জুলাইয়ের ইতিহাস বিকৃতের চেষ্টা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ করা হবে : জামায়াত আমির

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস বিকৃত বা ভুলিয়ে দেওয়ার কোনো চেষ্টা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘আজাদী সংগ্রামের পটভূমিতে জুলাই বিপ্লব ২০২৪’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসব উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার কোনো উল্টো সংগ্রাম যদি শুরু হয়ে থাকে, তাহলে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে বলছি, দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমরা তা প্রতিহত করব।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের কোনো একক ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিল না। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী, তরুণ, শিশু ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই আন্দোলন সফল হয়েছে। তাই এই আন্দোলনের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে কার কী অবদান ছিল, তা যেন আড়াল না হয় এবং একটি গ্রহণযোগ্য ও নির্ভুল ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয়।

জামায়াত আমির বলেন, আন্দোলনে নিহতদের পরিবার, আহত এবং স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করা ব্যক্তিদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব এখনো শেষ হয়নি। তিনি জানান, আন্দোলনের সময় তার দলের নেতারা বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, আপনার-আমার পছন্দ হোক বা না হোক, যার যেখানে যে অবদান, তা ইতিহাসে স্থান পেতে হবে। একটি ক্রেডিবল ইতিহাস তৈরি হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রকৃত ঘটনাগুলো জানতে পারে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৭১ সালে একজন ইনোসেন্ট মানুষ যদি মারা যায়, সেটার জন্য গোটা জাতি আমরা কষ্ট পাই, দুঃখ বোধ করি। কিন্তু আফসোস, ৫৫টা বছর চলে গেল, না মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সঠিক তালিকা তৈরি হলো, না শহীদদের একটি তালিকা তৈরি হলো। মুক্তিযোদ্ধাদের যেটা আছে সঠিক হোক, বেঠিক কিছুটা আছে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো তালিকা নাই। ৬৫৬ জন নাকি ভাতা পায়, আমি শুনেছি। আশ্চর্য ব্যাপার, আমরা বলে বলছি এত লাখ, এত লাখ, তাহলে এত লাখটা রেকর্ড হচ্ছে না কেন? এটা তো সরকারের দায়িত্ব। এতগুলো সরকার আসলো গেল, সবাই দাবি করেন যে আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্টেকহোল্ডার। আপনারা মুক্তিযুদ্ধের স্টেকহোল্ডার, আপনাদেরকে সম্মান করি। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটা করছেন না কেন? এটা করেন। ইতিহাসটা উঠে আসুক, ওই ফ্যামিলিগুলা গ্লোরিফাই হোক, শহীদের আত্মা শান্তি পাক। ৭১-এর মতো ২৪ যেন হারিয়ে না যায়, এজন্য এই উদ্যোগ আবারও মোবারক। আমি সরকারকে অনুরোধ করব, এটি তো সরকারি উদ্যোগ নয়, সরকারের দায়িত্ব আছে। আপনারা উদ্যোগ নেন, সঠিক ইতিহাস রচনা করেন।

তিনি বলেন, ২৪-এর পরিবর্তনের আগে আমাদের কণ্ঠে, রাজনীতিবিদদের কণ্ঠে যে সুর ছিল, ৫ তারিখের পর থেকে আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারির পরে ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। আগে যে সমস্ত কথা বলেছেন, অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, অনেকে এটা এখন বেমালুম ভুলে গেছে। তার ঠিক বিপরীতে গিয়ে এখন তারা ন্যারেটিভ দাঁড় করাচ্ছেন, বয়ান তৈরি করছেন।

