ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

ইসলামী ব্যাংক বা কোনো রাজনৈতিক দলকে ইসলামের সঙ্গে একাকার না করার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয়, আবার জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়। সব কিছুতে এভাবে ইসলামের দোহাই দেওয়া ঠিক নয়।

মঙ্গলবার (৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনের তৃতীয় দিন ৬৮ বিধিতে দেওয়া ইসলামী ব্যাংক সংক্রান্ত বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানের নোটিশের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে এ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

তিনি বলেন, ব্যাংকটিতে যেসব কর্মীকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তাদের সবাইকে চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা সঠিক ছিল, তাও খতিয়ে দেখা দরকার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখন বলা হচ্ছে আপনারা ব্যাংকের মালিক না। জামায়াতে ইসলাম ব্যাংকের মালিক না। আবার বলছে ইসলামের ওপরে হাত দেবেন না। ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। আমাদের মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয়। জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়। সুতরাং সবকিছুতেই ইসলামের ওপরে হাত দেবেন না দোহাই দেওয়া কিন্তু ঠিক নয়।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি এবং জামায়াতে ইসলামী মানেই ‘ইসলাম’ নয় মন্তব্য করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ধর্মের দোহাই দিয়ে সবকিছু থেকে বাঁচার সুযোগ নেই। এই ব্যাংকে আগে যে হরিলুট, রাজনৈতিক নিয়োগ ও ঋণ জালিয়াতি হয়েছে, সবকিছুর সুষ্ঠু তদন্ত করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংসদে ‘দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ারগুলো বৈধ ও প্রকৃত মালিকদের কাছে প্রত্যর্পণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অন্যায় হস্তক্ষেপ বন্ধ’ করার দাবিতে এ আলোচনার প্রস্তাব করেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান।

এই প্রস্তাবের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলের কড়া সমালোচনা করেন।

ব্যাংকটির সাবেক নিয়ন্ত্রকদের (জামায়াতে ইসলামী সংশ্লিষ্ট) ইঙ্গিত করে তিনি কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের কবিতা উদ্ধৃত করে বলেন, ‘কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে…।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একবার যে ব্যাংক আজান দিয়ে, তাকবির দিয়ে দখল করা হলো, সেই ব্যাংকের দখলটা বেদখল হয়ে গেলে যে কী যাতনা, তা আমরা বুঝি। এখন পর্দার আড়ালে থেকে গ্রাহক সাজিয়ে রাস্তায় আন্দোলন করানো হচ্ছে। ইসলামের ওপর হাত দেবেন না বলে দোহাই দেওয়া হচ্ছে। মাননীয় স্পিকার, ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়। সুতরাং সবকিছুতেই ইসলামের দোহাই দেওয়া ঠিক নয়।

ব্যাংকটির পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের (আরডিএস) তীব্র সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি নারী গ্রাহক নির্ভর একটি প্রকল্প। ভোটের আগে এই প্রকল্প থেকে নারীদের ১০ হাজার টাকা করে দিয়ে বলা হয়েছে— কোরআনের দলে ভোট না দিলে জান্নাতে যাওয়া যাবে না, ভোট দিলে জান্নাত মিলবে এবং আরও ১০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। এই আরডিএস প্রকল্পে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৫ আগস্ট (২০২৪) পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, যার কোনো হদিস নেই।

রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেওয়ার অভিযোগ তুলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নাবিল গ্রুপকে এলসির বিপরীতে ৭০০ কোটি টাকা লোন দেওয়া হয়েছে। দুষ্টু লোকেরা বলে সেই টাকা একটি দলের নির্বাচনী তহবিলে গেছে এবং একটি টিভি চ্যানেল খোলা হয়েছে। লান্তাবুর গ্রুপকে হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়া নির্বাচনের আগে ৪০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। সিএসআর ফান্ডের টাকা দিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের বিমানের টিকিট কাটা হয়েছে। এগুলোর সবকিছুর তদন্ত হবে।

ইসলামী ব্যাংকে গণহারে চাকরিচ্যুতি ও রাজনৈতিক নিয়োগের পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকটি দখল করার পর কোনো আইন-কানুন না মেনে অন্যায়ভাবে ৯ হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বিপরীতে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় ৬ হাজার নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ১৩ হাজার জনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে দুই-তিনটি করে প্রমোশন দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়ম ইসলামের নামেই হয়েছে। অন্যায়ভাবে যাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

