শিক্ষা খাতে বাংলাদেশ-চীন সংযোগে বাড়বে কর্মসংস্থান ও পেশাগত সম্ভাবনা : মাহ্দী আমিন

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময় : ০৭:০৬:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
  • ১৭৯ জন দেখেছেন

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

শিক্ষা খাতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সংযোগ উভয় দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব, কর্মসংস্থান এবং পেশাগত সম্ভাবনার ক্ষেত্রকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) চীনের গুয়াংডংয়ে ‘কারিগরি শিক্ষা সেতুবন্ধন ও চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক-বাণিজ্য মেধা উন্নয়ন’ শীর্ষক সিম্পোজিয়ামে তিনি এ কথা বলেন। কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি ও শিল্প-শিক্ষা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা হয়।

মাহ্দী আমিন বলেন, শিক্ষাখাতে বাংলাদেশ-চীন সংযোগ দুই দেশের অংশীদারত্ব, কর্মসংস্থান ও পেশাগত সম্ভাবনাকে সুদৃঢ় করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের মূল অঙ্গীকার। সেই পথেই আমরা শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি। ক্লাসরুমের তাত্ত্বিক শিক্ষাকে কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে সরকারের পরিকল্পনা হলো সবার জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশাল তরুণ বাংলাদেশি প্রজন্মকে এক ধাপ এগিয়ে রাখতে মান্দারিন তথা চাইনিজ ভাষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছি।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষক সহযোগিতা, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিৎসহ দ্বিপক্ষীয় শিক্ষা বিনিময় জোরদার করা উভয় দেশের মধ্যকার সংযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ধরনের সহযোগিতা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে, দক্ষতা বৃদ্ধিতে এবং বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আরও টেকসই ও পারস্পরিক সুবিধাজনক অংশীদারত্ব গঠনে সহায়তা করতে পারে।’

টেকসই রূপান্তরের জন্য দ্বিপক্ষীয় শিক্ষায় সংযোগ এবং চীনের বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে বাংলাদেশ ও চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বকে টেকসই করতে হলে আমাদের দক্ষ প্রজন্ম তোলা অপরিহার্য। বর্তমান যুগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজি এবং আধুনিক লজিস্টিকসে পারদর্শী মানবসম্পদ তৈরি করা সরকারের প্রধান লক্ষ্য। চীনের বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের পরিকল্পনা হলো এমন যুগোপযোগী মেধা তৈরি করা, যারা সরাসরি বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প খাতে নেতৃত্ব দিতে পারবে।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের উদ্দেশ্য উভয় দেশের শিক্ষক ও গবেষকদের প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধন সুদৃঢ় করার উপর জোর দেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, যেন নিয়মিত ফ্যাকাল্টি কোলাবোরেশন ও এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মাধ্যমে চীনের আধুনিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। একই সাথে বিশাল তরুণ বাংলাদেশি প্রজন্মের জন্য চীনের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বহুগুণ বৃদ্ধি করা আমাদের অন্যতম পরিকল্পনা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ মুখপাত্র বলেন, চীনের বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আধুনিক শিল্প খাতের বাস্তব চাহিদার আলোকে কারিগরি পাঠ্যক্রমকে ঢেলে সাজানো, আন্তর্জাতিক মানের কোর্স কারিকুলাম প্রণয়ন এবং যৌথ সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। একই সাথে চীনের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারদের সঙ্গে বাংলাদেশের পলিটেকনিক ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলাই বাংলাদেশ সরকারের উদ্দেশ্য।

চীনা শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে দুই দেশের মধ্যে আধুনিক এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ নেটওয়ার্ক তৈরি করার লক্ষ্যের কথা জানান মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, যেন শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করার সাথে সাথেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চীনা শিল্পাঞ্চলগুলোতে ইন্টার্নশিপ, স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। এই শক্তিশালী সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিক্স, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ও এমার্জিং টেকনোলজির আধুনিক ল্যাব এবং প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং ওয়ার্কশপ স্থাপনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েছি।

বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, আমাদের লক্ষ্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষার্থীদের কেবল গৎবাঁধা পেশার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকতে হবে না; যার যে ট্রেডে আগ্রহ রয়েছে, সে যেন সেখানে নিজেকে সর্বোচ্চ দক্ষতায় উন্নীত করতে পারে। এই রূপান্তরের যাত্রায় বিশাল তরুণ বাংলাদেশি প্রজন্ম যাতে কোনো আর্থিক প্রতিবন্ধকতায় না পড়ে, সেজন্য যৌথ উদ্যোগে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার বিস্তার এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে চীনা শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথ বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে মাহ্দী আমীন বলেন, চীন সরকারের কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও শিল্প অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ সহযোগিতার একটি টেকসই ফ্রেমওয়ার্ক বা রূপরেখা তৈরি করাই বর্তমান সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, এই রূপরেখার অধীনে সুনির্দিষ্ট অংশীদারদের চিহ্নিত করে দ্রুত যৌথ প্রকল্প, আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ এবং অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তিনি চীনের স্বনামধন্য শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে এসে আধুনিক ল্যাব স্থাপন ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট বা দক্ষতা উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের জোরালো আহ্বান জানান। বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ ও শিক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে এদেশের অপার সম্ভাবনাময় বিশাল তরুণ প্রজন্মকে বিশ্বমানের সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মাহ্দী আমিন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া। এ ছাড়া চীনের বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও প্রতিনিধিরা, বিশিষ্ট শিক্ষক-গবেষক, শিক্ষার্থী ও চীনের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে চীনের অর্জনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, কারিগরি শিক্ষাকে আধুনিকীকরণে চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে বাংলাদেশের গভীর আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী বিশাল সম্ভাবনার নির্দেশক এবং এই সম্ভাবনাকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনশক্তিতে রূপান্তর করতে উচ্চমানের প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি প্রযুক্তিগত শিক্ষা, আধুনিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব এবং বাস্তবমুখী কর্মসংস্থান-ভিত্তিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশী ও চীনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতার আহ্বান জানান।

শিক্ষামন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, চীনা কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে চলমান এই সহযোগিতা বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী মানবসম্পদ উন্নয়নে অবদান রাখবে।

চীনের ১১টি শীর্ষ কারিগরি ও প্রযুক্তিগত কলেজের যৌথ উদ্যোগে এই অনুষ্ঠান হয়। কলেজগুলো হলো এনপিং ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন সেন্টার, গুয়াংডং লিটারেচার অ্যান্ড আর্ট ভোকেশনাল কলেজ, গুয়াংডং নানহুয়া ভোকেশনাল কলেজ অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড কমার্স, গুয়াংডং পলিটেকনিক অব সায়েন্স অ্যান্ড ট্রেড, গুয়াংডং টিচার্স কলেজ অব ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যান্ড আর্টস, গুয়াংডং ইঞ্জিনিয়ারিং পলিটেকনিক, গুয়াংডং কান্ট্রি গার্ডেন ভোকেশনাল কলেজ, গুয়াংডং জিয়াংমেন প্রিস্কুল এডুকেশন কলেজ, কিংইয়ুয়ান পলিটেকনিক, গুয়াংডং লিংনান ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল কলেজ এবং গুয়াংঝু প্রিস্কুল এডুকেশন কলেজ।

এ সময় বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ও উপদেষ্টা ‘বেইডৌ+’ ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ল্যাবরেটরি ঘুরে দেখেন এবং রোবোটিক্স, রোবট ডগের প্রোগ্রামিং এবং চীনা চা সংস্কৃতির প্রদর্শনী পর্যবেক্ষণ করেন।

বিশ্বব্যাপী কারিগরি শিক্ষার প্রসারে গুয়াংডং ‘চায়নিজ + ভোকেশনাল স্কিলস’ ইন্ডাস্ট্রি-এডুকেশন ইন্টিগ্রেশন অ্যালায়েন্স চালু করা এ আয়োজনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল। এটি কারিগরি শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্প-শিক্ষার সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সহযোগিতার এক নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।

উভয়পক্ষই এই আলোচনাকে বাস্তবসম্মত ও টেকসই অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করার মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শেষ করেন, যা কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্পের সাথে সংযুক্ত প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করবে।
সিম্পোজিয়ামে বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া। এছাড়া চীনের বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও প্রতিনিধিবৃন্দ, বিশিষ্ট শিক্ষক-গবেষক, শিক্ষার্থী ও চীনের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

শিক্ষা খাতে বাংলাদেশ-চীন সংযোগে বাড়বে কর্মসংস্থান ও পেশাগত সম্ভাবনা : মাহ্দী আমিন

প্রকাশের সময় : ০৭:০৬:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

শিক্ষা খাতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সংযোগ উভয় দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব, কর্মসংস্থান এবং পেশাগত সম্ভাবনার ক্ষেত্রকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) চীনের গুয়াংডংয়ে ‘কারিগরি শিক্ষা সেতুবন্ধন ও চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক-বাণিজ্য মেধা উন্নয়ন’ শীর্ষক সিম্পোজিয়ামে তিনি এ কথা বলেন। কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি ও শিল্প-শিক্ষা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা হয়।

