ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে নতুন বাস্তবতায়, ১৭ বছরের ধারায় নয় : তথ্য উপদেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় এবং দুই স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, গত ১৭ বছরে যেভাবে ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সেই ধারায় আর সম্পর্ক এগোনোর সুযোগ নেই। বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থকে সামনে রেখেই ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারিত হবে।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, প্রতিবেশী পরিবর্তন করা যায় না, তবে বন্ধু পরিবর্তন করা যায়। তাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, তবে তা হতে হবে দুই স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদার ভিত্তিতে।

ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আমাদের তো প্রতিবেশী পাল্টানো সম্ভব নয়। বন্ধু পাল্টানো যায়-পররাষ্ট্রনীতিতে এমন কথা বলা হয়। তাই আমাদের এনগেজ করতে হবে। তবে আমাদের সম্পর্ক নতুন করে রিঅ্যালাইন করতে হবে।

তিনি বলেন, আগে ভারত যেভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়েছিল, সেখানে নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবণতা ছিল। ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সরকারের সঙ্গে নয়, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তৈরি হতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ভারতের অন্তত বক্তব্যে আমরা এখন জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলার বিষয়টি দেখছি। এটি ইতিবাচক। একই সঙ্গে দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কাউন্টারপার্টদের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা থাকতেই হবে।

উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা আগের মতো বাংলাদেশে কাজ করতে পারবে না। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল দেশের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করতে হয়, সেভাবেই সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে। ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের বক্তব্য থাকতে পারে, আমাদেরও থাকতে পারে। এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু দুই স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মধ্যে যে ধরনের আলোচনা হওয়া উচিত, সেভাবেই হতে হবে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।

বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে কোনো সম্পর্ক তৈরি করা হবে না জানিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, জনগণের নির্বাচিত সরকার কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো সম্পর্ক তৈরি করবে না, যাতে দেশের জনগণ বা রাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি বলেন, জনগণের কোনো সরকার জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থ নষ্ট করে কারও সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করবে না। এর মধ্যে কোনো এদিক-সেদিক হওয়ার সুযোগ নেই।

ভারতের পাশাপাশি বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এনগেজমেন্ট থাকবে। তবে প্রতিটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ভারতের সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী বক্তব্যেও বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের বিষয়ে আগের বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হওয়ার একটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভারত বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা বুঝবে এবং গত ১৭ বছরে যেভাবে সম্পর্ক পরিচালিত হয়েছে, তার বাইরে গিয়ে নতুনভাবে সম্পর্ক গড়ে তুলবে।

ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর একজন শীর্ষ কর্মকর্তার ঢাকা সফর নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে অপ্রয়োজনীয় জল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা চীন থেকে ঢাকা এসেছেন এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাউন্টারপার্টদের মধ্যে এ ধরনের যোগাযোগ স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারাও অতীতে ভারত সফর করেছেন। তবে এই ধরনের যোগাযোগ অবশ্যই বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার প্রতি সম্মান রেখে হতে হবে।

তিনি বলেন, আগে ভারতের কোনও সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে যেভাবে কাজ করে থাকুক, সেই ধরনের অ্যাটিটিউড এখন আর হতে পারবে না।

ডা. জাহেদ বলেন, বাংলাদেশে এখন জনগণের নির্বাচিত সরকার রয়েছে। জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কোনও দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির সুযোগ এই সরকারের নেই।

প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আগের বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ব্রিকসের একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে নয়, রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

তবে নতুন সরকার গঠনের পর ভারতের পক্ষ থেকে পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে জানান তিনি।

ফলে ভবিষ্যতে সফর হতে পারে। তবে ব্রিকসকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিগত সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বা রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা এখনও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও দফতরে দায়িত্বে আছেন এমন অভিযোগের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কাউকে সরকারি দায়িত্ব পালনের অযোগ্য ঘোষণা করা যায় না।

তিনি বলেন, একটি দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তা ও মতাদর্শের মানুষ সরকারি দায়িত্বে থাকতে পারেন, যদি তারা কোনও অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হন।

তবে যারা প্রকাশ্যে বিগত সরকারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন, তাদের বিষয়ে সরকার ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নিচ্ছে।

তিনি বলেন, নীতিগত অবস্থান হচ্ছে খুব তাড়াহুড়ো না করা। যারা খুব ব্র্যান্ডেড ছিলেন এবং প্রকাশ্যে ওই সরকারের সঙ্গে অ্যালাইড ছিলেন, তাদের ব্যাপারে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতেও পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন হচ্ছে বলে জানান তিনি।

গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন দফতরে এখনও বিগত সরকারের প্রভাব রয়েছে এবং তারা দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে— এক সাংবাদিকের এমন অভিযোগের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার বিষয়টি খেয়াল করবে।

