বরগুনা জেলা প্রতিনিধি :
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম মণি বলেন, সরকারের প্রধান তারেক রহমান বিভাজনের রাজনীতি বন্ধ করেছেন। তিনি দেশকে দু’ভাগ করেননি, চেতনা বিক্রি করেননি। ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর স্বাধীন হয়েছে। সেই সিঙ্গাপুর এখন কোথায় আর আমরা কোথায়? চেতনা বিক্রি করতে করতে আমরা নিজেরাই বিক্রি হয়ে গেছি। এখানের সম্পদ লুট করে তারা (বিগত সরকার) বিদেশে পাচার করেছে। সে সম্পদ তাদেরও কাজে আসবে না। আর দেশের মানুষও বঞ্চিত হলো।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বরগুনা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের হলরুমে নির্বাচনীয় ইশতেহার ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিবিষয়ক আলোচনাসভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, তারেক রহমানের বাস্তবায়িত কাজের মধ্যে আমরা কৃষক কার্ডের কাজ করেছি। তাতে কৃষকরা স্বল্পমূল্যে বীজ, সার এবং কীটনাশক পাবেন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের সুযোগসহ সরকারের সকল সুযোগ-সুবিধা পাবেন। আমরা ফ্যামিলি কার্ড করেছি, আমাদের অবহেলিত নারীদের ক্ষমতায়িত করা এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও স্বাবলম্বী করার জন্য। শিক্ষাকে তিনি (তারেক রহমান) গুরুত্ব দিয়ে নারীদের ডিগ্রি পর্যন্ত লেখাপড়া অবৈতনিক করেছেন এবং উপবৃত্তির টাকা পাবেন।
মো. নূরুল ইসলাম মণি বলেন, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষকদের সুদসহ ঋণের টাকা মওকুফ করা হয়েছে। ইমাম মোয়াজ্জেমদের সম্মানিত করার জন্যও তিনি চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশে এই প্রথম ইমাম মোয়াজ্জেমদের মূল্যায়ণ করা হয়েছে এবং ধর্মীয় পুরোহিত ও পাদ্রি যারা আছেন, তাদেরকেও সম্মানিত করা হয়েছে।
চিফ হুইপ বলেন, তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমি বিদ্যুতে ভর্তুকি দেব।’ ৩৬ হাজার কোটি টাকা তিনি ভর্তুকি দিয়েছেন। আরও টাকা দিচ্ছেন, এই দেশের টাকা এই দেশেই থাকবে। আমাদের দেশের পেট্রোল পাম্পে তেলের লাইন ২ থেকে ৫ কিলোমিটার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমস্যা সমাধান করব। তিনদিনের মধ্যে তেলের লাইন নেই। তেল এই দেশেই ছিল, কৃত্তিম জ্বালানি সংকট তৈরি করে কিছু কিছু মানুষ সমাজকে ক্ষতি করার জন্য এবং সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট ও মানুষের ক্ষতি করা জন্য এই কাজ করেছেন।
প্রশাসনসহ বিভিন্ন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, একটা এলাকার কোনো উন্নয়ন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত ওই এলাকার প্রশাসকবৃন্দ আন্তরিকতার সঙ্গে উন্নয়নের কাজ না করবেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তার ফেডারেল গভমেন্টে চার হাজার প্রশাসনিক লোক নিয়ে বসেন। তিনি চলে গেলে আবার ওই চার হাজার লোকও চলে যায়। চার হাজার লোক নিয়ে আসেন একটাই কারণ, ওই গভমেন্টের কার্যক্রম এবং তাদের চিন্তা চেতনা বাস্তবায়ন করার জন্য ওই চার হাজার লোক কাজ করেন সারা আমেরিকা জুড়ে। আমাদের দেশে সেরকম কোনো সিস্টেম নেই। আমাদের দেশে সিস্টেম আছে, আমাদের প্রশাসন। আমরা প্রত্যাশা করব, যে প্রশাসন দায়িত্ব নেবেন এবং তারা সে কাজটি করবেন।
তিনি আরো বলেন, যেকোনো উন্নয়ন ও টেকসই অগ্রগতির জন্য স্থানীয় প্রশাসনের আন্তরিকতা অপরিহার্য। প্রশাসনের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা ছাড়া কোনো এলাকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়।