তিনি বলেন, জনগণের অভিপ্রায় একটি ডেমোক্রেটিক সোসাইটিতে সর্বোচ্চ মর্যাদা পায়। সেই অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে গণভোট হলো, গণরায় হলো, ৭০ ভাগ মানুষ ভোট দিল। এখন সরকারি দল মানবে না। হ্যা, মানবেন, অবশ্যই মানবেন। ইনশাআল্লাহ মানবেন। ইনশাআল্লাহ মানতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এতগুলো খুন হলো, গুম হলো, পঙ্গু হলো, নির্যাতন হলো, মিথ্যা মামলা হলো, তার বিচার এখন স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। আগের সরকারের সময় যেটুকু গতি ছিল, এটাও এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জুলাই স্মৃতি জাদুঘর তুলে দেওয়ার জন্য সংসদে আমরা দাবি উত্থাপন করলাম। প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন যে, ৫ আগস্ট এই বছরে এটা ওপেন করা হবে। আজকে তো ৪ আগস্ট, এখন পর্যন্ত তো কোনো আলামত দেখছি না। ৫ আগস্ট ওপেন হলে তো কিছু আলামত ইতোমধ্যে হতো, কিছু দাওয়াত, কিছু আহ্বান পেতাম। আমরা স্বাভাবিকভাবে আশা করি, এটা কি হচ্ছে? এগুলো তাহলে কি জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার একটি নিরন্তর উল্টো সংগ্রাম শুরু হয়েছে? যদি সেরকম কোনো সংগ্রাম হয়ে থাকে, আমরা মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে বলছি, দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এই সমস্ত কিছু ইনশাআল্লাহ তছনছ করে দেওয়া হবে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জীবন তো একটাই। সেই জীবন স্বার্থপর কাপুরুষের জীবন না হয়, এই জীবন হোক জাতির জন্য উৎসর্গ। এখানে কোনো বৃদ্ধ আর যৌবনের কোনো ব্যাপার নাই। এই ইস্যুতে একাকার ইনশাআল্লাহ।

তিনি বলেন, এই ইস্যু ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য আমাদেরকে অনেক লোভ, লোভের প্রস্তাব, বিভিন্ন কিছু দেওয়া হচ্ছে। আমাদের সোজা সাপ্টা কথা, জনগণ যে রায় দিয়েছে, এটাই মানতে হবে। আমাদের আলাদা কোনো রায় নাই। এর বাইরে আমরা যাবো না, যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। আমরা জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাই না। কেউ করে করুক, আমরা করবো না।

তিনি বলেন, আমরা জাতিকে কথা দিচ্ছি, আপনাদের প্রয়োজনে আমাদের যেটুকু সামর্থ্য আছে সবটুকু উজাড় করে আমরা করে দেব। আমরা এখানে কোনো ক্ষান্ত দেব না, কোনো কম্প্রোমাইজ করব না। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে যে–কোনো সময়, দেশের স্বার্থে যে–কোনো বিষয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে রাজি আছি। কিন্তু জনগণের একটি সিঙ্গেল অধিকারকে বিসর্জন দিয়ে এটা হবে না। কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করবো না। মাথা সমুন্নত থাকবে। সেটা দরকার হয় ফাঁসির তক্তায় যাব, আয়নাঘরে যাব, আল্লাহ যেটা নির্ধারণ করেছেন সেখানে যাব।

তিনি বলেন, আমাদের এক ছোট ভাই বলেছে, ওরে জিজ্ঞেস করা হয়েছে যে যদি আঘাত আসে কী করবেন? বলে, জেলে যাবো, না হয় কবরে যাবো। আমি বললাম, তৃতীয় আরেকটা বলো নাই কেন? বলা উচিত ছিল, জেলে যাবো অথবা আয়নাঘরে যাবো অথবা কবরে যাবো।

জুলাই আন্দোলনে নিহত, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব এখনো শেষ হয়নি। তিনি জানান, আন্দোলনের সময় তার দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে আহতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং চিকিৎসায় কোনো অবহেলা না করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করেছেন।

সম্প্রতি থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চিকিৎসাধীন কয়েকজন আহতকে দেখে আসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেকেই এমনভাবে আহত হয়েছেন যে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তারা আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না। কেউ কেউ সারা শরীর অবশ হয়ে পড়ে আছেন। তাদের কথা রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। যাদের রক্ত, সাহসিকতা ও আত্মত্যাগে আজকের পরিবর্তন এসেছে, তাদের ভুলে যাওয়া চরম বিশ্বাসঘাতকতা হবে।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের গায়ে হাত দেবেন না। যাদের কারণে আজ আপনি সরকার, তাদের চোখ কেড়ে নেবেন না, হাত-পা ভাঙবেন না, এক ফোঁটা রক্তও ঝরাবেন না। যদি তা হয়, সেটি হবে চরম নিমকহারামি।

