বন্দর নগরী চট্টগ্রামে সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য গড়ে ওঠেনি পর্যাপ্ত গণপরিবহন ব্যবস্থা। প্রয়োজনের তুলনায় সড়কে নেই পর্যাপ্ত বাস-মিনিবাস। যেগুলো আছে তার বেশিরভাগই লক্কর-ঝক্কর, ফিটনেস-পারমিটবিহীন। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। পাশাপাশি বাসগুলো দাঁড়ানোর নির্ধারিত স্থান না থাকায় নগরজুড়ে লেগে থাকে যানজট। চট্টগ্রাম নগরে গণপরিবহন সংকটের মধ্যেও তেমন কোনও কাজে আসছে না সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি। চট্টগ্রামে এই সংস্থার ৭২টি বাস থাকলেও বেশিরভাগ বাস চলছে লাভজনক রুটে।
নগরে আবার বেশকিছু গণপরিবহন ব্যস্ত থাকে কল-কারখানায় শ্রমিক আনা-নেওয়াসহ ‘রিজার্ভ’ ভাড়ায়। যে কারণে সকালে অফিসগামী এবং অফিস শেষে ফেরার সময় নগরীর স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর বাস আসলেও বাসে উঠতে, জায়গা পেতে যাত্রীদের চরম বেগ পেতে হয়। অনেকে ঝুঁকি নিয়েই করেন যাতায়াত। গত কিছুদিন ধরে গ্যাস সংকটের কারণে গণপরিবহনের সমস্যা যেন আরও বেড়েছে।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে বাস-মিনিবাস চলাচলের জন্য রুট নির্ধারণ করা আছে ১৭টি। বাস-মিনিবাসের রুট পারমিট আছে ২ হাজার ৯০০টি। তার মধ্যে ফিটনেসবিহীন বাসের সংখ্যা ৮০৩টি। যদিও বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি বলা হচ্ছে। বাস-মিনিবাসের সংখ্যা কম থাকায়, ফিটনেসবিহীন বাস ও বসার সিট না পেয়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। তবে চট্টগ্রামে নগরী ও জেলা মিলে অনুমোদিত সব ধরনের যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ লাখ।
নগরের মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ তালুকদার বলেন, আমরা যারা চাকরিজীবী সকালে অফিসে যেতে হয়, আবার অফিস শেষে বাসায় ফিরতে হয় গণপরিবহনে করে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে সকালে অফিসে যাওয়ার সময় এবং অফিস ছুটির পর এই দুই সময়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর গণপরিবহনে উঠতে পারাটাও এক ধরনের ভাগ্যের ব্যাপার। গণপরিবহন সংকটের কারণে এই সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
নগরের বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, একদিকে গণপরিবহন সংকট আছেই। তার ওপর যোগ হয় বাড়তি ভাড়া। বৃষ্টি হলে কিংবা সড়কে যাত্রীর সংখ্যা বাড়লে নানা অজুহাতে ভাড়া দ্বিগুন করা হয়। আবার অধিকাংশ গণপরিবহন অর্ধেক সড়কে ভাড়া চালায়, পুরোপুরি যায় না। এই কারণেও যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া গুণতে হয়।
নজরুল ইসলাম নামে নগরের জামালখান এলাকার বাসিন্দা অভিযোগ করেন, গণপরিবহন সংকটের সমস্যা নগরে দীর্ঘদিনের। সে সঙ্গে আছে একই রুটের দুই বাসের সঙ্গে যাত্রী নিতে প্রতিযোগিতা। যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠা-নামা। মর্জিমাফিক ভাড়া আদায়। রাত ৮টার পর বাড়তি ভাড়া আদায় করার মতো ঘটনা নগরে নিত্য দিনের দৃশ্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত চলে ৩ নম্বর রুটের মিনিবাস। অথচ কয়েকদিন লক্ষ্য করে দেখা গেছে, কিছু মিনিবাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছেড়ে নিউমার্কেট পর্যন্ত গেলেও অধিকাংশ গাড়ি নির্ধারিত স্থানে যায় না। কিছু গাড়ি মুরাদপুর থেকে অক্সিজেন পর্যন্ত চলাচল করে। আবার কিছু গাড়ি মুরাদপুর থেকে মার্কেট পর্যন্ত। আবার কিছু গাড়ি আছে অক্সিজেন থেকে বড় দিঘীর পাড় পর্যন্ত চলাচল করে। এতে দুর্ভোগে পড়ছেন যাত্রীরা। তার ওপর অতিরিক্ত ভাড়া বাবদ অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
কাউন্টার-ভিত্তিক মেট্রো প্রভাতীর অবস্থাও শোচনীয়
চট্টগ্রামে এক সময় সব কয়টি গণপরিবহন কাউন্টার-ভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। বর্তমানে কাউন্টার-ভিত্তিক চলছে মেট্রো প্রভাতী নামে একটি পরিবহন। নগরের রাস্তার মাথা থেকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত চলাচল করে এসব বাস।