ব্যাংকটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নতুন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এখনো কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ‘প্রিজাম্পশন অব ইনোসেন্স’ নীতি অনুসারে তিনি বেনিফিট পাবেন। যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসে, তবে নিশ্চয়ই তদন্ত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫, ৪৬, ৪৭ ও ৫৭ ধারার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় পর্ষদ বাতিল বা নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রয়েছে।

বিরোধীদের শেয়ার ফেরত দেওয়ার দাবির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইবনে সিনা ব্লক মার্কেটে তিনগুণ দামে শেয়ার বিক্রি করেছে, যা একটি রেকর্ড। তবে যারা বৈধ এবং প্রকৃত শেয়ারহোল্ডার, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের মালিকানা ফেরত দেওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেই সঙ্গে এস আলম গ্রুপের লাখো কোটি টাকা পাচারসহ বিগত সময়ে দেশের যত টাকা পাচার হয়েছে, সবকিছুর সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংসদকে আশ্বস্ত করেন তিনি।

তিনি বলেন, এখানে আরডিএস নামে একটা প্রকল্প আছে। সেই প্রকল্প হচ্ছে ইসলামী ব্যাংকের একটা ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প। এই প্রকল্পের মূল হচ্ছে পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প নামে। যেখানে ৫ হাজার, ১০ হাজার, ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোন দেওয়া যায়। নারী গ্রাহকের সংখ্যাই বেশি। ভোটের আগে ১০ হাজার টাকা করে অনেক নারীকে দেওয়া হয়েছে। লাইনে এক ভোটারকে আমার এক কর্মী জিজ্ঞেস করেন মা আপনি কোথায় ভোট দেবেন- বলছে বাবা, কোরআনের দলে না দিলে তো জান্নাতে যাওয়া যাবে না। ১০ হাজার টাকাও দিয়েছে, বলেছে এটা মাফ হয়ে যাবে, আরও ১০ হাজার টাকা পাবো। মুনাফা হিসাবে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে জান্নাত পাওয়ার নিশ্চয়তাও দিয়েছে। এই আরডিএস প্রকল্পের মধ্যে কত হাজার কোটি টাকা ডিস্ট্রিবিউট হয়েছে জানেন- ২২ হাজার কোটি টাকা। ১১ হাজার কোটি টাকা আগে দেওয়া হয়েছিল। ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পরে নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, এর কোনো হদিস নেই। একজন নারী ভোটারের কথা তো বললাম।

তিনি আরও বলেন, আজকে ইন্টারেস্টিংলি দেখছি আমাদের এনসিপির বন্ধুরা কেউ নেই। আপনারা জামায়াতে ইসলামীকে কী বয়কট করলেন কিনা জানি না, কেউ বক্তব্যও দেয়নি, আমি চেয়ারগুলো খালি দেখে বলতেছি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক থেকে হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়াই একটি গোষ্ঠীকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়াই একটি গোষ্ঠীকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে, যার কোনও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নেই। এছাড়া সামাজিক কর্পোরেট দায়িত্ব (এসআর) কর্মসূচির নামে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে, যেগুলো তদন্তের আওতায় আনা হবে।

তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন নিয়োগ, পদোন্নতি ও চাকরিচ্যুতির বিষয়েও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তার দাবি অনুযায়ী, প্রায় ৯ হাজার জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন নিয়োগ ও পদোন্নতির অভিযোগও রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে তদন্ত হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের বিভিন্ন ঋণ বিতরণ, বিশেষ করে আরডিএস প্রকল্প এবং নির্বাচনের আগে অর্থ বিতরণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়েও তদন্ত প্রয়োজন।

মন্ত্রী বলেন, ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে সব পক্ষের বিরুদ্ধে তদন্ত হতে হবে। শুধু অভিযোগ নয়, প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

তিনি আরও দাবি করেন, ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনও প্রমাণিত অভিযোগ নেই। তাই প্রাথমিকভাবে তাকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনও অভিযোগ উঠলে তা অবশ্যই তদন্ত করা হবে, তবে তদন্ত ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা ঠিক নয়।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনা ছেড়ে ব্রাজিলে যোগ দিলেন যুবক

