে থেকে নষ্ট হতো। হাটে নিতে না পেরে অনেক সময় অল্প দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হতেন তারা।

দীর্ঘদিনের সেই দুর্ভোগ লাঘবের কথা চিন্তা করে ২০১৭ সালে বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহীম খলিলুল্যাহ নিজ উদ্যোগে নদীর ওপর প্রায় ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি কাঠের সাঁকো নির্মাণ করেন। পরে ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ এবং তৎকালীন সংসদ সদস্যের সহযোগিতায় সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। সাঁকো নির্মাণের পর চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা সদর, জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়। কৃষকরা তুলনামূলক দ্রুত ফসল বাজারে নিতে পারেন, ব্যবসায়ীদের যাতায়াত বাড়ে, আর স্কুল-কলেজ ও মাদরাসাগামী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত চলাচলেও নতুন গতি আসে। বহুদিন পর যেন এই চরাঞ্চলের মানুষ একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেন।

সাঁকো তৈরির পর থেকে প্রতিবছরই ইউনিয়ন পরিষদের বার্ষিক বরাদ্দ থেকে চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহীম খলিলুল্যাহ নিজে তদারকি করে সাঁকোটি মেরামত ও সংস্কার করিয়ে আসছেন। কোনো বছর নতুন কাঠ লাগানো হয়েছে, কোনো বছর বাঁশ বদলানো হয়েছে, কোনো বছর পুরো একটি অংশ নতুন করে তৈরি করতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিবছর মেরামত করেও এই সাঁকোকে স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ এটি কাঠ আর বাঁশের তৈরি একটি অস্থায়ী কাঠামো, যার উপর প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ভার পড়ছে।

২০২০ সালের ভয়াবহ বন্যায় সাঁকোটি পুরোপুরি ভেঙে গেলে কয়েক মাস চরম দুর্ভোগে পড়েন এলাকাবাসী। সেবারও ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে নতুন করে সাঁকো নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার সেই একই চিত্র। ভাঙন, মেরামত, আবার ভাঙন। এই চক্রের মধ্যে বন্দী হয়ে আছে চরাঞ্চলের মানুষের জীবন।

এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নদীতে পানি বেড়েছে। সেই সঙ্গে ভেসে আসছে স্তূপ স্তূপ কচুরিপানা। সেই কচুরিপানা সাঁকোর নিচে আটকে জমে উঠছে। কচুরিপানার ভার আর পানির চাপে সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ এখন বেঁকে গেছে, দেবে গেছে। কোথাও কাঠ নরম হয়ে পচে গেছে, কোথাও বাঁশ আলগা হয়ে দুলছে। পুরো সাঁকোটিই এখন ভয়ঙ্করভাবে নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

এই পরিস্থিতিতে গ্রামবাসীরা নিজেরাই হাত লাগিয়েছেন। স্বেচ্ছাশ্রমে কেউ বাঁশ দিয়ে ঠেলে কচুরিপানা সরাচ্ছেন, কেউ নদীতে নেমে হাত দিয়ে টেনে তুলছেন। কিন্তু প্রতিদিন নতুন করে কচুরিপানা এসে জমছে। গ্রামবাসীর এই লড়াই যেন শেষ হওয়ার নয়।

সকাল হলেই সাঁকোটিতে শুরু হয় মানুষের ভিড়। কেউ স্কুলে যাচ্ছে, কেউ বাজারে, কেউ উপজেলা শহরে চিকিৎসার জন্য ছুটছে। কৃষকরা মাথায় সবজি, ধান, ভুট্টা বা মরিচ নিয়ে পার হচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা ব্যাগ কাঁধে সাবধানে পা ফেলছে। বৃদ্ধরা লাঠিতে ভর দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে যান। সামান্য ভুল হলেই নিচে নদীতে পড়ে যাওয়ার শঙ্কা। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে সাঁকোটি ভেজা আর পিচ্ছিল হয়ে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়। তারপরও জীবনের প্রয়োজনে এই সাঁকোই তাদের একমাত্র পথ। প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। কেউ পিছলে পড়ে আহত হচ্ছেন, কেউ সাইকেলসহ নদীতে পড়ে যাচ্ছেন। তবুও থামার উপায় নেই। কারণ এই সাঁকো ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।

স্কুলছাত্র মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এই সাঁকো পার হয়ে স্কুলে যেতে হয়। বর্ষাকালে সাঁকো আরও পিচ্ছিল হয়ে যায়। অনেক সময় বই-খাতা নিয়ে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করে। এখানে একটি স্থায়ী সেতু হলে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে।’

কৃষক আমজাদ আলী বলেন, ‘আমরা চরাঞ্চলের মানুষ অনেক কষ্ট করে ফসল ফলাই। কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবে সেই ফসল ঠিকমতো বাজারে নিতে পারি না। ব্যবসায়ীরা কম দামে ফসল কিনে নেয়। এখানে একটা ভালো সেতু হলে আমরা সরাসরি বাজারে যেতে পারতাম। এতে কৃষকরা ন্যায্য দাম পেতো, এলাকার অর্থনীতিও উন্নত হতো।’

তালুক বেলকা গ্রামের মুদি ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দোকানের মালামাল আনতে গেলে পরিবহন খরচ অনেক বেশি পড়ে। সাঁকো পার হয়ে মালামাল বহন করতে আলাদা লোক লাগাতে হয়। এতে ব্যবসা করতে গিয়ে লোকসানের মুখে পড়তে হয়। একটি সেতু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে এবং মানুষের জীবনযাত্রাও সহজ হবে।’

