নিজস্ব প্রতিবেদক :
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য পূরণে কাজ করছে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার বলে জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ট্রিলিয়ন ডলারের বাস্তবায়নে যেসব বিনিয়োগ দরকার সেটা দেশে আনতে কাজ করছি। ফ্যাসিবাদী আমলে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক কূটনীতিতে জোর দিচ্ছে সরকার।
রোববার (২৬ জুলাই) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্য, প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির রোডম্যাপ নিয়ে এক সংলাপ শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, বৈদেশিক বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা দূর করার ক্ষেত্রে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রচলিত বিনিয়োগ খাতের পাশাপাশি স্পোর্টস ডিপ্লোমেসি, ক্রিয়েটিভ ইকোনমি এবং কালচারের মতো নতুন সম্ভাবনাময় খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আনার জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
শামা ওবায়েদ বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। এখন সরকার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বিদেশি বিনিয়োগ জোরদারের চেষ্টা করছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরে দেশের ব্যাংকিং সেক্টর ও ক্যাপিটাল মার্কেট (পুঁজিবাজার) ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। ১৭ বছরের ধ্বংসাবস্থা থেকে অর্থনীতিকে তুলে এনে একটি গতিশীল অবস্থায় রূপান্তরের জন্য যে ধরনের নীতি গ্রহণ করা দরকার, সরকার এখন সেগুলাই গ্রহণ করছে।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে দেশি-বিদেশি ইনভেস্টরদের সমস্যা সমাধানের কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদেশে অবস্থানরত অনেক বাংলাদেশি প্রবাসী দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তবে তাদের বেশ কিছু প্রক্রিয়াগত জটিলতার মুখে পড়তে হয়। সরকার এসব সমস্যা নিরসনে কাজ করছে, যাতে সহজে ও দ্রুততম সময়ে দেশে বিনিয়োগ করা যায়।
তিনি জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করতে একসঙ্গে কাজ করছে।
বিনিয়োগের সম্ভাব্য ও অগ্রাধিকারমূলক খাতের কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রে অফশোর জ্বালানি অনুসন্ধান, অফশোর গাস ও ব্লু-ইকোনমি সংশ্লিষ্ট খাতে দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগ আনার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। দেশের সম্ভাবনাময় খাতের মধ্যে টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, কৃষি ও জ্বালানি খাত রয়েছে। ক্রিয়েটিভ ইকোনমি, প্রান্তিক শিল্প, কৃষ্টি-কালচার এবং ক্রীড়া (স্পোর্টস) ক্ষেত্র রয়েছে।
শামা ওবায়েদ বলেন , চীন, জাপান, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত আছে। এ নিয়ে কথাবার্তাও চলছে।
শামা ওবায়েদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেহেতু অর্থনৈতিক কূটনীতিতে অত্যন্ত জোর দিচ্ছে, সেই ধারাবাহিকতাতেই আজকের এই রুদ্ধদ্বার সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা বিভিন্ন সমস্যা এবং পরামর্শ তুলে ধরেছেন, যা নিয়ে ভবিষ্যতে আমরা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলে সমাধানের দিকে এগিয়ে যাব।
প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা বিভিন্ন পলিসি নিয়ে কাজ করছেন। পুঁজিবাজার, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ, কৃষকদের কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড-এসব কিছু নিয়েই তিনি কাজ করছেন। তাই যারা আজকে এসেছিলেন, তাদের এসব বিষয়ে উপদেষ্টার কাছে অনেক প্রশ্ন ছিল এবং তিনি সেগুলোর উত্তর দিয়েছেন।
বিনিয়োগ নিয়ে সমস্যাগুলো কী কী জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সমস্যা তো বিভিন্ন ধরনের আছেই। বিনিয়োগকারীদের সমস্যা আছে, আবার ধরুন যেসব বাংলাদেশি বিদেশে থাকেন এবং দেশে বিনিয়োগ করতে চান, তাদেরও এক ধরনের সমস্যা আছে। আপনাদের বুঝতে হবে যে, বিএনপি উত্তরাধিকার সূত্রে একটি পঙ্গু অর্থনীতি পেয়েছে। গত ১৭ বছরে যেভাবে ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হয়েছে, পুঁজিবাজার ধ্বংস করা হয়েছে। পুরো সিস্টেমকে ধ্বংস করা হয়েছে, সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থা থেকে অর্থনীতিকে আবার তুলে এনে একটি গতিশীল অর্থনীতিতে রূপান্তর করার জন্য যেসব নীতি বা পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সরকার এখন সেগুলোই নিচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের যে বাজেট দেওয়া হয়েছে, তা এই উদ্যোগের প্রথম ধাপগুলোর একটি। আমাদের সৃজনশীল অর্থনীতি, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল, তৈরি করা হয়েছে। বিদেশিরা সেখানে সহজে বিনিয়োগ করার জন্য কী কী ধরনের সুবিধা, প্রয়োজন এবং আমাদের প্রক্রিয়ায় কী কী পরিবর্তন আনতে হবে—মূলত এসব ব্যাপার নিয়েই আলোচনা হয়েছে।
অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট এখানে মূল বিষয় নয়, কারণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি এই কাজটি করবে না। এটি মূলত বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজ। যখন আপনি শিক্ষা সংস্কারের কথা বলবেন, তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় আসবে; তেমনি অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়— এগুলো তখন গুরুত্ব পাবে। সেই অনুযায়ী বরাদ্দ রেখেই বাজেটটি দেওয়া হয়েছে।
সরকার বিনিয়োগের অগ্রাধিকার খাতগুলো চিহ্নিত করেছে কি না জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অবশ্যই। বিনিয়োগের কথা যখন আমরা বলি, তখন জ্বালানি একটি বিশেষ খাত। এছাড়া আমাদের বিনিয়োগের জায়গাগুলো হলো—টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি খাত এবং কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন খাত। বিশেষ করে আমরা যখন সৃজনশীল অর্থনীতির কথা বলছি, তখন সেখানে আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, কুটির শিল্প এবং আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক বিনিয়োগের একটি বিশাল সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করছি। খেলাধুলা এমন একটি খাত, যেখানে প্রচুর বিনিয়োগ সম্ভব। খেলাধুলায় বিনিয়োগ আনার জন্যই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বর্তমানে ক্রীড়া কূটনীতিকে কাজে লাগাচ্ছে। আমাদের সংস্কৃতিতেও যেন আমরা বিনিয়োগ আনতে পারি, সেই জায়গাটিতেই আমাদের মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
শামা ওবায়েদ আরও বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজ হলো প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা— বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে বাংলাদেশের আপামর জনতা, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এবং আমাদের নারী সমাজ প্রত্যেকেই এই অগ্রগতি বা উন্নয়নের অংশ হতে পারে। সেটি নিশ্চিত করতে হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বর্তমানে বহুমুখীকরণের যে কাজ করছে, নতুন বাজার এবং নতুন উৎস খোঁজার যে কাজ করছে, সেগুলো আমরা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে আরও ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করছি।
এক প্রশ্নের উত্তরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ব্লু ইকোনমি (সুনীল অর্থনীতি) নিয়ে কথা হয়েছে, কারণ এটি আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। আমরা চাই আমাদের দেশে ব্লু ইকোনমিতে বিনিয়োগ হোক। ইউরোপের বিভিন্ন দেশও এখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী এবং বাংলাদেশে এর অনেক সুযোগও রয়েছে। এগুলো নিয়েও আমাদের কথাবার্তা চলছে। আমরা মূলত এই ধরনের গোলটেবিল বৈঠকগুলো আরও বেশি করে আয়োজন করব, যাতে আমাদের সমস্যাগুলো আলোচনার টেবিলে উঠে আসে এবং আমরা কীভাবে সেগুলো সমাধান করতে পারি, সেদিকে এগিয়ে যেতে পারি। মূলত এই লক্ষ্যেই গোলটেবিল বৈঠকগুলো করা হচ্ছে।
অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগের প্রক্রিয়া ও কথাবার্তা চলছে। বিনিয়োগ তো আর দিন-ক্ষণ বা চাঁদ দেখে হবে না! বিনিয়োগের প্রক্রিয়াটি চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যেই অনেক দেশ আমাদের সাথে কথা বলছে যে, তারা বিভিন্ন খাতে কীভাবে বিনিয়োগ করতে পারে। এই প্রক্রিয়াটি চলমান। অনেক বিনিয়োগকারী ইতেমধ্যে বিডার সাথে যোগাযোগ করছে, তাদের সাথে কাজ করছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে কাজ করছে। চীন, জাপান, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত আছে এবং এ নিয়ে কথাবার্তাও চলছে।
শামা ওবায়েদ আরও বলেন, অর্থমন্ত্রী যখন বাজেট দিয়েছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন যে আমরা এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে চাই, এটাই আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে বা ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে হলে আমাদের যে ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন, আমরা সেই ধরনের বিনিয়োগ আনারই চেষ্টা করছি। সেই কাজ চলমান রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















