Dhaka শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২৫ বছরের জমানো টাকায় কাঠের সেতু নির্মাণ করে প্রশংসায় ভাসছেন আব্দুল করিম

উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি : 

২৫ বছরের জমানো সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কাঠের সেতু নির্মাণ করে প্রশংসায় ভাসছেন আব্দুল করিম নামের এক ব্যক্তি। কখনো ভ্যান চালিয়ে, দারোয়ানের চাকরি ও কুলির কাজ করে যা আয় হতো; তার কিছু অংশ জমিয়ে এই কাজ করেন তিনি। সেতু নির্মাণে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেয়েছে স্থানীয় লোকজন।

কুড়িগ্রামের উলিপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জোনাইডাঙ্গা এলাকায় কাঠের সেতুটি শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। সেতুটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘আব্দুল করিম সেতু’।

সরেজমিনে জানা গেছে, আব্দুল করিম কুড়িগ্রামের উলিপুর পৌরসভার জোনাইডাঙ্গা এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তার এলাকা উলিপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন দক্ষিণাংশে দীর্ঘদিন ধরে একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও চলাচলের অনুপযোগী রেলসেতু দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতেন শিক্ষার্থী,রোগীসহ সাধারণ মানুষ। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে তারা পারাপার হতেন। তবে, দীর্ঘ সময় ধরে সমস্যাটি বিদ্যমান থাকলেও সরকারি কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করেন।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, উলিপুর রেলস্টেশনের পাশের একটি ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতু দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল করতে হতো। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খাওনার দরগাহ, জোনাইডাঙ্গা, সরদারপাড়া, তবকপুর, ভদ্রপাড়া, মন্ডলপাড়া, বলদিপাড়া, কাঠাখালী, রেলস্টেশন, মুন্সিপাড়াসহ ১০-১৫ গ্রামের ২৫-৩০ হাজার সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও পথচারীরা যাতায়াত করতেন। সেতুটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, রোগী ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য এটি ছিল বড় দুর্ভোগের কারণ। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের কষ্ট দেখে মানবতার হাত বাড়িয়ে দেন আব্দুল করিম (৪৫)। তিনি জোনাইডাঙ্গা এলাকার ফয়জার আলীর ছেলে। আব্দুল করিম সঞ্চয়ের জমানো টাকাসহ প্রায় ৪ লাখ টাকা দিয়ে কাঠের সেতু বানিয়েছেন। আব্দুল করিমের এই কাজে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন উপজেলাজুড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা সাজিরণ বেওয়া বলেন, এল্যা হ্যামার খুব সুবিধা হইছে,আগোত তিন মাইল ঘুরি যাওয়া নাগতো নাহইলে ভয়ে ভয়ে রেলের লোহার ব্রীজ পাড় হওয়া নাগতো।

একই গ্রামের নসর উদ্দিন বলেন, আব্দুল করিম হামার ভাইস্তা লেবারি করে, কাঁচা মালের বস্তাগুলো উবায় ওই মটর সাইক্যালত করি। এল্যা মানুষের উপকারের জন্যে মটর সাইকেল ব্যাচে ব্রীজ করি দিলে।

স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী নাজমুল বলেন, আমরা ভাবতেও পারিনি একজন কুলি এই কাজটা করবে। উনি আমাদের অনেক বড় কাজ করেছেন।

এলাকাবাসী জানান, এই পথে চলাচল ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। ঝুঁকি নিয়ে রেলসেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করতে হতো। আব্দুল করিম নতুন কাঠের সেতু নির্মাণ করে দেওয়ায় বর্তমানে এলাকাবাসীর যাতায়াত অনেক সহজ ও নিরাপদ হয়েছে। অনেক মানুষ উপকৃত হচ্ছে। একজন সামান্য দিনমজুর হয়ে তাঁর এই কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়।