বেলকা নবাবগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা আকলিমা বেগম বলেন, ‘এই সাঁকোত উঠলে বুকডা একেবারে কাঁপে। খালি ঠ্যাং কাপে, হাত-পা থরথর করে। মনে হয় এই বুঝি নদীতে পড়ে যাই। প্রতিদিনই এই ভয় নিয়ে পার হই। এখানে যদি একটা পাকা ব্রিজ হইতো, তাইলে আমাদের এত কষ্ট হইতো না। আমরা শান্তিতে পার হইতে পারতাম।’

স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক শিহাব মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘এই অঞ্চলের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। নদীতে স্থায়ী সেতু না থাকায় কোনো অ্যাম্বুলেন্স সহজে এখানে আসতে চায় না। জরুরি রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে অনেক সময় নষ্ট হয়। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। একটি সেতু হলে চরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা অনেক সহজ হবে।’

বেলকা নবাবগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা ও মাদরাসা শিক্ষক মো. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের মানুষ নৌকায় পারাপার করলেও এখন কাঠের সাঁকোই একমাত্র ভরসা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এটি ব্যবহার করছে। শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, নারী ও বৃদ্ধ সবাইকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একটি স্থায়ী সেতু হলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই নয়, পুরো চরাঞ্চলের জীবনমান বদলে যাবে।’

শিক্ষক, কবি ও সমাজকর্মী মো. হাবিবুল্লাহ সরকার বলেন, ‘এই সাঁকোটি শুধু একটি পারাপারের পথ নয়, এটি এই চরাঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক। প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই নড়বড়ে কাঠের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, এটা দেখলে বুকটা ভারী হয়ে আসে। ছোট ছোট শিশুরা ভয়ে ভয়ে সাঁকো পার হয়ে স্কুলে যাচ্ছে, এই দৃশ্য যে কোনো সচেতন মানুষের মনকে নাড়া দেবে। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে হলে আগে নিরাপদ পথ দরকার, এটা কোনো বিলাসিতার দাবি নয়, এটা মানুষের ন্যূনতম অধিকার। এই অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও উন্নয়নের আলো থেকে বঞ্চিত, এটা আমাদের জন্য লজ্জার। প্রতিবছর সাঁকো ভাঙে, মেরামত হয়, আবার ভাঙে। এই ক্লান্তিকর চক্রের অবসান ঘটিয়ে এখানে একটি স্থায়ী পাকা সেতু নির্মাণ করা এখন আর শুধু দাবি নয়, এটা এই মাটির মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়।’

তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মো. জিয়াউর রহমান সরকার রয়েল বলেন, ‘আমি এই চরের মাটিতেই বড় হয়েছি, এই মাটিকে ভালোবেসে কৃষিতে উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার এই দুর্দশা আমাদের সব স্বপ্নকে আটকে রাখছে। আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি আনা যাচ্ছে না, সার-বীজ সময়মতো পৌঁছানো যাচ্ছে না, উৎপাদিত ফসল দ্রুত বাজারে নেওয়া যাচ্ছে না। এই সাঁকো পার হয়ে ভ্যানে মাল নেওয়া যায় না, ট্রলি চলে না, কোনো যানবাহনই পার হতে পারে না। ফলে মাঝখান থেকে লাভের গুড় খেয়ে যাচ্ছে ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা। একটি পাকা সেতু হলে এই এলাকার কৃষি অর্থনীতিতে বিপ্লব আসবে। তরুণরা কৃষিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে, গ্রাম থেকে শহরমুখী মানুষের স্রোত কমবে। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমাদের এই ন্যায্য দাবিটুকু পূরণ করুন।’

এলাকাবাসীর দাবি, স্বাধীনতার এত বছর পরও একটি সেতুর অভাবে হাজার হাজার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রতিবছর ইউনিয়ন পরিষদের সীমিত বরাদ্দ দিয়ে কাঠের সাঁকো মেরামত করে কতদিন আর চলবে। এভাবে বারবার অস্থায়ী সমাধানে কাজ হচ্ছে না, দরকার একটি স্থায়ী পাকা সেতু। তারা দ্রুত স্থায়ী সেতু নির্মাণের মাধ্যমে চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘবে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

ইউপি সদস্য মো. হাফিজার রহমান বলেন, ‘চরাঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট এই তিস্তার শাখা নদী। বছরের পর বছর মানুষ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। কাঠের সাঁকো দিয়ে সাময়িকভাবে যাতায়াত সম্ভব হলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। সরকারিভাবে একটি সেতু নির্মাণ হলে এই অঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আসবে।’

বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম খলিলুল্যাহ বলেন, ‘চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকেই এলাকার মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। এই তিস্তার শাখা নদীটি চরাঞ্চলের মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ২০১৭ সালে জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার জন্য নিজ উদ্যোগে এখানে কাঠের সাঁকো নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছরই ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ দিয়ে সাঁকোটি সংস্কার করে আসছি। কখনো আংশিক মেরামত, কখনো পুরোপুরি নতুন করে নির্মাণ করতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিবছর বন্যা আর কচুরিপানার চাপে সাঁকোটির অবস্থা আবার নাজুক হয়ে পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি শুধু একটি চলাচলের পথ নয়, এটি হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, রোগী সবাই এই সাঁকোর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কাঠের সাঁকো দিয়ে আর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি বিবেচনায় এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই অনুমোদন মিলবে এবং চরাঞ্চলের মানুষের বহুদিনের কষ্ট লাঘব হবে।’

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) তপন কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘ওই স্থানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। ইতোমধ্যে সেতু নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পেলেই দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ সেতুটি নির্মাণ হলে শুধু যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি হবে না, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’