চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি :
চট্টগ্রাম নগরের সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমের বাড়িতে এসে ছাত্রদল-যুবদলের নেতা-কর্মীদের তোপের মুখে পড়েন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতা ও জাতীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে নগরের আকবর শাহ থানার উত্তর কাট্টলী এলাকার ‘এইচ এম ভিলা’ নামের একটি বাসভবনে এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায়ে তাকে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে দেখা যায়।
পরে বিকেলে তিনি সাবেক এই মেয়রের কাট্টলীর বাড়িতে এসে ছাত্রদল-যুবদলের নেতা-কর্মীদের তোপের মুখে পড়েন। এ সময় তাঁকে বেশ বিব্রত অবস্থায় দেখা যায়।
দুপুরে নগরের কাট্টলি এলাকায় মনজুর আলমের বাসভবনে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন তিনি। খবর পেয়ে এ সময় মনজুর আলমের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন একদল লোক, যাঁরা নিজেদের জুলাই যোদ্ধা বলে পরিচয় দেন।
সাক্ষাৎ শেষে হাসনাত আবদুল্লাহ ওই বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাঁকে নানা প্রশ্ন করেন জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ ঘটনার একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, মনজুর আলমের বাসার সামনে হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরে কয়েকজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন। এ সময় একজন হাসনাত আবদুল্লাহকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি আওয়ামী লীগের দোসরের বাসায় কাজ কী? আপনি একজন জুলাই যোদ্ধা। সংসদে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার কথা বলছেন। তাহলে আওয়ামী লীগের দোসরের বাসায় কেন?’
এ সময় হাসনাত আবদুল্লাহকে হাত নাড়িয়ে তাঁদের শান্ত করতে দেখা যায়। পরে একজন এসে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের সরে যেতে বলেন।
স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে মনজুর আলম দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। সেই প্রেক্ষাপটে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বর্তমান সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিত হাসনাত আবদুল্লাহর সেখানে উপস্থিতি ঘিরে ছাত্রদল, যুবদল, জুলাই আন্দোলনের কর্মী ও এলাকাবাসীর মধ্যে কৌতূহল ও ক্ষোভ তৈরি হয়। তারা বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন এবং তার কাছে অবস্থানের ব্যাখ্যা দাবি করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাসার সামনে জড়ো হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ উচ্চস্বরে স্লোগান দেন এবং হাসনাত আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে নানা প্রশ্ন তোলেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সেখানে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এ সময় আশপাশের বাসিন্দা ও পথচারীদের মধ্যেও কৌতূহল দেখা দেয় এবং অনেকে ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, এক যুবক সরাসরি হাসনাত আবদুল্লাহর কাছে তার ওই বাসায় যাওয়ার কারণ জানতে চাইছেন। ভিডিওতে আরও দেখা যায়, উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি তাকে আওয়ামী লীগের ‘দালাল’ বলে আখ্যা দেন এবং কেন তিনি সাবেক মেয়রের বাসায় গেছেন- সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দাবি করেন। ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠলে নিরাপত্তাজনিত কারণে হাসনাত আবদুল্লাহ বাসা থেকে বের হয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। স্থানীয়দের মতে, সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতেই তিনি সেখানে বেশি সময় অবস্থান করেননি এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন।
এ বিষয়ে এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরের সমন্বয়কারী সদস্য ও মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী রিদুয়ান হৃদয় সাংবাদিকদের বলেন, হাসনাত আবদুল্লাহ মূলত ব্যক্তিগত কাজে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। এ সময় সাবেক মেয়র মনজুর আলমের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে যুবদল নেতা শাহেদ আকবর জানান, ‘আমরা হাসনাত আবদুল্লাহকে তাঁর ভারত ও আওয়ামীবিরোধী অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জানতে চাই, তিনি সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা এম মনজুর আলমের বাসায় কেন এসেছেন? তিনিও এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। আমরা বললাম, আপনি জুলাই আন্দোলনে একজন অগ্রসৈনিক হিসেবে আমাদের সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষ। কিন্তু আপনি এখানে আসলেন কেন? এভাবে তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে সন্ধ্যার সময় তাঁকে আমরা সসম্মানে মূল রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিই। এরপর তিনি চলে যান।’
জানতে চাইলে সাবেক মেয়র মনজুর আলম বলেন, সংসদ সদস্য এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ চট্টগ্রামে এসেছিলেন। পরে উনি আমার বাসায় বেড়াতে আসেন। বাসায় তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে। এর বেশি কিছু নয়।
এনসিপির প্রার্থী হয়ে আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে মনজুর আলম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে। এর মধ্যে তাঁর বাসায় হাসনাত আব্দুল্লাহর যাওয়া নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে মনজুর আলম বলেন, ‘রাজনৈতিক কোনো বিষয়েই আমাদের মধ্যে আলাপ হয়নি।’
অন্যদিকে আকবর শাহ থানার ওসি মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ঘটনাটি বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে রূপ নেয়নি। কয়েকজন ব্যক্তি বাসার সামনে এসে স্লোগান দিলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে হাসনাত আবদুল্লাহকে বলতে শোনা গেছে, রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে ব্যক্তিগত বা সামাজিক সম্পর্ক আলাদা বিষয়। আমি সেখানে চা খেতে গিয়েছিলাম।
বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রামে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এর মধ্যে রাত ৮টায় এনসিপির পক্ষ থেকে পাঠানো একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘বৈঠকে তাঁরা দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন। বৈঠকে উভয় নেতাই আগামী দিনে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।’
মোহাম্মদ মনজুর আলম ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন। ‘রাজনৈতিক গুরু’ হিসেবে পরিচিত সাবেক মেয়র প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে পরাজিত করে চমক সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। মেয়র হওয়ার পর বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাও হয়েছিলেন।
২০১৫ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশনের নির্বাচনেও বিএনপির সমর্থনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। একপর্যায়ে নির্বাচনের দিন সকালে কারচুপির অভিযোগ তুলে ভোট বর্জন করে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন মনজুর আলম। এর পর থেকে তাঁকে আর বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রমে দেখা যায়নি তাঁকে।
এর মধ্যে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের একটি আসনে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন মনজুর আলম। ওই বছর তিনি আর নির্বাচন করেননি। ২০২০ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কেনেন মনজুর আলম। তবে সেবারও তাঁকে মনোনয়ন দেয়নি আওয়ামী লীগ।
বিএনপির রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার পর দুই দফায় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইলেও দলটির কোনো পদে ছিলেন না মনজুর আলম।
চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি 




