এ বিষয়ে আব্দুল করিম বলেন, প্রায় দিন এসে দেখতাম মানুষ কষ্ট করে রেলের সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করছে, অনেক সময় পড়েও যাচ্ছে। জনপ্রতিনিধিরা এলেও কেউ উদ্যোগ নেননি। মানুষের কষ্ট দেখে আমি ২৫ বছর ধরে কখন ভ্যান চালিয়ে, দারোয়ানের চাকরি করে এবং কুলির কাজ করে যা আয় হতো, তার কিছু অংশ জমিয়ে রাখতাম। সেই জমানো দেড় লাখ টাকা দিয়ে প্রথম কাজ শুরু করি। টাকা কম হওয়ায় নিজের শখের বাইক, ছাগলসহ অন্যান্য জিনিস বিক্রি করে এবং ঋণ করে প্রায় ৪ লাখ টাকা দিয়ে এই সেতু বানিয়েছি।

উলিপুর পৌরসভার সাবেক কমিশনার জিহাদ আলী বলেন, কুলি আব্দুল করিম ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাঠের সেতু নির্মাণ করেছেন দেখেছি। নিঃসন্দেহে এটি ভালো উদ্যোগ। আমাদের এটি নির্মাণ করার পরিকল্পনা ছিল। সরকার বিগত পৌর সভার মেয়র-কমিশনারদের পদ আকস্মিক বাতিল করার কারণে পরে সম্ভব হয়নি। আব্দুল করিম নিজস্ব অর্থায়নে কাঠের সেতু তৈরি করায় তাঁকে সাধুবাদ জানাই।

উলিপুরের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারি কমিশনার (ভূমি) এস এম মেহেদি হাসান বলেন, সে যে তার নিজের জমানো টাকা ও মটর সাইকেল বিক্রি করে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে মানুষের চলাফেরার একটা ব্যবস্থা দিয়েছে নিঃসন্দেহে এটি প্রসংশনীয়।

আবহাওয়া

চিত্রনায়িকা পূজা চেরির বাবা কারাগারে

২৫ বছরের জমানো টাকায় কাঠের সেতু নির্মাণ করে প্রশংসায় ভাসছেন আব্দুল করিম

প্রকাশের সময় : ০৯:২১:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি : 

২৫ বছরের জমানো সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কাঠের সেতু নির্মাণ করে প্রশংসায় ভাসছেন আব্দুল করিম নামের এক ব্যক্তি। কখনো ভ্যান চালিয়ে, দারোয়ানের চাকরি ও কুলির কাজ করে যা আয় হতো; তার কিছু অংশ জমিয়ে এই কাজ করেন তিনি। সেতু নির্মাণে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেয়েছে স্থানীয় লোকজন।

কুড়িগ্রামের উলিপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জোনাইডাঙ্গা এলাকায় কাঠের সেতুটি শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। সেতুটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘আব্দুল করিম সেতু’।

সরেজমিনে জানা গেছে, আব্দুল করিম কুড়িগ্রামের উলিপুর পৌরসভার জোনাইডাঙ্গা এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তার এলাকা উলিপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন দক্ষিণাংশে দীর্ঘদিন ধরে একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও চলাচলের অনুপযোগী রেলসেতু দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতেন শিক্ষার্থী,রোগীসহ সাধারণ মানুষ। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে তারা পারাপার হতেন। তবে, দীর্ঘ সময় ধরে সমস্যাটি বিদ্যমান থাকলেও সরকারি কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করেন।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, উলিপুর রেলস্টেশনের পাশের একটি ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতু দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল করতে হতো। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খাওনার দরগাহ, জোনাইডাঙ্গা, সরদারপাড়া, তবকপুর, ভদ্রপাড়া, মন্ডলপাড়া, বলদিপাড়া, কাঠাখালী, রেলস্টেশন, মুন্সিপাড়াসহ ১০-১৫ গ্রামের ২৫-৩০ হাজার সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও পথচারীরা যাতায়াত করতেন। সেতুটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, রোগী ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য এটি ছিল বড় দুর্ভোগের কারণ। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের কষ্ট দেখে মানবতার হাত বাড়িয়ে দেন আব্দুল করিম (৪৫)। তিনি জোনাইডাঙ্গা এলাকার ফয়জার আলীর ছেলে। আব্দুল করিম সঞ্চয়ের জমানো টাকাসহ প্রায় ৪ লাখ টাকা দিয়ে কাঠের সেতু বানিয়েছেন। আব্দুল করিমের এই কাজে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন উপজেলাজুড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা সাজিরণ বেওয়া বলেন, এল্যা হ্যামার খুব সুবিধা হইছে,আগোত তিন মাইল ঘুরি যাওয়া নাগতো নাহইলে ভয়ে ভয়ে রেলের লোহার ব্রীজ পাড় হওয়া নাগতো।

