বাংলাদেশে রোগ নির্ণয়ব্যবস্থা এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

বাংলাদেশে রোগ নির্ণয়ব্যবস্থা এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে বলে মন্তব্য করে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক রোগী এখনো যথাযথ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করেছে।

রোববার (৫ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ‘নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবার প্রসার অপরিহার্য। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

দেশীয় চিকিৎসা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের প্রতি সরকারের সমর্থনের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিমেডিসিন কর্মসূচির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এই প্ল্যাটফর্মে অনলাইন ১২-লিড ইসিজি ও ইলেকট্রনিক স্টেথোস্কোপের মতো আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত রয়েছে। সরকারের নতুন গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির সঙ্গে এসব প্রযুক্তির সমন্বয় করা গেলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে চলমান ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় আরো চিকিৎসক ও নার্স প্রয়োজন।

বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশের কিছু হাসপাতালে এক কক্ষে ৩০ থেকে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু ও হাম মোকাবিলায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও নার্সদের ধৈর্য, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশীয় গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা দেবে। বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন হলে রোগী ও অর্থনীতি দুই-ই উপকৃত হবে।

মন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও চিকিৎসা সরঞ্জামের অধিকাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কাঁচি থেকে শুরু করে বিভিন্ন চিকিৎসা ও প্যাথলজি যন্ত্রপাতির জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। দেশের বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের সক্ষমতার কোনো ঘাটতি নেই। সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবেই অনেক উদ্ভাবন বাস্তবায়ন হয় না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে উদ্ভাবিত ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য বিশেষ জুতা বিদেশেও আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশের অনেক বিজ্ঞানী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু দেশীয় উদ্ভাবনের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় সম্ভাবনাগুলো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া শক্তিশালী অর্থনীতি ও উন্নত রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। দেশে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর প্রধান কারণ প্লাজমা লিকেজ। এ বিষয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ জরুরি। সীমিত জনবল নিয়েও চিকিৎসকেরা নিষ্ঠার সঙ্গে সেবা দিচ্ছেন।

বিজ্ঞানী ও গবেষকদের উদ্দেশে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, আপনাদের যেকোনো ধরনের সহায়তার প্রয়োজন হলে আমরা তা দিতে প্রস্তুত। আপনারা নিজেদের গুটিয়ে না রেখে সামনে এগিয়ে আসুন। একটি সুস্থ জাতি ছাড়া কখনোই একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বড় উপাদান। অন্যথায় দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত নবজাতকের জীবন রক্ষায় দেশের চিকিৎসকের উদ্ভাবিত সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রশংসা করে চিকিৎসাক্ষেত্রে দেশীয় উদ্ভাবন ও গবেষণায় পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, যে অক্সিজেনটি নবজাতকের ফুসফুসে প্রবেশ করে না, তা একটি বোতলে ফিরে এসে বুদবুদ তৈরি করে এবং পুনরায় সেখান থেকে ফুসফুসে অক্সিজেনের প্রবাহ নিশ্চিত করে। এটি ফুসফুসকে পরিষ্কার রাখে এবং পুনরায় অক্সিজেন গ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি করে। মাত্র ৩০০ টাকা খরচের এই সিস্টেমটি ব্যবহার করে শিশুদের বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হচ্ছি। এর জন্য সংশ্লিষ্ট উদ্ভাবকের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

তিনি বলেন, দেশের বিজ্ঞানীরা যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন, যেমনটি আমরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে দেখিয়েছিলাম। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পার হলেও চিকিৎসা-সরঞ্জাম আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা দুঃখজনক। কাঁচি থেকে শুরু করে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার আধুনিক যন্ত্রপাতি—সবই আমাদের বিদেশ থেকে আনতে হয়, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য কাম্য নয়।

আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, আমাদের মূল সমস্যা হলো সঠিক উদ্যোগ ও ধারাবাহিক সহায়তার অভাব। গ্রামীণ পর্যায় থেকেও অনেক বিজ্ঞানী উঠে আসছেন, কিন্তু তাদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বর্তমান বাজেটে নতুন নতুন উদ্ভাবনের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে এ ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক।

চিকিৎসাখাতের উন্নয়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়নে কাজ করতে সক্ষম এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে আমি নিজে তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করতে প্রস্তুত এবং সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করব।

নিজস্ব প্রযুক্তিতে অ্যাম্বুলেন্স তৈরি হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, একদল বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে একটি প্রকল্প উপস্থাপন করেছেন। তারা দুই ধরনের দেশীয় অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করতে যাচ্ছেন—একটি দুর্গম গ্রামীণ অঞ্চল থেকে রোগী আনার জন্য এবং অন্যটি দূরপাল্লার যাতায়াতের জন্য। আগামী চার বছরের মধ্যে এই প্রকল্পকে চূড়ান্ত রূপ দিতে সরকার সম্পূর্ণ অর্থায়ন করতে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা-সরঞ্জাম আমদানিতে প্রতিদিন দেশের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। যদি দেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা স্থানীয়ভাবে এসব প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম তৈরি করতে পারেন, তবে সরকার স্থানীয় উৎপাদন নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবে। এটি একদিকে যেমন আমদানিনির্ভরতা কমাবে, অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটাবে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত কর্মসূচির আওতায় দেশের প্রতিটি গ্রাম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই লক্ষ্য অর্জনে চিকিৎসকদের পাশাপাশি দেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকদের এগিয়ে আসতে হবে। আপনারা যদি দেশেই উন্নতমানের চিকিৎসা-সরঞ্জাম উদ্ভাবন করতে পারেন, তবে বিদেশি ডিলারদের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় বন্ধ হবে এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।

সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার সিদ্দিক-ই-রাব্বানী এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আকরাম হোসেনসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

নীলফামারীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে দুই শ্রমিকের মৃত্যু

