নিজস্ব প্রতিবেদক :
শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা যেন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথে কোনোভাবেই বাধা না হয়, সে জন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মর্যাদা ও সব ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছেন ডা. জোবাইদা রহমান। তিনি বলেন, দেশের বাস, ট্রেন ও লঞ্চে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের আইনি বিধান করা হবে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) দুপুরে রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে প্রতিবন্ধীদের স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ‘শিশু স্বর্গ মডেল’ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে বিজ্ঞানের সহায়তায় সঠিক ও সময়োপযোগী সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। নির্দিষ্ট সময়ে চিকিৎসা সহায়তা পেলে বিশেষভাবে সক্ষম শিশু-কিশোরদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ সম্ভব। ‘শিশু স্বর্গ’ প্রকল্প শিশু-কিশোর ও তাদের মায়েদের জন্য একটি কার্যকর সাপোর্ট গ্রুপ হিসেবে কাজ করবে।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, কোনো শিশুর শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা যেন তার যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার পথে বাধা না হয়। বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে প্রয়োজন সময়োপযোগী চিকিৎসা, সহায়তা এবং মানবিক সামাজিক পরিবেশ।
তিনি বলেন, শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। তাই বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদেরও সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বিজ্ঞান ও আধুনিক চিকিৎসার সহায়তায় সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় সেবা পেলে এসব শিশুর মধ্যেও অসাধারণ সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব।
জুবাইদা রহমান বলেন, ‘শিশু স্বর্গ’ প্রকল্প শুধু চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের উদ্যোগ নয়; এটি পরিবার, বিশেষ করে মায়েদের জন্যও একটি সহায়ক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। এ কর্মসূচির আওতায় মায়েদের জন্য সাপোর্ট গ্রুপ গঠন করা হবে, যাতে তারা হতাশা কাটিয়ে নতুনভাবে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান।
তিনি বলেন, আত্মবিশ্বাসই পারে বিষণ্ণতার অন্ধকার থেকে মা ও শিশুকে উজ্জ্বল ও স্বাবলম্বী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে। প্রতিবন্ধীবান্ধব জাতীয় নাগরিক সেবা গড়ে তুলতে হলে শুধু স্বাস্থ্যসেবা নয়, শিক্ষা, যাতায়াত ও সামাজিক অংশগ্রহণেও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে বাস, ট্রেন ও লঞ্চে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিনা ভাড়ায় চলাচলের ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা শুধু স্বাস্থ্য কর্মসূচি নয়, এটি একটি মানবাধিকারভিত্তিক উদ্যোগ।
তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩৫ লাখ গুরুতর প্রতিবন্ধী শিশু রয়েছে। তাদের বেশিরভাগই গ্রামাঞ্চল ও বস্তি এলাকায় বসবাস করলেও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
ডা. মুহিত বলেন, আর্লি ডিটেকশন বা দ্রুত শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা ও থেরাপি শুরু করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধিতার জটিলতা কমিয়ে আনা সম্ভব।
তিনি বলেন, প্রথম পর্যায়ে ১০টি উপজেলায় এ কর্মসূচি চালু করা হবে। পরে তা ৫০ উপজেলায় সম্প্রসারণ করা হবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের সব ৫০০ উপজেলায় ‘শিশু স্বর্গ মডেল’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, কর্মসূচির আওতায় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে কমিউনিটিভিত্তিকভাবে প্রতিবন্ধী শিশুদের শনাক্ত করা হবে। এরপর তাদের নিবন্ধন, ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন, থেরাপি, পুনর্বাসন, পরিবারভিত্তিক কাউন্সেলিং এবং মায়েদের জন্য সহায়ক গ্রুপ গঠন করা হবে।
তিনি বলেন, স্থানীয় শিক্ষক, ইমাম, তরুণ ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘কি ইনফরমেন্ট’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যারা এলাকায় এলাকায় গিয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের খুঁজে বের করবেন।
তিনি বলেন, আমরা একটি ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে প্রতিবন্ধী মানুষকে আলাদা করে দেখা হবে না। তাদের অক্ষমতা নয়, সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুষ্ঠানের আগে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন শিক্ষাসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্টল পরিদর্শন করেন ডা. জুবাইদা রহমান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার এবং জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। সহ-সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
এ ছাড়া ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গোয়াভুয়া, রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খানসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