একই গ্রামের নসর উদ্দিন বলেন, আব্দুল করিম হামার ভাইস্তা লেবারি করে, কাঁচা মালের বস্তাগুলো উবায় ওই মটর সাইক্যালত করি। এল্যা মানুষের উপকারের জন্যে মটর সাইকেল ব্যাচে ব্রীজ করি দিলে।

স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী নাজমুল বলেন, আমরা ভাবতেও পারিনি একজন কুলি এই কাজটা করবে। উনি আমাদের অনেক বড় কাজ করেছেন।

এলাকাবাসী জানান, এই পথে চলাচল ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। ঝুঁকি নিয়ে রেলসেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করতে হতো। আব্দুল করিম নতুন কাঠের সেতু নির্মাণ করে দেওয়ায় বর্তমানে এলাকাবাসীর যাতায়াত অনেক সহজ ও নিরাপদ হয়েছে। অনেক মানুষ উপকৃত হচ্ছে। একজন সামান্য দিনমজুর হয়ে তাঁর এই কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়।

এ বিষয়ে আব্দুল করিম বলেন, প্রায় দিন এসে দেখতাম মানুষ কষ্ট করে রেলের সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করছে, অনেক সময় পড়েও যাচ্ছে। জনপ্রতিনিধিরা এলেও কেউ উদ্যোগ নেননি। মানুষের কষ্ট দেখে আমি ২৫ বছর ধরে কখন ভ্যান চালিয়ে, দারোয়ানের চাকরি করে এবং কুলির কাজ করে যা আয় হতো, তার কিছু অংশ জমিয়ে রাখতাম। সেই জমানো দেড় লাখ টাকা দিয়ে প্রথম কাজ শুরু করি। টাকা কম হওয়ায় নিজের শখের বাইক, ছাগলসহ অন্যান্য জিনিস বিক্রি করে এবং ঋণ করে প্রায় ৪ লাখ টাকা দিয়ে এই সেতু বানিয়েছি।

উলিপুর পৌরসভার সাবেক কমিশনার জিহাদ আলী বলেন, কুলি আব্দুল করিম ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাঠের সেতু নির্মাণ করেছেন দেখেছি। নিঃসন্দেহে এটি ভালো উদ্যোগ। আমাদের এটি নির্মাণ করার পরিকল্পনা ছিল। সরকার বিগত পৌর সভার মেয়র-কমিশনারদের পদ আকস্মিক বাতিল করার কারণে পরে সম্ভব হয়নি। আব্দুল করিম নিজস্ব অর্থায়নে কাঠের সেতু তৈরি করায় তাঁকে সাধুবাদ জানাই।

উলিপুরের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারি কমিশনার (ভূমি) এস এম মেহেদি হাসান বলেন, সে যে তার নিজের জমানো টাকা ও মটর সাইকেল বিক্রি করে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে মানুষের চলাফেরার একটা ব্যবস্থা দিয়েছে নিঃসন্দেহে এটি প্রসংশনীয়।