নিজস্ব প্রতিবেদক :
ভারত সরকার যদি এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বন্ধ না করে এবং দলটির কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ অব্যাহত রাখে, তাহলে তা বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচারী একটি দলকে কথা বলার সুযোগ দেয়া হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত ভারতেরই নিতে হবে। তবে বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতি ও বাস্তবতাকে ভারতের বিবেচনায় নেয়া উচিত।
তিনি বলেন, ভারত কী করবে, না করবে, সেটি তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের সেন্টিমেন্টকে ভারতের বুঝতে হবে।
শামা ওবায়েদ অভিযোগ করেন, অতীতে সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়গুলো আড়াল করতে আওয়ামী লীগ পুরোনো সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের তত্ত্ব সামনে আনছে। আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এমন প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
শেখ হাসিনা দিল্লিতে বক্তব্য দেয়ার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এখন কেমন হবে, জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেখেন, একটা দেশের সাথে একটা সরকার… একটা গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট রিলেশনতো বহুমুখী হয়। এখন আমরা যদি… এখন খুনি হাসিনা বা তার দোসররা তো চাইবেই যে আমরা ওই জায়গায় আটকে থাকি। আমরা তো… বাংলাদেশ তো একটা জায়গায় আটকে থাকতে পারে না। একটা দেশের সাথে একটা দেশের বহুমুখী সম্পর্ক। আমি আগেই বলেছি কিন্তু, তাদের সাথে আমাদের অনেক ডায়লগ… ভারতের সাথে আমাদের অনেক ডায়লগ হওয়ার প্রয়োজন, অনেক আলোচনার প্রয়োজন আছে, আমাদের বিভিন্ন ইস্যু আছে, আমাদের এনার্জি নিয়ে আমাদের কো-অপারেশন আছে, আমাদের পানি নিয়ে ওদের সাথে বিরাট ইস্যু আছে, বর্ডার নিয়ে ইস্যু আছে, তো এগুলো তো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
তিনি বলেন, এখানে ২৪ ঘণ্টা, ৩৬ ঘণ্টার ব্যাপার নয়; এই আলোচনাগুলো চলবে, এই ডায়লগগুলো চলবে। কিন্তু ঐটাও তো একটা বার্নিং ইস্যু, যেটা জুলাই যোদ্ধাদেরকে আহত করে, যেটা জুলাই যোদ্ধাদের পরিবারদেরকে আহত করে, যেটা বাংলাদেশের জনগণের সেন্টিমেন্টকে আঘাত করে, যেটা বাংলাদেশের ১৭ কোটি গণতন্ত্রকামী মানুষ—যারা যুদ্ধ করেছে, প্রাণ দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে—তাদেরকে আহত করে, সেই জায়গায় ভারতকে আরও বেশি সংবেদনশীল হতে হবে এবং তাদের ভবিষ্যতে কী করতে হবে, সে বিষয়ে তাদের একটি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আওয়ামী লীগ অতীতের মতো এখনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ‘জঙ্গিবাদের ন্যারেটিভ’ সামনে আনার চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করে বলেন, ক্ষমতায় থাকাকালে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো আড়াল করতে দলটি যেভাবে জঙ্গিবাদের প্রসঙ্গ তুলত, এখন বিদেশের মাটিতে বসেও একই কৌশল অনুসরণ করছে।
আওয়ামী লীগের ‘জঙ্গিবাদ’ প্রসঙ্গ উত্থাপন নিয়ে সরকারের অবস্থান কী জানতে চাইলে শামা ওবায়েদ বলেন, এটি আওয়ামী লীগের পুরোনো নোংরা রাজনীতি। শেখ হাসিনা ১৭ বছর ধরে দমন-পীড়ন চালানোর সময় যখনই গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় সামনে এসেছে, তখনই তারা জঙ্গিবাদের ন্যারেটিভ তৈরি করেছে। এখন বিদেশের মাটিতে বসেও একই কাজ করছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ও বিরোধী দল রয়েছে। তাই দেশে জঙ্গিবাদের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মনোযোগ পাওয়ার জন্যই আওয়ামী লীগ এসব প্রচারণা চালাচ্ছে।
শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে এবং কূটনৈতিক ভাষায় ভারতের কাছে বাংলাদেশের উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এর আগেও একই বার্তা একাধিকবার দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নত হোক, সেটি দুই দেশের সরকার ও জনগণই চায়। কিন্তু ভারতের মাটিতে বসে একজন সাজাপ্রাপ্ত স্বৈরাচার এবং আওয়ামী লীগের নেতারা যদি ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে থাকেন এবং ভারত সরকার যদি সেটি বন্ধ না করে, তাহলে অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হবে।
শামা ওবায়েদ বলেন, দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি, পানি, সীমান্তসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, যেগুলোর সমাধান সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমেই করতে হবে। তবে শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে দেওয়া হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত ভারত সরকারকেই নিতে হবে।
মানবাধিকার নিয়ে আওয়ামী লীগের বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের মুখে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের কথা অত্যন্ত হাস্যকর।
তিনি বলেন, ইলিয়াস আলীসহ অসংখ্য মানুষ গুম হয়েছেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে। জুলাই-আগস্টে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। তখন মানবাধিকার কোথায় ছিল?
