সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন কেবল সরকারের একক উদ্যোগে সম্ভব নয়; এর জন্য শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি এবং বিদ্যালয়কে একটি কার্যকর সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে প্রতিটি বিদ্যালয়ে ‘প্যারেন্ট সার্কেল’ এবং ‘বন্ধু রেজিস্টার’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সোমবার (২৭ জুলাই) সুনামগঞ্জ পিটিআইয়ে স্কুল ফিডিং প্রকল্প আয়োজিত ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচি’ শীর্ষক প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পর্কে ওরিয়েন্টেশন ও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি শ্রেণির শিক্ষককে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের নিয়ে একটি প্যারেন্ট সার্কেল গঠন করতে হবে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি, উপস্থিতি, শৃঙ্খলা এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করা হবে। এতে বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি হবে এবং শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশ আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তা, মসজিদ ও বাজার কমিটির প্রতিনিধি, সমাজের দানশীল ব্যক্তি এবং অন্যান্য বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে একটি ‘বন্ধু রেজিস্টার’ তৈরি করতে হবে। এই বন্ধু নেটওয়ার্ক বিদ্যালয়ের উন্নয়ন, নিরাপত্তা, অবকাঠামো, শিক্ষার পরিবেশ এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে বিদ্যালয়কে সহায়তা করবে।
ববি হাজ্জাজ বলেন, যে বিদ্যালয় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারবে, সেই বিদ্যালয়ই সবচেয়ে সফল হবে। কমিউনিটি যদি বিদ্যালয়ের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে কেউ বিদ্যালয়ের সম্পদ দখল করতে পারবে না, নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহ করতে পারবে না এবং বিদ্যালয় সম্পর্কে অপপ্রচার চালানোও কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য একটি আধুনিক, মানবিক ও মূল্যবোধভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে। সরকারের এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসন, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণকে একটি অভিন্ন দলের সদস্য হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ববি হাজ্জাজ বলেন, সরকার প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে শিক্ষক সংকট নিরসন, পিটিআই অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয় ফিডিং কর্মসূচির মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং নতুন শিক্ষক নীতিমালা প্রণয়নসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নে শিক্ষক ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
প্রাথমিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করা। বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে কোনো শিক্ষার্থী যেন পিছিয়ে না থাকে, সে বিষয়ে শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ধর্মীয়, পারিবারিক ও নাগরিক মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করা। বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে কোনো শিক্ষার্থী যেন পিছিয়ে না থাকে, সে বিষয়ে শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ববি হাজ্জাজ বলেন, সিলেট বিভাগে শিক্ষক সংকট তুলনামূলক বেশি। এ সংকট দূর করতে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি পিটিআইগুলোকে আধুনিক ও কার্যকর প্রশিক্ষণকেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো শিক্ষক যাতে প্রশিক্ষণ ছাড়া শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করেন, সে লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, পদমর্যাদা ও পেশাগত উন্নয়নে সরকার কাজ করছে। খুব শিগগিরই নতুন শিক্ষক নীতিমালা ও প্রধান শিক্ষক নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়িত্ব ও জবাবদিহিতাও আরও বৃদ্ধি পাবে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি প্রসঙ্গে ববি হাজ্জাজ বলেন, বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান, শৃঙ্খলা ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করে অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন, খেলাধুলার মাঠ নির্মাণ এবং হাওরাঞ্চলের মতো বিশেষ এলাকার উপযোগী শিক্ষা অবকাঠামো গড়ে তুলতে মাঠপর্যায়ের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ফিডিং কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। খাদ্যের মান যাচাই, আকস্মিক কারখানা পরিদর্শন, মাদার্স কমিটির মাধ্যমে খাদ্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনে পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি বিদ্যালয়ের উন্নয়নে কমিউনিটি সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি শ্রেণিতে অভিভাবকদের নিয়ে ‘প্যারেন্ট সার্কেল’ এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ে ‘স্কুল বন্ধু রেজিস্টার’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে বিদ্যালয় পরিচালনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং শিক্ষা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গুণগত মান আরও শক্তিশালী হবে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নূরুল, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ফিডিং কর্মসূচি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. আবুল আলিম এবং পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন। এ সময় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা এবং জেলার ছাতক ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি 






















