নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেছেন, হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং সবকিছু ঠিকঠাক করতে অন্তত দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। এই সময়ের মধ্যেই কাজ করতে হবে, মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে এবং উন্নত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অডিটোরিয়ামে শিশুদের হাম নিয়ে করা গবেষণার ফলাফল অবহিতকরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ডা. এম এ মুহিত বলেন, সবকিছু ঠিকঠাক করলেও হুট করে আগামী সপ্তাহেই হাম বন্ধ হয়ে যাবে এমন মিথ্যা আশ্বাস আমি কাউকে দেব না। কোনো দায়িত্বশীল চিকিৎসক বা বিজ্ঞানীও এমন আশ্বাস দেবেন না।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের সমস্যা এক দিনে বা সামনের সপ্তাহে সমাধান হয়ে যাবে এমন কোনো অবাস্তব প্রত্যাশা রাখা যাবে না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বর্তমান চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অবহেলার কারণে এই খাত নানা সংকটের মুখে পড়েছিল। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বড় নেটওয়ার্ক থাকলেও সেখানে মান নিয়ন্ত্রণ ও মুনাফার বিষয়টি জড়িত থাকে। তবে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, হলি ফ্যামিলি বা বারডেমের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি ও বেসরকারি খাতের একটি সুন্দর ভারসাম্য তৈরি করেছে।
শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার শিশু স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে দেশের ৫টি বিভাগীয় শহরে ৫টি পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল কাজ শুরু করবে। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকট দূর করতে খুব দ্রুত ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক, ১ হাজার নার্স এবং ১ লাখ নতুন মাঠকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। একবার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। শিশুদের হাম থেকে রক্ষা করতে হাসপাতালের শয্যা, আইসিইউ বা ভেন্টিলেটর বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রতিরোধের দিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কার্যকর প্রতিরোধের ক্ষেত্রে টিকার বিকল্প এখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানের জানা নেই।
তিনি বলেন, আমাদের ইমিউনাইজেশন ব্যবস্থায় যে গ্যাপ তৈরি হয়েছে, সেখান থেকেই এই প্রাদুর্ভাবের সৃষ্টি। এখন টিকার কভারেজ বাড়াতে হবে। আমাদের চূড়ান্ত সমাধান হচ্ছে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করা।
ডা. এম এ মুহিত বলেন, সময়মতো টিকা আনা এবং ২০২৪ সালের টিকাদান কর্মসূচি যথাসময়ে করতে না পারার মতো একাধিক কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে সীমিত জনবল নিয়েও স্বাস্থ্যকর্মীরা ব্যাপক কাজ করছেন।
তিনি বলেন, টিকা দেওয়ার জন্য আমাদের মাঠকর্মী থাকার কথা ৪০ হাজার। বর্তমানে আছেন ২৫ হাজার। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ জনবল কম। কিন্তু যারা আছেন, তাঁরা ২০০ শতাংশ পরিশ্রম করেছেন। গ্রাম-গঞ্জ, চরাঞ্চল—সাইকেল ও নৌকায় করে তাঁরা টিকা পৌঁছে দিয়েছেন। এক মাসের মধ্যে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডের বিবেচনায় এটি একটি বিশাল ইমিউনাইজেশন ক্যাম্পেইন।
স্বাস্থ্যকর্মীদের এই ত্যাগ ও কর্মস্পৃহাকে মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, আমাদের যে ঘাটতি, সেটা মূলত সংখ্যার ঘাটতি। যেখানে ১০ জন ডাক্তার দরকার, সেখানে আছে পাঁচজন। যেখানে ৪০ হাজার টিকাদান কর্মী দরকার, সেখানে আছে ২৫ হাজার। এই ঘাটতি পূরণ করতে হবে।
দেশের বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে বৃহত্তর বৈশ্বিক মহামারি প্রস্তুতির অংশ হিসেবেও দেখার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোভিড-১৯-এর মতো মহামারি মানুষের জীবদ্দশায় আগে খুব কমই দেখা গেছে। প্রযুক্তির পরিবর্তন, জীবাণুর পরিবর্তন, মানুষের জীবনযাত্রা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ভ্রমণ—সব মিলিয়ে ভবিষ্যতে মহামারি মোকাবিলায় প্রস্তুতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গ্লোবাল হেলথে এখন নাম্বার ওয়ান প্রায়োরিটি হচ্ছে প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস। পৃথিবীর সব দেশকেই স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নতুন করে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে, যাতে পরবর্তী মহামারির সময় আতঙ্কিত হয়ে পড়তে না হয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঠেকানো যায়।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি আক্রান্তদের উন্নত চিকিৎসা ও মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনার কাজও চলবে। তবে দীর্ঘদিনের ঘাটতি রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, এর মধ্যেই আমাদের কাজ করতে হবে, মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে, উন্নত ব্যবস্থাপনা দিতে হবে। কিন্তু অবাস্তব প্রত্যাশা রাখা যাবে না যে কোনো একটি ম্যাজিক বুলেটে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া সমস্যার সমাধান আগামীকাল বা সামনের সপ্তাহে হয়ে যাবে।
স্বাস্থ্য খাতে গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. এম এ মুহিত বলেন, ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলায় দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় করা হচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম নিয়ে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ এবং গবেষকদের অনুদান দেওয়ার উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানান।
তিনি বলেন, গবেষকদের আরও অনেক কাজ করতে হবে। দেশে ভালো ভালো গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের আমরা সক্রিয় করছি। আজ শিশু হাসপাতালে গবেষণার ফলাফল প্রকাশের পাশাপাশি যাঁদের গবেষণা অনুদান দেওয়া হলো, সেটিও আমার খুব ভালো লেগেছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এর পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম আজিজুল হকের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম এবং আইইডিসিআরের পরিচালক কাজী আহমেদ জাকী। গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম এবং আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