চিফ হুইপ বলেন, বরগুনাসহ বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় অঞ্চলের জেলাগুলো প্রতিনিয়ত নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। এতে সাধারণ মানুষকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হয়। এসব দুর্যোগ মোকাবেলা ও ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে উপকূলীয় জেলাগুলোকে নিয়ে পৃথক ‘উপকূলীয় মন্ত্রণালয়’ গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়নে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বরগুনায় ইকোনমিক জোন গড়ে তোলা, উপকূলীয় বাতাসকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সুন্দরবন থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত পরিকল্পিত পর্যটনশিল্প গড়ে তোলা এবং গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ। এ ছাড়া মাছ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা তৈরি, জাহাজভাঙা শিল্প গড়ে তুলতে তালতলী ও পাথরঘাটা এলাকায় জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পাশাপাশি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, মৎস্য গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র এবং আধুনিক আবহাওয়া অফিস স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করা জেলেদের সঙ্গে উপকূলের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান চিফ হুইপ।
নূরুল ইসলাম মনি আরো বলেন, সিঙ্গাপুর আমাদের কাছাকাছি সময়ে স্বাধীন হয়েও মাথাপিছু আয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে পৌঁছেছে। অথচ আমরা নানা কারণে পিছিয়ে রয়েছি। অতীতের বিভক্তির রাজনীতি থেকে বের হয়ে বর্তমান সরকার দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করছে। জেলে, কৃষকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের উন্নয়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
জেলা আইন-শৃঙ্খলা সভায় তিনি মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করে বলেন, যে কোনো মূল্যে মাদক প্রতিরোধ করতে হবে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে বরগুনায় এক শিশুর ওপর এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় দ্রুত ও যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন। পাশাপাশি চোরাচালান প্রতিরোধেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
বরগুনা জেলার উন্নয়নের বিষয়ে নূরুল ইসলাম মণি বলেন, আমরা বরগুনা জেলাকে একটি মডেল জেলা করতে চাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে সমগ্র উপকূল নিয়ে একটি মন্ত্রণালয়ের দাবি জানিয়েছি। তিনি এ বিষয়ে কাজ করছেন। তিনটি উপজেলা নিয়ে পার্বত্য একটি মন্ত্রণালয় আছে। আমাদের কক্সবাজার থেকে শুরু করে সাতক্ষীরা পর্যন্ত সাগরপাড়ে দুটি সরকার বাঁচিয়ে রাখার মতো সম্পদ এ উপকূলে আছে। আমাদের আটটি ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ আছে, যা আমরা করিনি। এরমধ্যে এখানে ইকোনমিক্যাল জোন, বাতাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সুন্দরবন থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত পর্যটন, ডিব সি পোর্ট, মাছ শিকার এবং প্রসেসিংসহ জাহাজ ভাঙা শিল্প এবং সমুদ্রের সম্পদ কাজে লাগাতে পারি।
এছাড়া আরও কিছু উন্নয়নমূলক কাজের বিষয়ে তিনি বলেন, বরগুনায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজে, মৎস্য গবেষণা এবং উন্নয়নকেন্দ্র, প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হিসেবে একটি আবহাওয়া অফিসও করতে চাই। চারলেন রাস্তা নির্মাণের কথাও বলেছি। আমরা বরগুনা জেলাকে একটি মডেল জেলা করতে উদ্যোগ নেব।
সবশেষ তিনি বলেন, আমরা প্রথম টার্গেট নিয়েছি মাদক নির্মূলের। সম্পূর্ণ নির্মূল করতে না পারলেও এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারি, যাতে নতুন কেউ জড়িয়ে না পড়েন। কিশোর গ্যাং উৎখাত এবং চোরাকারবারি বন্ধেও আমরা চেষ্টা করব বলেও জানান তিনি।
বরগুনা জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তারের সভাপতিত্বে সভায় বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য অলি উল্লাহ, বরগুনা জেলা পরিষদের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মোল্লাসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তার উপস্থিত ছিলেন।
বরগুনা জেলা প্রতিনিধি 





