বাংলাদেশে রোগ নির্ণয়ব্যবস্থা এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ০১:৩৬:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

বাংলাদেশে রোগ নির্ণয়ব্যবস্থা এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে বলে মন্তব্য করে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক রোগী এখনো যথাযথ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করেছে।

রোববার (৫ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ‘নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবার প্রসার অপরিহার্য। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

দেশীয় চিকিৎসা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের প্রতি সরকারের সমর্থনের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিমেডিসিন কর্মসূচির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এই প্ল্যাটফর্মে অনলাইন ১২-লিড ইসিজি ও ইলেকট্রনিক স্টেথোস্কোপের মতো আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত রয়েছে। সরকারের নতুন গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির সঙ্গে এসব প্রযুক্তির সমন্বয় করা গেলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে চলমান ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় আরো চিকিৎসক ও নার্স প্রয়োজন।

বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশের কিছু হাসপাতালে এক কক্ষে ৩০ থেকে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু ও হাম মোকাবিলায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও নার্সদের ধৈর্য, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশীয় গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা দেবে। বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন হলে রোগী ও অর্থনীতি দুই-ই উপকৃত হবে।

মন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও চিকিৎসা সরঞ্জামের অধিকাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কাঁচি থেকে শুরু করে বিভিন্ন চিকিৎসা ও প্যাথলজি যন্ত্রপাতির জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। দেশের বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের সক্ষমতার কোনো ঘাটতি নেই। সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবেই অনেক উদ্ভাবন বাস্তবায়ন হয় না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে উদ্ভাবিত ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য বিশেষ জুতা বিদেশেও আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশের অনেক বিজ্ঞানী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু দেশীয় উদ্ভাবনের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় সম্ভাবনাগুলো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া শক্তিশালী অর্থনীতি ও উন্নত রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। দেশে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর প্রধান কারণ প্লাজমা লিকেজ। এ বিষয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ জরুরি। সীমিত জনবল নিয়েও চিকিৎসকেরা নিষ্ঠার সঙ্গে সেবা দিচ্ছেন।

বিজ্ঞানী ও গবেষকদের উদ্দেশে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, আপনাদের যেকোনো ধরনের সহায়তার প্রয়োজন হলে আমরা তা দিতে প্রস্তুত। আপনারা নিজেদের গুটিয়ে না রেখে সামনে এগিয়ে আসুন। একটি সুস্থ জাতি ছাড়া কখনোই একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বড় উপাদান। অন্যথায় দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত নবজাতকের জীবন রক্ষায় দেশের চিকিৎসকের উদ্ভাবিত সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রশংসা করে চিকিৎসাক্ষেত্রে দেশীয় উদ্ভাবন ও গবেষণায় পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, যে অক্সিজেনটি নবজাতকের ফুসফুসে প্রবেশ করে না, তা একটি বোতলে ফিরে এসে বুদবুদ তৈরি করে এবং পুনরায় সেখান থেকে ফুসফুসে অক্সিজেনের প্রবাহ নিশ্চিত করে। এটি ফুসফুসকে পরিষ্কার রাখে এবং পুনরায় অক্সিজেন গ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি করে। মাত্র ৩০০ টাকা খরচের এই সিস্টেমটি ব্যবহার করে শিশুদের বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হচ্ছি। এর জন্য সংশ্লিষ্ট উদ্ভাবকের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

তিনি বলেন, দেশের বিজ্ঞানীরা যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন, যেমনটি আমরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে দেখিয়েছিলাম। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পার হলেও চিকিৎসা-সরঞ্জাম আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা দুঃখজনক। কাঁচি থেকে শুরু করে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার আধুনিক যন্ত্রপাতি—সবই আমাদের বিদেশ থেকে আনতে হয়, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য কাম্য নয়।

আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, আমাদের মূল সমস্যা হলো সঠিক উদ্যোগ ও ধারাবাহিক সহায়তার অভাব। গ্রামীণ পর্যায় থেকেও অনেক বিজ্ঞানী উঠে আসছেন, কিন্তু তাদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বর্তমান বাজেটে নতুন নতুন উদ্ভাবনের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে এ ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক।

চিকিৎসাখাতের উন্নয়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়নে কাজ করতে সক্ষম এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে আমি নিজে তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করতে প্রস্তুত এবং সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করব।

নিজস্ব প্রযুক্তিতে অ্যাম্বুলেন্স তৈরি হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, একদল বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে একটি প্রকল্প উপস্থাপন করেছেন। তারা দুই ধরনের দেশীয় অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করতে যাচ্ছেন—একটি দুর্গম গ্রামীণ অঞ্চল থেকে রোগী আনার জন্য এবং অন্যটি দূরপাল্লার যাতায়াতের জন্য। আগামী চার বছরের মধ্যে এই প্রকল্পকে চূড়ান্ত রূপ দিতে সরকার সম্পূর্ণ অর্থায়ন করতে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা-সরঞ্জাম আমদানিতে প্রতিদিন দেশের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। যদি দেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা স্থানীয়ভাবে এসব প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম তৈরি করতে পারেন, তবে সরকার স্থানীয় উৎপাদন নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবে। এটি একদিকে যেমন আমদানিনির্ভরতা কমাবে, অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটাবে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত কর্মসূচির আওতায় দেশের প্রতিটি গ্রাম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই লক্ষ্য অর্জনে চিকিৎসকদের পাশাপাশি দেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকদের এগিয়ে আসতে হবে। আপনারা যদি দেশেই উন্নতমানের চিকিৎসা-সরঞ্জাম উদ্ভাবন করতে পারেন, তবে বিদেশি ডিলারদের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় বন্ধ হবে এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।

সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার সিদ্দিক-ই-রাব্বানী এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আকরাম হোসেনসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।