বগুড়া জেলা প্রতিনিধি :
তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটসহ জনগণের বিভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন করলে স্বৈরাচার ফিরে আসবে—এমন হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বেলা পৌনে ১১টার দিকে বগুড়া সার্কিট হাউসে জেলা ও মহানগরে কর্মরত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ যখন তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটে কষ্ট পাচ্ছে, তখন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংকট সমাধানে টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের নিয়ে একটি টিম গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। সংসদের ভেতরে বারবার বিষয়টি তুলে ধরেও সমাধান না হওয়ায় আমরা রাজপথে নেমেছি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের বিপ্লবের পর জনগণ দেশের আমূল সংস্কার চেয়েছিল। সংস্কারের লক্ষ্যে গণভোটে জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে রায় দিয়েছে। কিন্তু সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করেনি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দেশের যেখানেই অসংগতি দেখা যাবে, সেখানেই তাঁরা কথা বলবেন। বগুড়া দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও বঞ্চিত। বগুড়া যেন তার ন্যায্য পাওনা পায়, সেটিই তাঁরা চান। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ৫৫ বছর অতিক্রম করেছে। একটি জাতির জন্য এ সময় কম নয়। অথচ একই সময়ে মালয়েশিয়া বিশ্বে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সঠিক পরিকল্পনা, সংস্কার ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশও এগিয়ে যেতে পারে।
দেশের অর্থনীতি ও শিল্প খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মালয়েশিয়া ও জাপানের মতো দেশ স্বাধীনতার পর অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক উন্নতি করেছে। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশের অবকাঠামো ও শিল্প খাত প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
তিনি বলেন, দেশের তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে মারাত্মক সংকটের মধ্যে রয়েছে। বিদ্যুৎ ও সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় পোশাক খাতের উৎপাদন ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এতে ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অন্য দেশের দিকে চলে যাচ্ছেন।
এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বিনা মূল্যে কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, দেশকে ভালোবাসার জায়গা থেকেই দেশি-বিদেশি কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি দল গঠন করে সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সরকার সংকট স্বীকার না করে দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দিয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাধ্য হয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তারা আন্দোলন ও লংমার্চ কর্মসূচি পালন করছেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বৈষম্য দূর করা, বেপরোয়া দলীয়করণ বন্ধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সারের সরবরাহ নিশ্চিত করার ছয় দফা দাবিতে এই কর্মসূচি চলছে।
বগুড়ার উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বগুড়া হচ্ছে উত্তরবঙ্গের নাভি ও সাত মাথার ঐতিহাসিক সংযোগস্থল।’ একসময় বগুড়া একটি মিনি শিল্পনগরী ও এডুকেশন ভিলেজ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছরে একটি মেডিক্যাল কলেজ ছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। শিল্পকারখানাগুলোও টিকে থাকেনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ধুনট যাওয়ার পথে সড়কের যে জরাজীর্ণ অবস্থা তিনি দেখেছেন, তাতেই বগুড়ার প্রতি অবহেলার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। আওয়ামী লীগসহ আগের কোনো সরকারই বগুড়াকে তার প্রাপ্য উন্নয়ন দেয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে বগুড়ার অধিকার আদায়ে সোচ্চার থাকার অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সারা বাংলাদেশ দেখবেন। আর বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সারা দেশের মানুষের অধিকারের চৌকিদারি ও পাহারাদারির দায়িত্ব তার। ভোলা, যশোর, সাতক্ষীরা কিংবা তিস্তা পাড়ের মানুষের অধিকার নিয়ে যেমন সংসদে কথা বলেছেন, তেমনি বগুড়ার ন্যায্য পাওনা নিয়েও রাজপথ ও সংসদে জোরালো দাবি জানাবেন।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য অনুষ্ঠিত গণভোটে ৮২ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিল। কিন্তু সরকার ক্ষমতায় এসে সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে।
তিনি বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের রায় অমান্য করার পরিণতি শুভ হয়নি। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে জনগণের রায় বাস্তবায়ন করা উচিত।
সাংবাদিকদের ভূমিকার প্রশংসা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ। সাংবাদিকেরা সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ থাকলে রাষ্ট্রের অন্য বিভাগগুলোও সঠিকভাবে চলতে বাধ্য হয়। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেশকে সঠিক পথে পরিচালনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বগুড়া মহানগর ও জেলা শাখার যৌথ উদ্যোগে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। এতে স্থানীয় সাংবাদিকদের পাশাপাশি জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সকালে ডা. শফিকুর রহমান ধুনট উপজেলায় শহিদ আব্দুল মালেকের কবর জিয়ারত করেন এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সার্কিট হাউসের মতবিনিময় সভা শেষে দুপুরে তিনি বগুড়া জেলা ও মহানগর জামায়াতের রুকন সম্মেলনে যোগ দেন।
বগুড়া জেলা প্রতিনিধি 






