জুলাই বিপ্লবের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের পাশাপাশি তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধার নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত হয়নি। একই ভুল যেন ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ক্ষেত্রে না হয়। শহীদ, আহত ও অংশগ্রহণকারীদের একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এটি শুধু কোনো বেসরকারি উদ্যোগের বিষয় নয়, সরকারেরও দায়িত্ব সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা। ইতিহাস উঠে আসুক, শহীদ পরিবারের যথাযথ সম্মান নিশ্চিত হোক।

ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যে ধীরে ধীরে পরিবর্তন এসেছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর পর সেই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে। তার দাবি, আগে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতি এখন ভুলে যাওয়া হচ্ছে এবং তার বিপরীতে নতুন বয়ান তৈরি করা হচ্ছে।
জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রসঙ্গেও তিনি সরকারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংসদে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ৫ আগস্টের মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ এবং জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু ৪ আগস্ট পর্যন্ত সে ধরনের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, এগুলো তাহলে কি জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার একটি নিরন্তর উল্টো সংগ্রাম? যদি সেরকম কোনো চেষ্টা হয়ে থাকে, আমরা দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করব।

গণতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণের রায়ই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ। জনগণের রায়ের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং জনগণের অধিকার ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা যাবে না।

তার ভাষায়, জনগণ যে রায় দিয়েছে, সেটাই মানতে হবে। আমাদের আলাদা কোনো রায় নেই। আমরা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাই না।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, গুম, খুন, নির্যাতন, পঙ্গুত্ব ও মিথ্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। এসব ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজন হলে জামায়াতে ইসলামী যে কোনো সময় ঐক্যবদ্ধ হতে প্রস্তুত। তবে জনগণের মৌলিক অধিকার বিসর্জন দিয়ে কোনো আপস করা হবে না এবং কোনো ধরনের আধিপত্যবাদের কাছে দল মাথা নত করবে না।

বক্তব্যের শেষদিকে তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের প্রয়োজন হলে আমাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে পাশে থাকব। জেল, আয়নাঘর কিংবা মৃত্যুর ভয় আমাদের দমাতে পারবে না। প্রয়োজনে জেলে যাব, আয়নাঘরে যাব, কিংবা কবরে যাব—তবু দেশের স্বার্থে সংগ্রাম থেকে সরে আসব না।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

জুলাইয়ের ইতিহাস বিকৃতের চেষ্টা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ করা হবে : জামায়াত আমির

জুলাইয়ের ইতিহাস বিকৃতের চেষ্টা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ করা হবে : জামায়াত আমির

প্রকাশের সময় : ০২:৩৫:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস বিকৃত বা ভুলিয়ে দেওয়ার কোনো চেষ্টা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘আজাদী সংগ্রামের পটভূমিতে জুলাই বিপ্লব ২০২৪’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসব উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার কোনো উল্টো সংগ্রাম যদি শুরু হয়ে থাকে, তাহলে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে বলছি, দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমরা তা প্রতিহত করব।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের কোনো একক ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিল না। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী, তরুণ, শিশু ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই আন্দোলন সফল হয়েছে। তাই এই আন্দোলনের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে কার কী অবদান ছিল, তা যেন আড়াল না হয় এবং একটি গ্রহণযোগ্য ও নির্ভুল ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয়।

জামায়াত আমির বলেন, আন্দোলনে নিহতদের পরিবার, আহত এবং স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করা ব্যক্তিদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব এখনো শেষ হয়নি। তিনি জানান, আন্দোলনের সময় তার দলের নেতারা বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, আপনার-আমার পছন্দ হোক বা না হোক, যার যেখানে যে অবদান, তা ইতিহাসে স্থান পেতে হবে। একটি ক্রেডিবল ইতিহাস তৈরি হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রকৃত ঘটনাগুলো জানতে পারে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৭১ সালে একজন ইনোসেন্ট মানুষ যদি মারা যায়, সেটার জন্য গোটা জাতি আমরা কষ্ট পাই, দুঃখ বোধ করি। কিন্তু আফসোস, ৫৫টা বছর চলে গেল, না মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সঠিক তালিকা তৈরি হলো, না শহীদদের একটি তালিকা তৈরি হলো। মুক্তিযোদ্ধাদের যেটা আছে সঠিক হোক, বেঠিক কিছুটা আছে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো তালিকা নাই। ৬৫৬ জন নাকি ভাতা পায়, আমি শুনেছি। আশ্চর্য ব্যাপার, আমরা বলে বলছি এত লাখ, এত লাখ, তাহলে এত লাখটা রেকর্ড হচ্ছে না কেন? এটা তো সরকারের দায়িত্ব। এতগুলো সরকার আসলো গেল, সবাই দাবি করেন যে আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্টেকহোল্ডার। আপনারা মুক্তিযুদ্ধের স্টেকহোল্ডার, আপনাদেরকে সম্মান করি। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটা করছেন না কেন? এটা করেন। ইতিহাসটা উঠে আসুক, ওই ফ্যামিলিগুলা গ্লোরিফাই হোক, শহীদের আত্মা শান্তি পাক। ৭১-এর মতো ২৪ যেন হারিয়ে না যায়, এজন্য এই উদ্যোগ আবারও মোবারক। আমি সরকারকে অনুরোধ করব, এটি তো সরকারি উদ্যোগ নয়, সরকারের দায়িত্ব আছে। আপনারা উদ্যোগ নেন, সঠিক ইতিহাস রচনা করেন।

