অবশেষে হরমুজ পাড়ি দিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’

চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি : 

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকটে পড়ে সাড়ে চার মাস পর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আন্তর্জাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টার দিকে জাহাজটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ পাড়ি দেয়। বর্তমানে এটি জ্বালানি সংগ্রহের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের দিকে যাচ্ছে।

জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাহাজটির ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম।

রাত ৩টায় এক খুদে বার্তায় তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আল্লাহর অশেষ কৃপায় আমরা হরমুজ প্রণালি পার হয়েছি। আমরা ফুজাইরার দিকে যাচ্ছি।

একই কথা জানিয়েছেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক। তিনি জানান, দীর্ঘ সাড়ে চার মাস আটকে থাকার পর বাংলার জয়যাত্রা বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায় হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনায়, জাহাজের নাবিকদের অসীম দায়িত্ববোধের কারণে আমরা এই সংকটময় পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছি।

তিনি আরও জানান, জাহাজটি বর্তমানে নিরাপদ বাঙ্কারিং ও প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের জলসীমার দিকে সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। জাহাজটিতে কর্মরত ৩১ জন ক্রুর সবাই বাংলাদেশি নাগরিক, যারা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুস্থ আছেন।

বিএসসি সূত্রে জানা যায়, সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি খ্যাতনামা চার্টারের অধীনে ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি গত ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে।

প্রাথমিকভাবে জাহাজটি কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল বোঝাই করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে নিয়ে আসে। তবে জাহাজটি জেবেল আলী বন্দরে অবস্থানকালেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই অঞ্চলে তীব্র আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে জাহাজের কার্গো খালাস প্রক্রিয়া চরম হুমকির মুখে পড়লেও, সেই তীব্র প্রতিকূলতা ও যুদ্ধজনিত ঝুঁকির মাঝেই অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে গত ১১ মার্চ জেবেল আলী কদরে স্টিল কয়েল কার্গো সফলভাবে খালাস সম্পন্ন করা হয়।

কার্গো খালাস সম্পন্ন হওয়ার পর যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজটির পক্ষে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় জাহাজটি যেন অলস বসে না থাকে এবং চার্টারারের ‘হায়ার’ বা দৈনিক ভাড়া প্রাপ্তি যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয় সেই দূরদর্শী বাণিজ্যিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিএসসি ম্যানেজমেন্ট।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাহাজটিকে সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দরে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে প্রায় ৩৭,০০০ টন ফার্টিলাইজার (সার) বোঝাই করে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন ও ডারবান বন্দরের উদ্দেশে রওনা করানো হয়।

কিন্তু সার বোঝাই করার পর হরমুজ প্রণালির তীব্র অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজটি আর ওখান থেকে বের হতে পারেনি। দীর্ঘ অচলাবস্থার একপর্যায়ে, গত ১৮ এপ্রিল ইরান নৌবাহিনী নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণ দেখিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজটির ট্রানজিট বা পারাপারের অনুমতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই স্পর্শকাতর যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় এক অভূতপূর্ব অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আটকা পড়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে অপেক্ষা করতে থাকে বিএসসির এই বাণিজ্যিক জাহাজটি।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

বিমানে স্মার্টফোন বিস্ফোরণ, অল্পের জন্য বাঁচলেন যাত্রীরা

অবশেষে হরমুজ পাড়ি দিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’

প্রকাশের সময় : ১২:০৩:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি : 

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকটে পড়ে সাড়ে চার মাস পর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আন্তর্জাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টার দিকে জাহাজটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ পাড়ি দেয়। বর্তমানে এটি জ্বালানি সংগ্রহের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের দিকে যাচ্ছে।

জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাহাজটির ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম।

রাত ৩টায় এক খুদে বার্তায় তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আল্লাহর অশেষ কৃপায় আমরা হরমুজ প্রণালি পার হয়েছি। আমরা ফুজাইরার দিকে যাচ্ছি।

একই কথা জানিয়েছেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক। তিনি জানান, দীর্ঘ সাড়ে চার মাস আটকে থাকার পর বাংলার জয়যাত্রা বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায় হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনায়, জাহাজের নাবিকদের অসীম দায়িত্ববোধের কারণে আমরা এই সংকটময় পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছি।

তিনি আরও জানান, জাহাজটি বর্তমানে নিরাপদ বাঙ্কারিং ও প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের জলসীমার দিকে সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। জাহাজটিতে কর্মরত ৩১ জন ক্রুর সবাই বাংলাদেশি নাগরিক, যারা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুস্থ আছেন।

বিএসসি সূত্রে জানা যায়, সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি খ্যাতনামা চার্টারের অধীনে ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি গত ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে।

প্রাথমিকভাবে জাহাজটি কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল বোঝাই করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে নিয়ে আসে। তবে জাহাজটি জেবেল আলী বন্দরে অবস্থানকালেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই অঞ্চলে তীব্র আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে জাহাজের কার্গো খালাস প্রক্রিয়া চরম হুমকির মুখে পড়লেও, সেই তীব্র প্রতিকূলতা ও যুদ্ধজনিত ঝুঁকির মাঝেই অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে গত ১১ মার্চ জেবেল আলী কদরে স্টিল কয়েল কার্গো সফলভাবে খালাস সম্পন্ন করা হয়।

কার্গো খালাস সম্পন্ন হওয়ার পর যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজটির পক্ষে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় জাহাজটি যেন অলস বসে না থাকে এবং চার্টারারের ‘হায়ার’ বা দৈনিক ভাড়া প্রাপ্তি যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয় সেই দূরদর্শী বাণিজ্যিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিএসসি ম্যানেজমেন্ট।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাহাজটিকে সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দরে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে প্রায় ৩৭,০০০ টন ফার্টিলাইজার (সার) বোঝাই করে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন ও ডারবান বন্দরের উদ্দেশে রওনা করানো হয়।

কিন্তু সার বোঝাই করার পর হরমুজ প্রণালির তীব্র অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজটি আর ওখান থেকে বের হতে পারেনি। দীর্ঘ অচলাবস্থার একপর্যায়ে, গত ১৮ এপ্রিল ইরান নৌবাহিনী নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণ দেখিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজটির ট্রানজিট বা পারাপারের অনুমতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই স্পর্শকাতর যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় এক অভূতপূর্ব অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আটকা পড়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে অপেক্ষা করতে থাকে বিএসসির এই বাণিজ্যিক জাহাজটি।