নিজস্ব প্রতিবেদক :
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনালটি কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর হবে। মহাখালী বাস টার্মিনাল অস্থায়ীভাবে যাবে পূর্বাঞ্চলে এবং পরে স্থায়ীভাবে টঙ্গীর কাছে স্থানান্তরিত হবে। গাবতলী বাস টার্মিনাল হেমায়েতপুর এবং সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল যাবে কাঁচপুরে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর গতি পেয়েছে টার্মিনাল স্থানান্তর কার্যক্রম। তবে টার্মিনাল স্থানান্তরের সঙ্গে সামনে এসেছে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক নগর প্রবেশ নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ। দূরপাল্লার যাত্রীরা শহরের বাইরের টার্মিনালে নামার পর সেখান থেকে ঢাকার ভেতরে নিজ নিজ গন্তব্যে কীভাবে নিরাপদে পৌঁছবেন, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে উঠে আসছে।
দেশের সরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানির (আইআইএফসি) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঢাকার বাস টার্মিনালগুলোতে আগত ৫৫ শতাংশ যাত্রীর কাছে ভারী লাগেজ থাকে। স্থানান্তরিত টার্মিনালগুলোর সঙ্গে সমন্বিত ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে না তুললে উদ্যোগটির সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লা ভারী হওয়ার আশঙ্কা করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। যদিও সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করেই ঢাকার বাস টার্মিনালগুলো স্থানান্তর করা হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালটি কাঁচপুরে স্থানান্তর করা হবে। এ লক্ষ্যে কাঁচপুরে টার্মিনাল নির্মাণের কাজও চলছে। আইআইএফসির জরিপে উঠে এসেছে, কাঁচপুর থেকে মালিবাগের দূরত্ব ১৯ কিলোমিটার। একইভাবে কাঁচপুর থেকে ফার্মগেট ২১ দশমিক ৬ কিলোমিটার, গুলিস্তান ১৬ কিলোমিটার, গুলশান ২৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। টার্মিনাল স্থানান্তরের পর কোনো যাত্রী যদি কাঁচপুর থেকে মালিবাগ, ফার্মগেট, গুলিস্তান বা গুলশানে যেতে চান, তাহলে তাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। টঙ্গী, হেমায়েতপুর কিংবা কেরানীগঞ্জও ঢাকার মূল অংশ থেকে বেশ দূরে।
ভারী লাগেজ সঙ্গে থাকলে ভালো গণপরিবহন ছাড়া একজন যাত্রীর পক্ষে টার্মিনাল থেকে নিজের গন্তব্যে পৌঁছানো বেশ কঠিন কাজ বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘কাঁচপুর, হেমায়েতপুর বা টঙ্গীর মতো দূরবর্তী স্থানে টার্মিনাল করা হলে দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে যাত্রীরা গভীর রাতে বা ভোরে কীভাবে ঢাকার ভেতরে ঢুকবে এবং তা কতটা নিরাপদ হবে—সেই প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে নামিয়ে দিলে তারা শহরের ভেতরে যেতে ছোট ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভর করবে, যা ট্রিপ সংখ্যা বাড়িয়ে টার্মিনাল এলাকায় আরো তীব্র যানজট তৈরি করবে।
এমন প্রেক্ষাপটে শুধু সনাতনী ‘বাস টার্মিনাল’ তৈরি করে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; বরং সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টার্মিনালগুলোকে আধুনিক ‘ট্রান্সফার হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘উন্নত বিশ্বের মতো “টু-টিয়ার সিস্টেম” বা দুই স্তরের সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দূরপাল্লার বাস ও সিটি বাসের মধ্যে নিখুঁত সংযোগ থাকবে। এ পদ্ধতিতে দূরপাল্লার বাসগুলো ঢাকার বাইরে নির্ধারিত “ট্রান্সফার হাব”-এ যাত্রা শেষ করবে এবং সেখান থেকে যাত্রীদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির অধীনে বিশেষ “সিটি বাস” বা ফিডার সার্ভিস চালু থাকবে।
ঢাকার ভেতরে থাকা আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলোকে ঢাকার উপকণ্ঠগুলোতে সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগের অংশ হিসেবে সমীক্ষা করেছে আইআইএফসি। ঢাকার বাইরে প্রস্তাবিত আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলো থেকে যাত্রীরা কীভাবে রাজধানীর ভেতরে প্রবেশ করবে, সে বিষয়েও বিস্তারিত পরিকল্পনা রয়েছে সমীক্ষা প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টার্মিনালগুলোকে মাল্টিমোডাল ট্রান্সফার হাবে পরিণত করা হবে। অর্থাৎ দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে যাত্রীরা সিটি বাস, শহরতলির বাস, মেট্রোরেল, বিআরটি কিংবা অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবহার করে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে। এজন্য প্রতিটি টার্মিনালে সিটি ও উপশহরগামী বাসের জন্য আলাদা পার্কিং ও যাত্রী স্থানান্তরের সুবিধা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া যাত্রীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় বিশেষ শাটল বাস চালুর প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, বাস টার্মিনাল ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ সিটি বাসের ওপর নির্ভরশীল এবং অনেকের সঙ্গে ভারী লাগেজ থাকে। তাই কম স্টপেজবিশিষ্ট শাটল বাসের মাধ্যমে টার্মিনালগুলো মূল শহরের সঙ্গে যুক্ত করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের এমআরটি ও বিআরটি নেটওয়ার্কের সঙ্গেও এসব টার্মিনালের সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে।
ঢাকার বাস টার্মিনালগুলো রাতারাতি সরিয়ে ফেলা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘বাসস্ট্যান্ড সবগুলোই সরবে, কিন্তু এই যে রাতারাতি সরে যাচ্ছে, আমি তা বলছি না। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার পরই স্থানান্তর কার্যকর হবে। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের অংশ হিসেবে কাঁচপুর এলাকায় একটি অস্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে, যেখানে পর্যাপ্ত সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে কার্যক্রম স্থানান্তর করা হবে। একইভাবে অন্য টার্মিনালগুলোও স্থানান্তরিত হবে।’
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