তিনি বলেন, ২৪-এর পরিবর্তনের আগে আমাদের কণ্ঠে, রাজনীতিবিদদের কণ্ঠে যে সুর ছিল, ৫ তারিখের পর থেকে আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারির পরে ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। আগে যে সমস্ত কথা বলেছেন, অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, অনেকে এটা এখন বেমালুম ভুলে গেছে। তার ঠিক বিপরীতে গিয়ে এখন তারা ন্যারেটিভ দাঁড় করাচ্ছেন, বয়ান তৈরি করছেন।

তিনি বলেন, জনগণের অভিপ্রায় একটি ডেমোক্রেটিক সোসাইটিতে সর্বোচ্চ মর্যাদা পায়। সেই অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে গণভোট হলো, গণরায় হলো, ৭০ ভাগ মানুষ ভোট দিল। এখন সরকারি দল মানবে না। হ্যা, মানবেন, অবশ্যই মানবেন। ইনশাআল্লাহ মানবেন। ইনশাআল্লাহ মানতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এতগুলো খুন হলো, গুম হলো, পঙ্গু হলো, নির্যাতন হলো, মিথ্যা মামলা হলো, তার বিচার এখন স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। আগের সরকারের সময় যেটুকু গতি ছিল, এটাও এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জুলাই স্মৃতি জাদুঘর তুলে দেওয়ার জন্য সংসদে আমরা দাবি উত্থাপন করলাম। প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন যে, ৫ আগস্ট এই বছরে এটা ওপেন করা হবে। আজকে তো ৪ আগস্ট, এখন পর্যন্ত তো কোনো আলামত দেখছি না। ৫ আগস্ট ওপেন হলে তো কিছু আলামত ইতোমধ্যে হতো, কিছু দাওয়াত, কিছু আহ্বান পেতাম। আমরা স্বাভাবিকভাবে আশা করি, এটা কি হচ্ছে? এগুলো তাহলে কি জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার একটি নিরন্তর উল্টো সংগ্রাম শুরু হয়েছে? যদি সেরকম কোনো সংগ্রাম হয়ে থাকে, আমরা মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে বলছি, দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এই সমস্ত কিছু ইনশাআল্লাহ তছনছ করে দেওয়া হবে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জীবন তো একটাই। সেই জীবন স্বার্থপর কাপুরুষের জীবন না হয়, এই জীবন হোক জাতির জন্য উৎসর্গ। এখানে কোনো বৃদ্ধ আর যৌবনের কোনো ব্যাপার নাই। এই ইস্যুতে একাকার ইনশাআল্লাহ।

তিনি বলেন, এই ইস্যু ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য আমাদেরকে অনেক লোভ, লোভের প্রস্তাব, বিভিন্ন কিছু দেওয়া হচ্ছে। আমাদের সোজা সাপ্টা কথা, জনগণ যে রায় দিয়েছে, এটাই মানতে হবে। আমাদের আলাদা কোনো রায় নাই। এর বাইরে আমরা যাবো না, যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। আমরা জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাই না। কেউ করে করুক, আমরা করবো না।