নিজের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গত জুলাইয়ের দিনগুলোতে কী ঘটেছে এবং তিনি নিজে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, তা তার জানা আছে। ওই ঝুঁকিটা আমি নিজে বুঝি। খুব ভালোভাবে বুঝি।

জাহেদ উর রহমান বলেন, বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তিনি বলেন, আমরা হাসিনার মতো একটি মাফিয়া রেজিম এ দেশে আর দেখতে চাই না। ভবিষ্যতেও কোনও ফ্যাসিস্ট বা মাফিয়া রেজিম হতে দিতে চাই না।

সেই কারণেই অভিযুক্ত ব্যক্তি যত বড় অপরাধেই অভিযুক্ত হোন না কেন, তার আইনগত ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি।

সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, দুদক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান না হলেও আইনের মাধ্যমে গঠিত একটি স্বাধীন কমিশন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মতো স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা।

তিনি জানান, বর্তমানে নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া চলছে এবং শিগগিরই দুদক পুনর্গঠিত হবে বলে সরকার আশা করছে।

জাহেদ উর রহমান বলেন, নতুন কমিশন গঠনের পর সরকার তার তদন্ত বা কার্যক্রম থামিয়ে দেওয়ার অবস্থানে থাকবে না। সরকার চায় দুদক এমনভাবে তৈরি হোক, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, শুধু বিগত সরকারের দুর্নীতি নয়, বর্তমান সরকারের সময়েও কেউ দুর্নীতি বা অনিয়মে জড়িয়ে পড়লে দুদক তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে— এটাই সরকারের প্রত্যাশা।

তিনি বলেন, এই সরকারের সময়ও কেউ কোনও অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন কিনা, সেই ব্যাপারেও তারা পদক্ষেপ নেবেন আমরা সেটাই আশা করি।

শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এক প্রশ্নে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে শুধু উচ্চ গ্রেড বা ভালো ফল দেওয়ার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত শিক্ষার মান নিশ্চিত করে না।

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উচ্চ জিপিএ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থীর প্রত্যাশিত ফল করতে না পারার উদাহরণ তুলে ধরেন।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, শিক্ষার মান বাড়াতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রমের উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজের যোগ্যতায় ফল অর্জনের মানসিকতা তৈরি হওয়াও জরুরি বলে জানান তিনি।

তার মতে, শুধু পরীক্ষার ফল বাড়ানো নয়, প্রকৃত শিক্ষাগত সক্ষমতা তৈরি করাই হওয়া উচিত শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

ইলিশের উৎপাদন ও স্বাদ ধরে রাখতে নদী খননে জোর সরকারের : মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে নতুন বাস্তবতায়, ১৭ বছরের ধারায় নয় : তথ্য উপদেষ্টা

প্রকাশের সময় : ০১:৪২:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় এবং দুই স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, গত ১৭ বছরে যেভাবে ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সেই ধারায় আর সম্পর্ক এগোনোর সুযোগ নেই। বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থকে সামনে রেখেই ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারিত হবে।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, প্রতিবেশী পরিবর্তন করা যায় না, তবে বন্ধু পরিবর্তন করা যায়। তাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, তবে তা হতে হবে দুই স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদার ভিত্তিতে।

ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আমাদের তো প্রতিবেশী পাল্টানো সম্ভব নয়। বন্ধু পাল্টানো যায়-পররাষ্ট্রনীতিতে এমন কথা বলা হয়। তাই আমাদের এনগেজ করতে হবে। তবে আমাদের সম্পর্ক নতুন করে রিঅ্যালাইন করতে হবে।

তিনি বলেন, আগে ভারত যেভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়েছিল, সেখানে নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবণতা ছিল। ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সরকারের সঙ্গে নয়, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তৈরি হতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ভারতের অন্তত বক্তব্যে আমরা এখন জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলার বিষয়টি দেখছি। এটি ইতিবাচক। একই সঙ্গে দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কাউন্টারপার্টদের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা থাকতেই হবে।

উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা আগের মতো বাংলাদেশে কাজ করতে পারবে না। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল দেশের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করতে হয়, সেভাবেই সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে। ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের বক্তব্য থাকতে পারে, আমাদেরও থাকতে পারে। এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু দুই স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মধ্যে যে ধরনের আলোচনা হওয়া উচিত, সেভাবেই হতে হবে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।

বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে কোনো সম্পর্ক তৈরি করা হবে না জানিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, জনগণের নির্বাচিত সরকার কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো সম্পর্ক তৈরি করবে না, যাতে দেশের জনগণ বা রাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি বলেন, জনগণের কোনো সরকার জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থ নষ্ট করে কারও সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করবে না। এর মধ্যে কোনো এদিক-সেদিক হওয়ার সুযোগ নেই।

ভারতের পাশাপাশি বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এনগেজমেন্ট থাকবে। তবে প্রতিটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ভারতের সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী বক্তব্যেও বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের বিষয়ে আগের বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হওয়ার একটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভারত বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা বুঝবে এবং গত ১৭ বছরে যেভাবে সম্পর্ক পরিচালিত হয়েছে, তার বাইরে গিয়ে নতুনভাবে সম্পর্ক গড়ে তুলবে।

ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর একজন শীর্ষ কর্মকর্তার ঢাকা সফর নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে অপ্রয়োজনীয় জল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা চীন থেকে ঢাকা এসেছেন এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাউন্টারপার্টদের মধ্যে এ ধরনের যোগাযোগ স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারাও অতীতে ভারত সফর করেছেন। তবে এই ধরনের যোগাযোগ অবশ্যই বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার প্রতি সম্মান রেখে হতে হবে।

তিনি বলেন, আগে ভারতের কোনও সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে যেভাবে কাজ করে থাকুক, সেই ধরনের অ্যাটিটিউড এখন আর হতে পারবে না।

ডা. জাহেদ বলেন, বাংলাদেশে এখন জনগণের নির্বাচিত সরকার রয়েছে। জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কোনও দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির সুযোগ এই সরকারের নেই।

প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আগের বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ব্রিকসের একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে নয়, রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

তবে নতুন সরকার গঠনের পর ভারতের পক্ষ থেকে পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে জানান তিনি।

ফলে ভবিষ্যতে সফর হতে পারে। তবে ব্রিকসকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিগত সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বা রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা এখনও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও দফতরে দায়িত্বে আছেন এমন অভিযোগের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কাউকে সরকারি দায়িত্ব পালনের অযোগ্য ঘোষণা করা যায় না।

তিনি বলেন, একটি দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তা ও মতাদর্শের মানুষ সরকারি দায়িত্বে থাকতে পারেন, যদি তারা কোনও অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হন।

তবে যারা প্রকাশ্যে বিগত সরকারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন, তাদের বিষয়ে সরকার ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নিচ্ছে।

তিনি বলেন, নীতিগত অবস্থান হচ্ছে খুব তাড়াহুড়ো না করা। যারা খুব ব্র্যান্ডেড ছিলেন এবং প্রকাশ্যে ওই সরকারের সঙ্গে অ্যালাইড ছিলেন, তাদের ব্যাপারে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতেও পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন হচ্ছে বলে জানান তিনি।

গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন দফতরে এখনও বিগত সরকারের প্রভাব রয়েছে এবং তারা দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে— এক সাংবাদিকের এমন অভিযোগের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার বিষয়টি খেয়াল করবে।

নিজের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গত জুলাইয়ের দিনগুলোতে কী ঘটেছে এবং তিনি নিজে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, তা তার জানা আছে। ওই ঝুঁকিটা আমি নিজে বুঝি। খুব ভালোভাবে বুঝি।

জাহেদ উর রহমান বলেন, বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তিনি বলেন, আমরা হাসিনার মতো একটি মাফিয়া রেজিম এ দেশে আর দেখতে চাই না। ভবিষ্যতেও কোনও ফ্যাসিস্ট বা মাফিয়া রেজিম হতে দিতে চাই না।

সেই কারণেই অভিযুক্ত ব্যক্তি যত বড় অপরাধেই অভিযুক্ত হোন না কেন, তার আইনগত ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি।

সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, দুদক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান না হলেও আইনের মাধ্যমে গঠিত একটি স্বাধীন কমিশন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মতো স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা।

তিনি জানান, বর্তমানে নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া চলছে এবং শিগগিরই দুদক পুনর্গঠিত হবে বলে সরকার আশা করছে।

জাহেদ উর রহমান বলেন, নতুন কমিশন গঠনের পর সরকার তার তদন্ত বা কার্যক্রম থামিয়ে দেওয়ার অবস্থানে থাকবে না। সরকার চায় দুদক এমনভাবে তৈরি হোক, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, শুধু বিগত সরকারের দুর্নীতি নয়, বর্তমান সরকারের সময়েও কেউ দুর্নীতি বা অনিয়মে জড়িয়ে পড়লে দুদক তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে— এটাই সরকারের প্রত্যাশা।

তিনি বলেন, এই সরকারের সময়ও কেউ কোনও অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন কিনা, সেই ব্যাপারেও তারা পদক্ষেপ নেবেন আমরা সেটাই আশা করি।

শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এক প্রশ্নে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে শুধু উচ্চ গ্রেড বা ভালো ফল দেওয়ার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত শিক্ষার মান নিশ্চিত করে না।

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উচ্চ জিপিএ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থীর প্রত্যাশিত ফল করতে না পারার উদাহরণ তুলে ধরেন।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, শিক্ষার মান বাড়াতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রমের উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজের যোগ্যতায় ফল অর্জনের মানসিকতা তৈরি হওয়াও জরুরি বলে জানান তিনি।

তার মতে, শুধু পরীক্ষার ফল বাড়ানো নয়, প্রকৃত শিক্ষাগত সক্ষমতা তৈরি করাই হওয়া উচিত শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।