ইলিশের উৎপাদন ও স্বাদ ধরে রাখতে নদী খননে জোর সরকারের : মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন ও স্বাদ ধরে রাখতে নদী পুনঃখনন, পানির প্রবাহ বাড়ানো, জাটকা নিধন বন্ধ এবং কারেন্ট জালের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধে জোর দিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে জেলেদের শুধু খাদ্য সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিকল্প কর্মসংস্থানের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) উদ্ভাবিত এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (এইচ৯এন২) ও গোট পক্সের ভ্যাকসিন সিড প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং দেশের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একই প্রজাতির ইলিশ পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনার ইলিশের স্বাদে বিশেষত্ব রয়েছে। দেশের নদীগুলোর পলিমাটির বৈশিষ্ট্যের কারণে ইলিশের এই স্বাদ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ইলিশের বিচরণ ও উৎপাদন বাড়াতে নদীগুলোর পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা জরুরি বলে উল্লেখ করে মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত প্রধান নদীগুলোতে প্রয়োজনীয় ড্রেজিং হয়নি। এ কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ অনেক জায়গায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে এসব নদী পুনঃখননের প্রস্তাব দিয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, নদী খননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ বাড়ানো গেলে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র সম্প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনও বাড়তে পারে। ইলিশ স্রোতের বিপরীতে চলাচল করে। তাই নদীতে স্বাভাবিক ও শক্তিশালী পানির প্রবাহ থাকা ইলিশের জীবনচক্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে ইলিশের স্বাদেরও সম্পর্ক রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ইলিশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে জাটকা নিধন বন্ধ এবং প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন মৎস্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইলিশের প্রজননের নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। নিষেধাজ্ঞার সময় ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের খাদ্য সহায়তার আওতায় আনা হচ্ছে। লাখ লাখ জেলেকে এ সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

তবে শুধু খাদ্য সহায়তা দিয়ে জেলেদের জীবনযাত্রাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। যেসব জেলের প্রধান বা একমাত্র আয়ের উৎস মাছ ধরা, নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ জন্য জেলেদের এলাকায় পশুপালন, উন্নত জাতের ঘাস উৎপাদনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে।

মৎস্যমন্ত্রী বলেন, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের আয় পুরোপুরি বন্ধ থাকবে না। একই সঙ্গে তারা মাছ ধরার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবেন।

জাটকা সংরক্ষণে চলতি বছর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আগের তুলনায় জোরদার করা হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, এ বছর জাটকা ধরা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। আগামী মৌসুমগুলোতেও নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রাখার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ইলিশের উৎপাদন ও বিচরণের ক্ষেত্রে নদীদূষণকেও বড় বাধা হিসেবে দেখছেন মৎস্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইলিশ অত্যন্ত সংবেদনশীল মাছ। নির্দিষ্ট সময়ে এটি সমুদ্র থেকে মিঠা পানির সংস্পর্শে আসে। নদীর পানিতে দূষণের মাত্রা বেড়ে গেলে ইলিশ ওই এলাকা থেকে সরে যেতে থাকে। তাই ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনায় নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দিতে হবে।

কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধের বিষয়েও সরকারের পদক্ষেপের কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, কারেন্ট জাল আমদানি অনেক দিন ধরেই বন্ধ রয়েছে। তবে মুন্সীগঞ্জে কয়েকটি কারেন্ট জাল তৈরির কারখানা চালু থাকার খবর পাওয়ার পর সেগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধ করতে প্রশাসনকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ বছর বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে। পরে এসব জাল ধ্বংস ও পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।

মৎস্যমন্ত্রী বলেন, গতবারের তুলনায় এবার ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। তবে উৎপাদন আরও বাড়াতে হলে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র ও প্রজননক্ষেত্রের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। এ জন্য নদী ও খাল পুনঃখননের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে নদী ও খাল খননের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। আগামী বছরগুলোতে এ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃষিকে শক্তিশালী করতে এ সরকার বদ্ধপরিকর বলে জানিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ বলেন, সরকার মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, কৃষির উন্নতি হলে দেশের উন্নতি হবে; কৃষক নায্য দাম পেলে অর্থনীতির উন্নতি হবে।

ভ্যাক্সিন দুটি উদ্ভাবনে সংশিষ্টদের অভিনন্দন জানিয়ে মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, আজ শুধু ভ্যাক্সিন সিড হস্তান্তর নয়, গবেষণাগারে উদ্ভাবিত জ্ঞান মাঠের খামারিদের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন। এ ভ্যাক্সিন দুটি আমদানি করা হতো। এখন আমাদের ল্যাবেই উৎপাদন হবে।

