নিজস্ব প্রতিবেদক :
সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দেশের সড়ক ও মহাসড়কে চলাচলকারী গণপরিবহনে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সরকারি দলের সদস্য (মহিলা আসন-৩১) সানজিদা ইয়াসমিনের তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। প্রশ্নোত্তরটি টেবিলে উত্থাপিত হয়।
সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে গণপরিবহনের অবস্থান ও গতি সহজেই পর্যবেক্ষণ করা যাবে। ফলে গণপরিবহন যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, কোনো গণপরিবহন নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করলে বা ট্রাফিক আইন অমান্য করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড হবে। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নরসিংদী-৫ আসনের সরকারি দলের সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিনের অপর এক তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেশাদার মোটরযান চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নের সময় দক্ষতা ও সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মোট ৭৬ হাজার ৪৬৩ জন গাড়িচালককে এ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রশিক্ষণে ট্রাফিক সাইন, সিগন্যাল ও রোড মার্কিং সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার না করা, মাদক সেবন করে মোটরযান চালানোর কুফল, নিরাপদ সড়কের গুরুত্ব এবং দূষণ রোধে করণীয় সম্পর্কে চালকদের সচেতন করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প’-এর আওতায় ৬০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ হাজার নতুন চালককে মৌলিক প্রশিক্ষণ এবং ২০ হাজার ভারী যানবাহনের চালককে রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে দক্ষ ও নিরাপদ চালক তৈরি এবং সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
সংসদে সরকারি দলের সদস্য মো. জাহান্দার আলী মিয়ার (মাদারীপুর-২) লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মোট ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। একই সময়ে ৮১ কিলোমিটার নতুন ফ্লেক্সিবল পেভমেন্ট এবং ৫৯ কিলোমিটার রিজিড পেভমেন্ট নির্মাণ করা হয়েছে।
সড়কমন্ত্রী বলেন, ওই অর্থবছরে সরকার ২৫৯ দশমিক ৫৩ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্ত করেছে, ১৫৮ কিলোমিটার সড়ক শক্তিশালীকরণ এবং ২৫৮ কিলোমিটার মহাসড়ক পুনঃপৃষ্ঠায়নের কাজ সম্পন্ন করেছে।
তিনি বলেন, এ সময়ে মোট ৪ হাজার ৫৮৮ মিটার দৈর্ঘ্যের ৫৮টি সেতু, ১ হাজার ১৫২ মিটার দৈর্ঘ্যের ২১৪টি কালভার্ট, ৭০০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ফ্লাইওভার, ৪২ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ওভারপাস এবং মোট ২১ দশমিক ৩৫ মিটার দৈর্ঘ্যের দু’টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়েছে।
শেখ রবিউল আলম বলেন, বর্তমানে মোট ১৫ হাজার ৮৫১ কোটি ৮ লাখ টাকা এডিপি বরাদ্দে ৯৫টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম প্রশ্ন রেখে বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজাগুলোতে টোল সংগ্রহের ধীরগতি ও কারিগরি ত্রুটির কারণে তীব্র যানজট ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে, তা নিরসনে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কি না?