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ০৯:০৯:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

ইসলামী ব্যাংক বা কোনো রাজনৈতিক দলকে ইসলামের সঙ্গে একাকার না করার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয়, আবার জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়। সব কিছুতে এভাবে ইসলামের দোহাই দেওয়া ঠিক নয়।

মঙ্গলবার (৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনের তৃতীয় দিন ৬৮ বিধিতে দেওয়া ইসলামী ব্যাংক সংক্রান্ত বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানের নোটিশের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে এ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

তিনি বলেন, ব্যাংকটিতে যেসব কর্মীকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তাদের সবাইকে চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা সঠিক ছিল, তাও খতিয়ে দেখা দরকার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখন বলা হচ্ছে আপনারা ব্যাংকের মালিক না। জামায়াতে ইসলাম ব্যাংকের মালিক না। আবার বলছে ইসলামের ওপরে হাত দেবেন না। ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। আমাদের মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয়। জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়। সুতরাং সবকিছুতেই ইসলামের ওপরে হাত দেবেন না দোহাই দেওয়া কিন্তু ঠিক নয়।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি এবং জামায়াতে ইসলামী মানেই ‘ইসলাম’ নয় মন্তব্য করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ধর্মের দোহাই দিয়ে সবকিছু থেকে বাঁচার সুযোগ নেই। এই ব্যাংকে আগে যে হরিলুট, রাজনৈতিক নিয়োগ ও ঋণ জালিয়াতি হয়েছে, সবকিছুর সুষ্ঠু তদন্ত করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংসদে ‘দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ারগুলো বৈধ ও প্রকৃত মালিকদের কাছে প্রত্যর্পণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অন্যায় হস্তক্ষেপ বন্ধ’ করার দাবিতে এ আলোচনার প্রস্তাব করেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান।

এই প্রস্তাবের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলের কড়া সমালোচনা করেন।

ব্যাংকটির সাবেক নিয়ন্ত্রকদের (জামায়াতে ইসলামী সংশ্লিষ্ট) ইঙ্গিত করে তিনি কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের কবিতা উদ্ধৃত করে বলেন, ‘কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে…।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একবার যে ব্যাংক আজান দিয়ে, তাকবির দিয়ে দখল করা হলো, সেই ব্যাংকের দখলটা বেদখল হয়ে গেলে যে কী যাতনা, তা আমরা বুঝি। এখন পর্দার আড়ালে থেকে গ্রাহক সাজিয়ে রাস্তায় আন্দোলন করানো হচ্ছে। ইসলামের ওপর হাত দেবেন না বলে দোহাই দেওয়া হচ্ছে। মাননীয় স্পিকার, ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়। সুতরাং সবকিছুতেই ইসলামের দোহাই দেওয়া ঠিক নয়।

ব্যাংকটির পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের (আরডিএস) তীব্র সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি নারী গ্রাহক নির্ভর একটি প্রকল্প। ভোটের আগে এই প্রকল্প থেকে নারীদের ১০ হাজার টাকা করে দিয়ে বলা হয়েছে— কোরআনের দলে ভোট না দিলে জান্নাতে যাওয়া যাবে না, ভোট দিলে জান্নাত মিলবে এবং আরও ১০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। এই আরডিএস প্রকল্পে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৫ আগস্ট (২০২৪) পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, যার কোনো হদিস নেই।

রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেওয়ার অভিযোগ তুলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নাবিল গ্রুপকে এলসির বিপরীতে ৭০০ কোটি টাকা লোন দেওয়া হয়েছে। দুষ্টু লোকেরা বলে সেই টাকা একটি দলের নির্বাচনী তহবিলে গেছে এবং একটি টিভি চ্যানেল খোলা হয়েছে। লান্তাবুর গ্রুপকে হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়া নির্বাচনের আগে ৪০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। সিএসআর ফান্ডের টাকা দিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের বিমানের টিকিট কাটা হয়েছে। এগুলোর সবকিছুর তদন্ত হবে।

ইসলামী ব্যাংকে গণহারে চাকরিচ্যুতি ও রাজনৈতিক নিয়োগের পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকটি দখল করার পর কোনো আইন-কানুন না মেনে অন্যায়ভাবে ৯ হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বিপরীতে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় ৬ হাজার নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ১৩ হাজার জনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে দুই-তিনটি করে প্রমোশন দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়ম ইসলামের নামেই হয়েছে। অন্যায়ভাবে যাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