তার ভাষায়, বাংলাদেশের মানুষ দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ এবং গত ১৭-১৮ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, সরকার-সরকার সম্পর্ক বহুমাত্রিক। একটি ইস্যুর কারণে অন্য সহযোগিতা থেমে থাকতে পারে না।
তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে জ্বালানি, পানিবণ্টন, সীমান্তসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের সহযোগিতা রয়েছে। এসব নিয়ে আলোচনা চলবে। তবে জুলাইয়ের শহীদ পরিবার, আহত যোদ্ধা এবং বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতিকে আঘাত করে এমন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ভারতকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে।
ভারতকে পাঠানো বাংলাদেশের কূটনৈতিক বার্তার জবাব সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা আমাদের চিঠি দিয়েছি। এখন ভারত কী জবাব দেয়, সেটির জন্য অপেক্ষা করুন।
বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশনের (বিমসটেক) বর্তমান সভাপতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী নিজেই নেবেন বলে জানিয়ে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ বিমসটেকের সভাপতিত্ব করছে। ব্রিকস একটি বহুপাক্ষিক সংস্থা, যেখানে বাংলাদেশ অবশ্যই অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী। সেই হিসেবে প্রধানমন্ত্রী সেখানে অংশগ্রহণ করবেন কি করবেন না, সেটা ওনার ব্যস্ততা, ওনার সময় এবং উনি সেটা বলে দেবেন।
তিনি বলেন, সিদ্ধান্তটা ওনাকেই নিতে হবে, কারণ ওনার সময়সূচির ওপর নির্ভর করবে—উনি যেতে পারবেন কি পারবেন না।
ভারতের দিক থেকে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়া ছাড়াও দ্বিপাক্ষিক সফরের একটি আমন্ত্রণ রয়েছে। দুটি আমন্ত্রণ কি এখনো রয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, দাওয়াত তো আছে।
আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ পর্বে অংশ নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। তবে ওই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বাংলাদেশ সম্মেলনে যোগ দেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
গতকালকের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির প্রোগ্রামে আমরা দেখেছি সেখানে বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা অনুষ্ঠান ত্যাগ করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ওখানে ছিলাম না। দেখেন, একটা রাজনৈতিক প্রোগ্রামে বহু ধরণের মানুষ থাকে, এগুলো হতেই পারে। আমি উপস্থিত ছিলাম না, আমি এটা নিয়ে কোনো কমেন্ট করব না।
আপনারা এর আগেও বহুবার ভারতকে একই অবস্থানই জানিয়েছেন। কিন্তু গতকালকে তারপরেও দিল্লিতে এরকম একটা প্রেস ব্রিফিং টাইপ ঘটনা ঘটলো। এরকম যদি চলতে থাকে, তাহলে হাইয়েস্ট লেভেলের ভিজিটের মতো ভালো সম্পর্ক কি থাকবে? নাকি অন্তত কতটুক সীমার রেখা বাংলাদেশ রাখবে?
এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইন্ডিয়া ইজ এ ডেমোক্রেটিক কান্ট্রি। ইন্ডিয়া হ্যাজ টু ডিসাইড হোয়াট দেয়ার ফরেন পলিসি উইল বি রিগার্ডিং বাংলাদেশ। সো, আমরা চাই ভালো সম্পর্ক থাকুক দুই দেশের জনগণের স্বার্থে। কিন্তু সম্পর্কটা তো হতে হবে সমতার ভিত্তিতে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের জায়গা রেখে এবং নিজেদের স্বার্থটাকে বজায় রেখে। তো সেটা ভারত বুঝতে পারলে সবার জন্য মঙ্গল।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