তিনি বলেন, শুধু খাদ্য নয়, নিরাপদ খাদ্যেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চাই। নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপারে সরকার সচেতন। দেশের সয়েলে (মাটি) সমস্যা আছে। আগামী ৪ মাসের সব সয়েল টেস্ট রিপোর্ট এসে যাবে। এরপর সয়েল ডেভেলপে কাজ করা হবে।

ফসলী জমিতে বিষপ্রয়োগের নীতিমালা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, পেস্টিসাইড (বিষ) ব্যবহার ও আমদানি নিয়ে কোনো নীতিমালা ছিল না। এ সমস্যা সমাধানে হাই প্রোফাইল টিম করা হয়েছে। আশা করি, এক মাসের মধ্যে টিমটি একটি প্রস্তাবনা দেবে। এরপরে সেগুলো যাচাই-বাছাই, মিটিংয়ে অনুমোদনের পর সরকার পর্যায়ে অনুমোদনের প্রস্তুতি নেয়া হবে।

কৃষির উন্নয়নের প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। কৃষির উন্নতি হলে দেশের অর্থনীতিরও উন্নতি হবে। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পেলে কৃষকের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়বে।

তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের দীর্ঘদিনের ঋণসংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সরকার কাজ করছে। সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। তবে এতে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে ওই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

প্রাণিসম্পদমন্ত্রী জানান, দেশের খালগুলো পুনঃখননের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন খাল খনন না হওয়ায় পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। ফলে বিভিন্ন সময়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হতো। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় চলতি বছরের দায়িত্বের প্রায় ৯০ শতাংশ খাল খননের কাজ শেষ হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কৃষকদের উৎপাদন পরিকল্পনা ও ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে কৃষি কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, কৃষকরা কোন সময়ে কোন পণ্য উৎপাদন করবেন, সারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়ার বিষয়ে কৃষি কার্ডের মাধ্যমে তথ্য ও সহায়তা দেওয়া হবে। এরই মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ কৃষকের নিবন্ধন হয়েছে। তিন বছরের মধ্যে কৃষি কার্ডের নিবন্ধন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।

অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহ জামান খান, বিএলআরআইয়ের মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক, গবেষক ড. আব্দুস সামাদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

ইলিশের উৎপাদন ও স্বাদ ধরে রাখতে নদী খননে জোর সরকারের : মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী

ইলিশের উৎপাদন ও স্বাদ ধরে রাখতে নদী খননে জোর সরকারের : মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ০৩:৪৩:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন ও স্বাদ ধরে রাখতে নদী পুনঃখনন, পানির প্রবাহ বাড়ানো, জাটকা নিধন বন্ধ এবং কারেন্ট জালের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধে জোর দিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে জেলেদের শুধু খাদ্য সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিকল্প কর্মসংস্থানের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) উদ্ভাবিত এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (এইচ৯এন২) ও গোট পক্সের ভ্যাকসিন সিড প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং দেশের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একই প্রজাতির ইলিশ পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনার ইলিশের স্বাদে বিশেষত্ব রয়েছে। দেশের নদীগুলোর পলিমাটির বৈশিষ্ট্যের কারণে ইলিশের এই স্বাদ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ইলিশের বিচরণ ও উৎপাদন বাড়াতে নদীগুলোর পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা জরুরি বলে উল্লেখ করে মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত প্রধান নদীগুলোতে প্রয়োজনীয় ড্রেজিং হয়নি। এ কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ অনেক জায়গায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে এসব নদী পুনঃখননের প্রস্তাব দিয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, নদী খননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ বাড়ানো গেলে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র সম্প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনও বাড়তে পারে। ইলিশ স্রোতের বিপরীতে চলাচল করে। তাই নদীতে স্বাভাবিক ও শক্তিশালী পানির প্রবাহ থাকা ইলিশের জীবনচক্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে ইলিশের স্বাদেরও সম্পর্ক রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ইলিশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে জাটকা নিধন বন্ধ এবং প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন মৎস্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইলিশের প্রজননের নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। নিষেধাজ্ঞার সময় ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের খাদ্য সহায়তার আওতায় আনা হচ্ছে। লাখ লাখ জেলেকে এ সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

তবে শুধু খাদ্য সহায়তা দিয়ে জেলেদের জীবনযাত্রাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। যেসব জেলের প্রধান বা একমাত্র আয়ের উৎস মাছ ধরা, নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ জন্য জেলেদের এলাকায় পশুপালন, উন্নত জাতের ঘাস উৎপাদনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে।

