নিজস্ব প্রতিবেদক :
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কোন গণমাধ্যম যেন শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার না করে সে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। আদালতের আদেশ অমান্য করলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সচিবালয়ে আয়োজিত সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি একথা বলেন।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আগেও এ বিষয়ে সরকার গণমাধ্যমের জন্য সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়েছিল। যদি কেউ আগাম প্রচার করে যে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেবেন এবং সেটি প্রকাশ বা সম্প্রচার করে, তবে সেটি আদালতের আদেশ অমান্য করার শামিল হবে।
তিনি বলেন, আমরা আবারও সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেব, কেউ যেন এ ধরনের কাজ না করেন। আদালতের নির্দেশনা মানা প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। সরকারের কাজ হলো আদালতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
ব্যক্তিগত মতামত তুলে ধরে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা বলেন, আদালতের আদেশ না থাকলে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে বাধা দেওয়া ঠিক হতো না। কেউ যদি আদালতের ওই আদেশের সঙ্গে একমত না হন, তাহলে তিনি আদালতেই গিয়ে সেই রায় চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আদালতের আদেশ বহাল থাকবে, ততক্ষণ সেটি সবাইকে মেনে চলতে হবে।
ভারতে অবস্থানরত নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিনকে দেশে আনার জন্য সরকারের কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেই বলে জানিয়ে বলেন, তিনি যদি দেশে ফিরতে চান, তাহলে প্রচলিত আইন ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আবেদন করতে পারবেন, এরপর সরকার আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে ।
তসলিমা নাসরিন অতীতে যাদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছেন, সে বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, তিনি যদি দেশে ফিরে আদালতের আশ্রয় নিতে চান, তাহলে আইন অনুযায়ী সেই সুযোগ পাবেন। ফৌজদারি অপরাধ তামাদি হয় না। ভুক্তভোগী হিসেবে তিনি চাইলে আদালতে মামলা করতে পারবেন।
সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, সরকার কোনো ধরনের ভূরাজনৈতিক (জিও পলিটিক্যাল) চাপ বা সংকটে নেই।
তিনি বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করা মার্কিন কূটনীতিকের ভারত সফর কিংবা ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে বৈঠককে কেন্দ্র করে নানা ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। তবে এটি একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। ওই কূটনীতিক ভারতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেছেন। তাই বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখার কোনো কারণ নেই।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, রাশিয়া ও ইরানসহ সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলছে। আগের সরকারের মতো ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নয়, বরং জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট বাস্তবায়নেই সরকার কাজ করছে।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আগস্টের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সব খাতের শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন অনিয়ম ও হয়রানির কারণে শ্রমিকদের যে ভোগান্তি হয়েছে, তা দূর করেই সরকার কর্মী পাঠাতে চায়।
সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) বন্ধ কারখানাগুলো পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর ফলে কারখানাগুলো আরও দক্ষভাবে পরিচালিত হবে, লাভজনক হবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা প্রকাশ করে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বিটিএমসির শিল্পকারখানাগুলো বেসরকারি অংশীদারত্বে পরিচালিত হলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং দেশের শিল্পখাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সহায়তায় পরিচালিত আরবান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিটি গভর্ন্যান্স প্রকল্পের পারফরম্যান্সভিত্তিক মূল্যায়নে দেশের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন প্রথম স্থান অর্জন করেছে।
এ ধরনের প্রতিযোগিতা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নাগরিকসেবা আরও উন্নত করতে উৎসাহিত করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, কৃষি ও গৃহকর্মে নিয়োজিত শ্রমিক ছাড়া ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের নতুন মজুরি পুনর্র্নিধারণের সুপারিশ গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য পাঠানো হয়েছে। এতদিন এ খাতের শ্রমিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো না থাকায় যে অসংগতি ছিল, সরকার তা দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে।
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ বৃহস্পতির জামিন পাওয়ার তথ্য সরকার দুই-তিন দিন পর জানল কেন? একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন এবং তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না।
তিনি বলেন, আমি বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেব এবং তার সঙ্গে কথা বলব। কেন এ ধরনের গ্যাপ হয়েছে, সেটি খতিয়ে দেখা হবে।
প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এখনো আগের সরকারের প্রভাব রয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে ১৫ বছর ধরে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের সবাইকে একদিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে প্রশাসনসহ নানা প্রতিষ্ঠানে আগের সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষ এখনো রয়েছেন। চাইলেই এত মানুষকে একসঙ্গে সরিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। ১৫ বছরে বিভিন্ন স্তরে যারা উঠে এসেছেন, তাদের পরিবর্তে নতুনদের আনতে সময় লাগে।
তিনি আরও বলেন, শুধু বদলি করলেই হবে না, নতুন কর্মকর্তাদের দক্ষতা অর্জনেরও বিষয় রয়েছে। সরকার ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করছে, তবে এমনভাবে নয় যেন রাষ্ট্রের সেবাদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, চেষ্টা শুধু নয়, কাজও চলছে। তবে এমনভাবে পরিবর্তন করা হচ্ছে না, যেন ভঙ্গুর সিস্টেম আরও ধ্বংস হয়ে যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অতিরিক্ত বিল নিয়ে ঢালাও অভিযোগ না করে সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার আহ্বান জানিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, অতিরিক্ত বিলের বিষয়ে কোনো নাগরিকের অভিযোগ থাকলে প্রথমে নিকটস্থ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানানো উচিত। অভিযোগ জমা দিতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ না করলে কিংবা প্রতিকার না পাওয়া গেলে সেই বিষয়টিও সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে হবে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত বিল নিয়ে কারও অভিযোগ থাকলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে। এর আগেও এ ধরনের অভিযোগ এসেছে। সেগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। জ্বালানি মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত বিলসংক্রান্ত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে আগ্রহী।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ ঢালাওভাবে না করে কোথায়, কী ধরনের সমস্যা হয়েছে, তা নির্দিষ্টভাবে জানাতে হবে। অভিযোগ করতে গিয়ে কেউ ব্যর্থ হলে অথবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগ গ্রহণ না করলে সেটিও আমাদের জানাতে পারেন।
একই সঙ্গে নাগরিকদের অভিযোগের যথাযথ প্রতিকার নিশ্চিত করতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় আন্তরিকভাবে কাজ করতে চায়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 

















