গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি :
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় স্ত্রী ও তিন মেয়েসহ পাঁচজনকে নৃশংসভাবে হত্যার পর পালিয়ে যাওয়া ফোরকান মোল্লা (৪০) আত্মহত্যার জন্য পদ্মা নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন। এরপর তাকে আর পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, নদীতে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছে। এর আগে পদ্মা সেতুর ওপর থেকে ফোরকানের ব্যাগ ও জামাকাপড় উদ্ধার করেছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকেল ৩টায় গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দিন।
পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন বলেন, তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ১১ মে আসামির ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি মেহেরপুর সদর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে জানা গেছে, একটি ট্রাকের হেলপার পদ্মা সেতুর মাঝামাঝি এলাকায় রেলিংয়ের পাশে মোবাইল ফোনটি পড়ে থাকতে দেখে সেটি নিয়েছেন। পদ্মা সেতুর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় পুলিশ দেখতে পায়, ১১ মে সকাল ৬টা ৪২ মিনিটে সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা এক ব্যক্তি একটি সাদা প্রাইভেট কার থেকে নেমে রেলিংয়ের পাশে কিছু রেখে দেড়-দুই মিনিট অবস্থান করেন। পরে তিনি রেলিং টপকে পদ্মা নদীতে ঝাঁপ দেন। ভিডিও ফুটেজটি ফোরকানের স্বজনদের দেখালে তাঁরা জানান, পদ্মায় ঝাঁপ দেওয়া ব্যক্তি ফোরকান বলে ধারণা করছেন তাঁরা। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছেন না তাঁরা। পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এ ব্যাপারে পদ্মা সেতু-সংলগ্ন থানাগুলোতে বেতার বার্তা পাঠানো হয়েছে। লাশ উদ্ধার ও লাশের ডিএনএ পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছু বলা যাচ্ছে না। মামলার তদন্ত চলমান।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ মে রাতে ফোরকান তাঁর শ্যালক মো. রসুল মোল্লাকে গার্মেন্টসে চাকরি দেওয়ার কথা বলে গোপালগঞ্জ থেকে গাজীপুরের কাপাসিয়ার বাসায় নিয়ে আসেন। এরপর ৮ মে রাত থেকে ৯ মে ভোরের মধ্যে যেকোনো সময় রাতের খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ বা অচেতনকারী পদার্থ মিশিয়ে স্ত্রী, তিন মেয়ে ও শ্যালককে অচেতন করা হয়। পরে চারজনকে ধারালো চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে এবং একজনকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ব্যাগ ও মোবাইল ফোন ফোরকানের বলে উল্লেখ করেন এসপি। এ ব্যাপারে সব থানায় ম্যাসেজ দেওয়া হয়েছে। কোনো লাশ পাওয়া গেলে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে তা ফোরকানের নাকি তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ খুনের ঘটনার পর থেকেই ফোরকান পলাতক ছিলেন। তাকে গ্রেফতারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দল কাজ করছিল। এরই মধ্যে পদ্মা সেতুর ওপর একটি ব্যাগ ও কিছু কাপড় পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে সিআইডি।
এর আগে, গত শুক্রবার (৮ মে) দিবাগত রাতে কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে ফোরকানের স্ত্রী শারমিন, তিন মেয়ে মীম (১৫), মারিয়া (৮) ও ফারিয়া (২) এবং শ্যালক রসুল মিয়ার রক্তাক্ত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
গোপালগঞ্জ সদরের মেরী গোপীনাথপুর গ্রামের আতিয়ার রহমান মোল্লার ছেলে পেশায় প্রাইভেটকার চালক ফোরকান মিয়া প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ির নিচতলা ভাড়া নিয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পরদিন শনিবার (৯ মে) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ফোরকান তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী রাশিদাকে ফোন করে জানান, তিনি পাঁচজনকে হত্যা করে পালিয়ে যাচ্ছেন। এরপর প্রতিবেশীরা ওই বাড়িতে গিয়ে বীভৎস দৃশ্য দেখতে পান।
ঘরের মেঝেতে তিন শিশুকন্যার মরদেহ পাশাপাশি পড়ে ছিল। মা শারমিনের মরদেহ জানালার গ্রিলে হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় ঝুলছিল এবং শ্যালক রসুল মিয়ার মরদেহ পড়ে ছিল বিছানার ওপর। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন নিহতদের স্বজনরা। ঘটনাস্থল থেকে দেশীয় মদের খালি বোতল, রান্না করা পায়েশ ও কোকাকোলার বোতল উদ্ধার করা হয়েছিল।
ঘটনার দিন মরদেহের পাশে বেশ কিছু প্রিন্ট করা কাগজ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই কাগজের সূত্র ধরে পুলিশ জানতে পারে, ফোরকান মিয়া এর আগে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে থানায় ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ করেছিলেন। একই সঙ্গে ওই অভিযোগপত্রে স্ত্রীর পরকীয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, পারিবারিক কলহ ও পরকীয়ার জেরেই ফোরকান এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করেছিল গোয়েন্দা পুলিশ।
গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি 





