মৎস্যমন্ত্রী বলেন, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের আয় পুরোপুরি বন্ধ থাকবে না। একই সঙ্গে তারা মাছ ধরার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবেন।

জাটকা সংরক্ষণে চলতি বছর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আগের তুলনায় জোরদার করা হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, এ বছর জাটকা ধরা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। আগামী মৌসুমগুলোতেও নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রাখার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ইলিশের উৎপাদন ও বিচরণের ক্ষেত্রে নদীদূষণকেও বড় বাধা হিসেবে দেখছেন মৎস্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইলিশ অত্যন্ত সংবেদনশীল মাছ। নির্দিষ্ট সময়ে এটি সমুদ্র থেকে মিঠা পানির সংস্পর্শে আসে। নদীর পানিতে দূষণের মাত্রা বেড়ে গেলে ইলিশ ওই এলাকা থেকে সরে যেতে থাকে। তাই ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনায় নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দিতে হবে।

কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধের বিষয়েও সরকারের পদক্ষেপের কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, কারেন্ট জাল আমদানি অনেক দিন ধরেই বন্ধ রয়েছে। তবে মুন্সীগঞ্জে কয়েকটি কারেন্ট জাল তৈরির কারখানা চালু থাকার খবর পাওয়ার পর সেগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধ করতে প্রশাসনকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ বছর বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে। পরে এসব জাল ধ্বংস ও পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।

মৎস্যমন্ত্রী বলেন, গতবারের তুলনায় এবার ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। তবে উৎপাদন আরও বাড়াতে হলে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র ও প্রজননক্ষেত্রের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। এ জন্য নদী ও খাল পুনঃখননের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে নদী ও খাল খননের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। আগামী বছরগুলোতে এ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃষিকে শক্তিশালী করতে এ সরকার বদ্ধপরিকর বলে জানিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ বলেন, সরকার মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, কৃষির উন্নতি হলে দেশের উন্নতি হবে; কৃষক নায্য দাম পেলে অর্থনীতির উন্নতি হবে।

ভ্যাক্সিন দুটি উদ্ভাবনে সংশিষ্টদের অভিনন্দন জানিয়ে মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, আজ শুধু ভ্যাক্সিন সিড হস্তান্তর নয়, গবেষণাগারে উদ্ভাবিত জ্ঞান মাঠের খামারিদের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন। এ ভ্যাক্সিন দুটি আমদানি করা হতো। এখন আমাদের ল্যাবেই উৎপাদন হবে।

তিনি বলেন, শুধু খাদ্য নয়, নিরাপদ খাদ্যেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চাই। নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপারে সরকার সচেতন। দেশের সয়েলে (মাটি) সমস্যা আছে। আগামী ৪ মাসের সব সয়েল টেস্ট রিপোর্ট এসে যাবে। এরপর সয়েল ডেভেলপে কাজ করা হবে।

ফসলী জমিতে বিষপ্রয়োগের নীতিমালা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, পেস্টিসাইড (বিষ) ব্যবহার ও আমদানি নিয়ে কোনো নীতিমালা ছিল না। এ সমস্যা সমাধানে হাই প্রোফাইল টিম করা হয়েছে। আশা করি, এক মাসের মধ্যে টিমটি একটি প্রস্তাবনা দেবে। এরপরে সেগুলো যাচাই-বাছাই, মিটিংয়ে অনুমোদনের পর সরকার পর্যায়ে অনুমোদনের প্রস্তুতি নেয়া হবে।

কৃষির উন্নয়নের প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। কৃষির উন্নতি হলে দেশের অর্থনীতিরও উন্নতি হবে। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পেলে কৃষকের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়বে।

তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের দীর্ঘদিনের ঋণসংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সরকার কাজ করছে। সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। তবে এতে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে ওই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

প্রাণিসম্পদমন্ত্রী জানান, দেশের খালগুলো পুনঃখননের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন খাল খনন না হওয়ায় পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। ফলে বিভিন্ন সময়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হতো। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় চলতি বছরের দায়িত্বের প্রায় ৯০ শতাংশ খাল খননের কাজ শেষ হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কৃষকদের উৎপাদন পরিকল্পনা ও ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে কৃষি কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, কৃষকরা কোন সময়ে কোন পণ্য উৎপাদন করবেন, সারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়ার বিষয়ে কৃষি কার্ডের মাধ্যমে তথ্য ও সহায়তা দেওয়া হবে। এরই মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ কৃষকের নিবন্ধন হয়েছে। তিন বছরের মধ্যে কৃষি কার্ডের নিবন্ধন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।

অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহ জামান খান, বিএলআরআইয়ের মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক, গবেষক ড. আব্দুস সামাদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।