তিনি বলেন, আমরা জাতিকে কথা দিচ্ছি, আপনাদের প্রয়োজনে আমাদের যেটুকু সামর্থ্য আছে সবটুকু উজাড় করে আমরা করে দেব। আমরা এখানে কোনো ক্ষান্ত দেব না, কোনো কম্প্রোমাইজ করব না। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে যে–কোনো সময়, দেশের স্বার্থে যে–কোনো বিষয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে রাজি আছি। কিন্তু জনগণের একটি সিঙ্গেল অধিকারকে বিসর্জন দিয়ে এটা হবে না। কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করবো না। মাথা সমুন্নত থাকবে। সেটা দরকার হয় ফাঁসির তক্তায় যাব, আয়নাঘরে যাব, আল্লাহ যেটা নির্ধারণ করেছেন সেখানে যাব।

তিনি বলেন, আমাদের এক ছোট ভাই বলেছে, ওরে জিজ্ঞেস করা হয়েছে যে যদি আঘাত আসে কী করবেন? বলে, জেলে যাবো, না হয় কবরে যাবো। আমি বললাম, তৃতীয় আরেকটা বলো নাই কেন? বলা উচিত ছিল, জেলে যাবো অথবা আয়নাঘরে যাবো অথবা কবরে যাবো।

জুলাই আন্দোলনে নিহত, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব এখনো শেষ হয়নি। তিনি জানান, আন্দোলনের সময় তার দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে আহতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং চিকিৎসায় কোনো অবহেলা না করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করেছেন।

সম্প্রতি থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চিকিৎসাধীন কয়েকজন আহতকে দেখে আসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেকেই এমনভাবে আহত হয়েছেন যে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তারা আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না। কেউ কেউ সারা শরীর অবশ হয়ে পড়ে আছেন। তাদের কথা রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। যাদের রক্ত, সাহসিকতা ও আত্মত্যাগে আজকের পরিবর্তন এসেছে, তাদের ভুলে যাওয়া চরম বিশ্বাসঘাতকতা হবে।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের গায়ে হাত দেবেন না। যাদের কারণে আজ আপনি সরকার, তাদের চোখ কেড়ে নেবেন না, হাত-পা ভাঙবেন না, এক ফোঁটা রক্তও ঝরাবেন না। যদি তা হয়, সেটি হবে চরম নিমকহারামি।

জুলাই বিপ্লবের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের পাশাপাশি তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধার নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত হয়নি। একই ভুল যেন ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ক্ষেত্রে না হয়। শহীদ, আহত ও অংশগ্রহণকারীদের একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এটি শুধু কোনো বেসরকারি উদ্যোগের বিষয় নয়, সরকারেরও দায়িত্ব সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা। ইতিহাস উঠে আসুক, শহীদ পরিবারের যথাযথ সম্মান নিশ্চিত হোক।

ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যে ধীরে ধীরে পরিবর্তন এসেছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর পর সেই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে। তার দাবি, আগে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতি এখন ভুলে যাওয়া হচ্ছে এবং তার বিপরীতে নতুন বয়ান তৈরি করা হচ্ছে।
জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রসঙ্গেও তিনি সরকারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংসদে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ৫ আগস্টের মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ এবং জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু ৪ আগস্ট পর্যন্ত সে ধরনের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, এগুলো তাহলে কি জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার একটি নিরন্তর উল্টো সংগ্রাম? যদি সেরকম কোনো চেষ্টা হয়ে থাকে, আমরা দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করব।

গণতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণের রায়ই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ। জনগণের রায়ের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং জনগণের অধিকার ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা যাবে না।

তার ভাষায়, জনগণ যে রায় দিয়েছে, সেটাই মানতে হবে। আমাদের আলাদা কোনো রায় নেই। আমরা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাই না।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, গুম, খুন, নির্যাতন, পঙ্গুত্ব ও মিথ্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। এসব ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজন হলে জামায়াতে ইসলামী যে কোনো সময় ঐক্যবদ্ধ হতে প্রস্তুত। তবে জনগণের মৌলিক অধিকার বিসর্জন দিয়ে কোনো আপস করা হবে না এবং কোনো ধরনের আধিপত্যবাদের কাছে দল মাথা নত করবে না।

বক্তব্যের শেষদিকে তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের প্রয়োজন হলে আমাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে পাশে থাকব। জেল, আয়নাঘর কিংবা মৃত্যুর ভয় আমাদের দমাতে পারবে না। প্রয়োজনে জেলে যাব, আয়নাঘরে যাব, কিংবা কবরে যাব—তবু দেশের স্বার্থে সংগ্রাম থেকে সরে আসব না।