ব্যাংকটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নতুন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এখনো কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ‘প্রিজাম্পশন অব ইনোসেন্স’ নীতি অনুসারে তিনি বেনিফিট পাবেন। যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসে, তবে নিশ্চয়ই তদন্ত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫, ৪৬, ৪৭ ও ৫৭ ধারার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় পর্ষদ বাতিল বা নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রয়েছে।

বিরোধীদের শেয়ার ফেরত দেওয়ার দাবির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইবনে সিনা ব্লক মার্কেটে তিনগুণ দামে শেয়ার বিক্রি করেছে, যা একটি রেকর্ড। তবে যারা বৈধ এবং প্রকৃত শেয়ারহোল্ডার, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের মালিকানা ফেরত দেওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেই সঙ্গে এস আলম গ্রুপের লাখো কোটি টাকা পাচারসহ বিগত সময়ে দেশের যত টাকা পাচার হয়েছে, সবকিছুর সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংসদকে আশ্বস্ত করেন তিনি।

তিনি বলেন, এখানে আরডিএস নামে একটা প্রকল্প আছে। সেই প্রকল্প হচ্ছে ইসলামী ব্যাংকের একটা ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প। এই প্রকল্পের মূল হচ্ছে পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প নামে। যেখানে ৫ হাজার, ১০ হাজার, ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোন দেওয়া যায়। নারী গ্রাহকের সংখ্যাই বেশি। ভোটের আগে ১০ হাজার টাকা করে অনেক নারীকে দেওয়া হয়েছে। লাইনে এক ভোটারকে আমার এক কর্মী জিজ্ঞেস করেন মা আপনি কোথায় ভোট দেবেন- বলছে বাবা, কোরআনের দলে না দিলে তো জান্নাতে যাওয়া যাবে না। ১০ হাজার টাকাও দিয়েছে, বলেছে এটা মাফ হয়ে যাবে, আরও ১০ হাজার টাকা পাবো। মুনাফা হিসাবে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে জান্নাত পাওয়ার নিশ্চয়তাও দিয়েছে। এই আরডিএস প্রকল্পের মধ্যে কত হাজার কোটি টাকা ডিস্ট্রিবিউট হয়েছে জানেন- ২২ হাজার কোটি টাকা। ১১ হাজার কোটি টাকা আগে দেওয়া হয়েছিল। ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পরে নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, এর কোনো হদিস নেই। একজন নারী ভোটারের কথা তো বললাম।

তিনি আরও বলেন, আজকে ইন্টারেস্টিংলি দেখছি আমাদের এনসিপির বন্ধুরা কেউ নেই। আপনারা জামায়াতে ইসলামীকে কী বয়কট করলেন কিনা জানি না, কেউ বক্তব্যও দেয়নি, আমি চেয়ারগুলো খালি দেখে বলতেছি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক থেকে হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়াই একটি গোষ্ঠীকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়াই একটি গোষ্ঠীকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে, যার কোনও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নেই। এছাড়া সামাজিক কর্পোরেট দায়িত্ব (এসআর) কর্মসূচির নামে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে, যেগুলো তদন্তের আওতায় আনা হবে।

তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন নিয়োগ, পদোন্নতি ও চাকরিচ্যুতির বিষয়েও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তার দাবি অনুযায়ী, প্রায় ৯ হাজার জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন নিয়োগ ও পদোন্নতির অভিযোগও রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে তদন্ত হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের বিভিন্ন ঋণ বিতরণ, বিশেষ করে আরডিএস প্রকল্প এবং নির্বাচনের আগে অর্থ বিতরণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়েও তদন্ত প্রয়োজন।

মন্ত্রী বলেন, ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে সব পক্ষের বিরুদ্ধে তদন্ত হতে হবে। শুধু অভিযোগ নয়, প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

তিনি আরও দাবি করেন, ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনও প্রমাণিত অভিযোগ নেই। তাই প্রাথমিকভাবে তাকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনও অভিযোগ উঠলে তা অবশ্যই তদন্ত করা হবে, তবে তদন্ত ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা ঠিক নয়।