নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশব্যাপী মানসম্মত ও জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। এ নিয়োগে নারী ক্ষমতায়ন ও সেবার মান বাড়াতে ৮০ শতাংশ পদে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনকালে এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে অবিলম্বে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমাকে অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে যে, বিগত সরকারগুলোর টিকা সংগ্রহ ও টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়নে অবহেলা ও যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং শিশু মৃত্যুর মতো হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই প্রায় শতভাগ শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা প্রদান করছে।
তিনি বলেন, ইন্টিগ্রেটেড মডিউলার পদ্ধতি, আধুনিক ক্লিনিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা এবং এআই ভিত্তিক চিকিৎসা জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক, দক্ষতা-ভিত্তিক ও ভবিষ্যতমুখী নতুন এমবিবিএস কারিকুলাম চালু করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ এবং নার্সিং বিষয়ে ব্যাচেলর ও মাস্টার্সের সুযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। দেশব্যাপী মানসম্মত ও জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে ১ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশ হবে নারী।
এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের বিশাল এই ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক-দুই উৎস থেকেই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।

‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পেশ করা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের মোট আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার ফলে সামগ্রিক বাজেটে নিট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের এই বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা (যার মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা) এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত এ বরাদ্দ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১.০১ শতাংশ, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বরাদ্দ জিডিপির ১.০১ শতাংশের সমান।
তিনি আরও বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ০.৫৮ শতাংশ। সেই হিসাবে নতুন অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ৩৩ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাজেট বক্তৃতায় সরকার স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণের কথাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারের অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে সর্বজনীন ও ন্যায়সংগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, চিকিৎসা-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে প্রতিরোধ-কেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তর, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য জোরদার এবং স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও চিকিৎসা শিল্পের বিকাশ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। পাশাপাশি সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় নাগরিকদের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি, জেলা হাসপাতালে বিশেষায়িত চিকিৎসা সম্প্রসারণ, জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গঠন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই ৫৫তম বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এটিই প্রথম বাজেট। নিয়ম অনুযায়ী, সংসদে উপস্থাপনের আগে বাজেটটি বিশেষ মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয় এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এতে সম্মতি জানান।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