জবাবে শেখ রবিউল আলম বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি একটি পিপিপি প্রকল্প। প্রকল্পটি ৩টি ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ১ম ধাপ কাওলা হতে বনানী রেল স্টেশন পর্যন্ত, ২য় ধাপ বনানী রেল স্টেশন হতে মগবাজার রেল ক্রসিং পর্যন্ত, এবং ৩য় ধাপ মগবাজার রেল ক্রসিং হতে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক (কুতুবখালী) পর্যন্ত। ইতোমধ্যে ১ম ধাপ ও ২য় ধাপের আংশিক, অর্থাৎ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের দক্ষিণে কাওলা হতে এফডিসি ক্রসিং পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়েটি জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ৫টি স্থানে টোল প্লাজা রয়েছে। বিমানবন্দর, কুড়িল, বনানী-১ (বনানী হইতে বিমানবন্দরগামী যানবাহনের জন্য), বনানী-২ (বনানী হইতে ফার্মগেট ও হাতিরঝিলগামী যানবাহনের জন্য), মহাখালী ও তেজগাঁও। বর্তমানে চালুকৃত অংশে ৫টি টোল প্লাজার মধ্যে বিমানবন্দর ও তেজগাঁও টোল প্লাজায় যানবাহনের চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি। এই চাপের মূল কারণ হলো বর্তমানে কেবলমাত্র তেজগাঁও টোল প্লাজা ব্যবহার করে উত্তর দিকে অর্থাৎ বনানী, কুড়িল ও বিমানবন্দরের দিকে যাওয়া যায়। কিন্তু এক্সপ্রেসওয়ের মূল ডিজাইনে তেজগাঁওয়ের পাশাপাশি সোনারগাঁও গোল চত্বর হতে আরও একটি র্যাম্পের মাধ্যমে উত্তর দিকে যাইবার সুযোগ রয়েছে। যা নির্মাণকাজ বর্তমানে চলছে।
তিনি আরো বলেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে উক্ত র্যাম্প, টোল প্লাজা এবং ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন হলে তেজগাঁও টোল প্লাজাসহ এক্সপ্রেসওয়ের যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
পরিবহনমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে চালুকরা অংশে টোল আদায় কার্যক্রম আরও দ্রুত ও বেগবান করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ইটিসি কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এই কার্যক্রমের আওতায় বিমানবন্দরে ৬টি টোল লেনের মধ্যে ২টি লেনে, কুড়িলে ৬টি লেনের মধ্যে ২টি লেনে, বনানী-১ এ ৫টি লেনের মধ্যে ১টি লেনে এবং তেজগাঁও টোল প্লাজায় ৪টি লেনের মধ্যে ২টি লেনে, অর্থাৎ সর্বমোট ৭টি লেনে ইটিসি ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। ৩০ আগস্ট পর্যন্ত এ সিস্টেমে রেজিস্ট্রেশনকৃত গাড়ির সংখ্যা ১,৮৭৭টি।
টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নে কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদ জানতে চান, বর্তমানে ভারতের সঙ্গে কোনো ট্রেন চলাচল করছে কি না; করলে, এর সংখ্যা কত এবং নতুন ট্রেন চালু করা হবে কি না।
জবাবে শেখ রবিউল আলম বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে মালবাহী ট্রেন চলাচল করছে। রহনপুর, দর্শনা ও বেনাপোল ইন্টারচেঞ্জ স্টেশন দিয়ে পণ্যবাহী ভারতীয় গুডস ট্রেন গ্রহণ ও খালি র্যাক পাঠানো হচ্ছে। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪৩টি পণ্যবাহী ট্রেন গ্রহণ ও ৪২টি খালি র্যাক পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে কোনো যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে না। যাত্রীবাহী ট্রেন পুনরায় চালুর বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদের এক প্রশ্নের জবাবে রেলমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে মিটারগেজ ইঞ্জিন ও কোচের স্বল্পতা রয়েছে। ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত সংখ্যক মিটারগেজ ইঞ্জিন ও কোচ প্রাপ্তিসাপেক্ষে ঢাকা-কুড়িগ্রাম-ঢাকা রুটে মধ্যমেয়াদে এক জোড়া এবং দীর্ঘমেয়াদে আরও এক জোড়াসহ মোট দুই জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনের রেলস্টেশনগুলো বিভিন্ন সময়ে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। জয়দেবপুর থেকে ঈশ্বরদী সেকশনের স্টেশনগুলো ‘জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী সেকশনে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ (প্রকৌশল সেবা) সংক্রান্ত কারিগরি সহায়তা প্রকল্প’-এর মাধ্যমে আধুনিকায়ন করা হবে।
‘বগুড়া হতে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প’-এর মাধ্যমে সফাদারপুর, বগুড়া ও কাহালু—এই তিনটি স্টেশন রিমডেলিংসহ নতুন আরও আটটি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। তাছাড়া বগুড়া থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত বিদ্যমান রেলস্টেশনগুলো বাজেট প্রাপ্তিসাপেক্ষে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে আধুনিকায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