প্রতি পাঁচ মিনিট পর পর একটি করে বাস ছেড়ে আসার কথা থাকলেও অনেক সময় ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর একটি বাসের দেখা মেলে। সকালে এবং বিকালে অফিস ছুটির পর এসব গাড়িতে বসার যাত্রীর চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীর সংখ্যায় বেশি দেখা যায়। স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে এসব বাসে দাঁড়িয়ে চলাচল করছেন যাত্রীরা। এতে যাত্রীদের মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে।
সংকটে কাজে আসছে না বিআরটিসি’র বাস
চট্টগ্রাম নগরে সড়কে যানবাহন সমস্যা দীর্ঘদিনের। এই সমস্যা নিরসনে কোনও কাজেই আসছে না সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি। বিআরটিসি চট্টগ্রাম কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে ৭২টি বিআরটিসি বাস রয়েছে।
এর মধ্যে ১০টি স্কুল বাস হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য চলাচল করে। বাকী গাড়িগুলোর মধ্যে দুইটি নারীদের জন্য নির্ধারিত। এ দুটি বাস সম্প্রতি উদ্বোধন করা হয়।
এদিকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের জন্য চলাচল করে ১৮টি বাস। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬টি, বাংলাদেশ ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে ২টি এবং চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮ থেকে ১০টি বাস চলাচল করে।
বাকী গাড়িগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি রুটে ৪টি, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি রুটে ৪টি, চট্টগ্রাম তবলছড়ি রুটে ১টি, চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে ২টি, চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে ২টি করে বিআরটিসি বাস যাত্রী পরিবহন করে।
এছাড়া নতুন ব্রিজ থেকে চন্দনাইশ গাছবাড়িয়া পর্যন্ত ৪টি, নতুন ব্রিজ থেকে আনোয়ারা চৌমুহনী পর্যন্ত ৫টি। নিউ মার্কেট থেকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত একটি ছাদ খোলা বাস চলাচল করে থাকে বলে বিআরটিসি বাস চলাচল করে থাকে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে কিছু বাস বিভিন্ন সময়ে নষ্ট থাকে।
বিআরটিসি বাসগুলো স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এবং দূরপাল্লার যাত্রী আনা-নেওয়ার ভাড়ায় চলাচল করলেও নগরের অভ্যন্তরে তেমন চলাচল করছে না। দূর পাল্লার রুটে ভাড়া শেষ সময় থাকলে তখন নগরের রুটে চলতে দেখা যায় বিআরটিসি বাস।
এ প্রসঙ্গে বিআরটিসি চট্টগ্রাম বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ম্যানেজার (অপারেশন) কামরুজ্জামান বলে, চট্টগ্রামে বিআরটিসিতে যেসব বাস আছে সেগুলো বিভিন্ন রুটে যাত্রী পরিবহন করছে। স্কুল বাস হিসেবেও ১০টি বাস চলাচল করছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি বেলায়েত হেসেন বেলাল বলেন, চট্টগ্রামে গণপরিবহনের সংকট নেই। তবে সকালে এবং বিকালে চাকরিতে যাওয়ার সময় এবং ছুটির পর সমস্যা হয়। ওই সময়ে যাত্রীদের যানবাহনের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে হয়। সমস্যাটা হচ্ছে যেসব গণপরিবহনের রুট পারমিট আছে তাদের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ গাড়ি সকালে এবং বিকালে শ্রমিক আনা-নেওয়ার কাজ করে। যে কারণে এই সংকট সৃষ্টি হয়। দিনের অন্যান্য সময় গাড়ির কোনও সমস্যা থাকে না।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে নতুন গাড়ি সড়কে নামছে না। কেননা গাড়ির দাম বেশি বেড়ে গেছে। সে অনুযায়ী আয় নেই। সরকারি বিআরটিসি বাসও শ্রমিক আনা-নেওয়ার কাজ করছে। এ কারণে এসব বাস দেখা যাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণসংযোগ) আমিনুর রশিদ জানান, চট্টগ্রামে গণপরিবহনের শৃঙ্খলায় কাজ করছে ট্রাফিক বিভাগ। ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মামলা-জরিমানা করা হচ্ছে। চট্টগ্রামেও এআই ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে।
প্রতিনিধির নাম 























