পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি :
পটুয়াখালীর দশমিনায় দেড় বছরের শিশুপুত্রকে এক লাখ টাকায় বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে আইফোন কেনার অভিযোগে মো. মারুফ মুন্সি নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে বিক্রি করে দেওয়া শিশুটিকেও উদ্ধার করা হয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) রাতে উপজেলার বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের বড় গোপালদী গ্রামের নিজবাড়ি থেকে তাকে আটক করা হয়।
তিনি বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের বড় গোপালদী গ্রামের মফিজ মুন্সির ছেলে এবং পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, শনিবার (২৯ আহস্ট) সকালে মারুফ তার মা মাহফুজা বেগমকে দিয়ে ছেলে মুসাকে জামাকাপড় পরিয়ে নেন এবং বাজারে যাওয়ার কথা বলে তাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। দীর্ঘ সময় পার হলেও তারা ফিরে না আসায় স্বজনরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে মারুফ জানান, দশমিনা উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের রোমানাথসেন গ্রামের ইমরান হোসেনের কাছে লিখিতভাবে শিশুটিকে দিয়ে দিয়েছেন এবং বিনিময়ে এক লাখ টাকা নিয়েছেন। পরিবারের অভিযোগ, ওই টাকা নিয়েই মারুফ ঢাকায় গিয়ে পুরোনো আইফোন বদলে নতুন আইফোন কেনেন।
শিশুটির দাদি মাহফুজা বেগম বলেন, প্রায় চার বছর আগে মারুফ সাভারে বৃষ্টি নামের এক তরুণীকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে প্রায় তিন বছর পর মুসার জন্ম হয়। প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক বিরোধের জেরে বৃষ্টি বাবার বাড়িতে চলে যান। এরপর মারুফও ঢাকায় চলে আসে। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সন্ধ্যার আগে তিনি বাড়িতে ফেরেন।
মাহফুজা বেগম আরও বলেন, শনিবার সকালে মারুফ আমাকে মুসাকে জামাকাপড় পরিয়ে দিতে বলে। সে বলেছিল, মুসাকে নিয়ে বাজারে যাবে। পরে অনেক সময় পার হলেও তারা ফিরে আসেনি। খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারি, নাতিকে অন্যের কাছে দিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি আমার নাতিকে ফিরে পেতে চাই।
শিশুটিকে নিজের কাছে রাখা ইমরান হোসেন বলেন, মারুফ আগে থেকেই তার কাছে শিশুটিকে দেয়ার কথা বলে আসছিল। তার শ্বশুরের পাঁচ মেয়ে থাকলেও কোনো ছেলে সন্তান নেই। এ কারণে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করেই শিশুটিকে তার কাছে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে শিশুটিকে দেয়ার ঘটনায় টাকা লেনদেন হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, শিশুটির বাবা তাকে চরকাজল এলাকার যার কাছে রেখে গেছেন, সেখান থেকে উদ্ধারের কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে শিশুটির বাবাকে ঢাকা থেকে আনার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পরপরই শিশুটিকে উদ্ধারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান শুরু করে। পরে অভিযুক্ত বাবা মো. মারুফ মুন্সিকে আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিকে ভুক্তভোগী শিশুকেও উদ্ধার করা হয়েছে।’
ওসি আরও বলেন, এখানে টাকা-পয়সা লেনদেন হয়েছে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। কারণ শিশুটির বাবা-মায়ের মধ্যে ভালো সম্পর্ক নেই। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।
সোশ্যাল মিডিয়ার তথাকথিত ‘স্ট্যাটাস’ প্রদর্শনের ইচ্ছা যে মানুষের বিবেক, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সম্পর্কের কতটা মারাত্মক অবক্ষয় ঘটাতে পারে, বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের বড় গোপালদী গ্রামের এই ঘটনা সে কথায় মনে করিয়ে দেয়।
এ ঘটনা কেবল অপরাধই নয়; বরং এটি বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার এক চরম অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। দামি ব্র্যান্ডের ফোনের প্রতি তরুণ প্রজন্মের এক শ্রেণির যুবকদের এ আসক্তি দিন দিন মনস্তাত্ত্বিক বিকারগ্রস্ততার পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। যেখানে একটা সময় মানুষ নিজের সবকিছু বিসর্জন দিতো সন্তানের সুখের জন্য, সেখানে আজ বিলাসী পণ্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সম্মান বজায় রাখার অন্ধ মোহে নিজের রক্ত কিংবা সন্তান বিক্রি করতেও দ্বিধা করছে না কিছু মানুষ।
পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি 