মাহ্দী আমিন বলেন, শিক্ষাখাতে বাংলাদেশ-চীন সংযোগ দুই দেশের অংশীদারত্ব, কর্মসংস্থান ও পেশাগত সম্ভাবনাকে সুদৃঢ় করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের মূল অঙ্গীকার। সেই পথেই আমরা শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি। ক্লাসরুমের তাত্ত্বিক শিক্ষাকে কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে সরকারের পরিকল্পনা হলো সবার জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশাল তরুণ বাংলাদেশি প্রজন্মকে এক ধাপ এগিয়ে রাখতে মান্দারিন তথা চাইনিজ ভাষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছি।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষক সহযোগিতা, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিৎসহ দ্বিপক্ষীয় শিক্ষা বিনিময় জোরদার করা উভয় দেশের মধ্যকার সংযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ধরনের সহযোগিতা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে, দক্ষতা বৃদ্ধিতে এবং বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আরও টেকসই ও পারস্পরিক সুবিধাজনক অংশীদারত্ব গঠনে সহায়তা করতে পারে।’

টেকসই রূপান্তরের জন্য দ্বিপক্ষীয় শিক্ষায় সংযোগ এবং চীনের বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে বাংলাদেশ ও চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বকে টেকসই করতে হলে আমাদের দক্ষ প্রজন্ম তোলা অপরিহার্য। বর্তমান যুগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজি এবং আধুনিক লজিস্টিকসে পারদর্শী মানবসম্পদ তৈরি করা সরকারের প্রধান লক্ষ্য। চীনের বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের পরিকল্পনা হলো এমন যুগোপযোগী মেধা তৈরি করা, যারা সরাসরি বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প খাতে নেতৃত্ব দিতে পারবে।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের উদ্দেশ্য উভয় দেশের শিক্ষক ও গবেষকদের প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধন সুদৃঢ় করার উপর জোর দেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, যেন নিয়মিত ফ্যাকাল্টি কোলাবোরেশন ও এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মাধ্যমে চীনের আধুনিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। একই সাথে বিশাল তরুণ বাংলাদেশি প্রজন্মের জন্য চীনের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বহুগুণ বৃদ্ধি করা আমাদের অন্যতম পরিকল্পনা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ মুখপাত্র বলেন, চীনের বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আধুনিক শিল্প খাতের বাস্তব চাহিদার আলোকে কারিগরি পাঠ্যক্রমকে ঢেলে সাজানো, আন্তর্জাতিক মানের কোর্স কারিকুলাম প্রণয়ন এবং যৌথ সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। একই সাথে চীনের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারদের সঙ্গে বাংলাদেশের পলিটেকনিক ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলাই বাংলাদেশ সরকারের উদ্দেশ্য।

চীনা শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে দুই দেশের মধ্যে আধুনিক এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ নেটওয়ার্ক তৈরি করার লক্ষ্যের কথা জানান মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, যেন শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করার সাথে সাথেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চীনা শিল্পাঞ্চলগুলোতে ইন্টার্নশিপ, স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। এই শক্তিশালী সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিক্স, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ও এমার্জিং টেকনোলজির আধুনিক ল্যাব এবং প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং ওয়ার্কশপ স্থাপনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েছি।

বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, আমাদের লক্ষ্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষার্থীদের কেবল গৎবাঁধা পেশার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকতে হবে না; যার যে ট্রেডে আগ্রহ রয়েছে, সে যেন সেখানে নিজেকে সর্বোচ্চ দক্ষতায় উন্নীত করতে পারে। এই রূপান্তরের যাত্রায় বিশাল তরুণ বাংলাদেশি প্রজন্ম যাতে কোনো আর্থিক প্রতিবন্ধকতায় না পড়ে, সেজন্য যৌথ উদ্যোগে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার বিস্তার এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে চীনা শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথ বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে মাহ্দী আমীন বলেন, চীন সরকারের কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও শিল্প অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ সহযোগিতার একটি টেকসই ফ্রেমওয়ার্ক বা রূপরেখা তৈরি করাই বর্তমান সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, এই রূপরেখার অধীনে সুনির্দিষ্ট অংশীদারদের চিহ্নিত করে দ্রুত যৌথ প্রকল্প, আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ এবং অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তিনি চীনের স্বনামধন্য শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে এসে আধুনিক ল্যাব স্থাপন ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট বা দক্ষতা উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের জোরালো আহ্বান জানান। বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ ও শিক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে এদেশের অপার সম্ভাবনাময় বিশাল তরুণ প্রজন্মকে বিশ্বমানের সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মাহ্দী আমিন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া। এ ছাড়া চীনের বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও প্রতিনিধিরা, বিশিষ্ট শিক্ষক-গবেষক, শিক্ষার্থী ও চীনের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে চীনের অর্জনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, কারিগরি শিক্ষাকে আধুনিকীকরণে চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে বাংলাদেশের গভীর আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী বিশাল সম্ভাবনার নির্দেশক এবং এই সম্ভাবনাকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনশক্তিতে রূপান্তর করতে উচ্চমানের প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি প্রযুক্তিগত শিক্ষা, আধুনিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব এবং বাস্তবমুখী কর্মসংস্থান-ভিত্তিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশী ও চীনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতার আহ্বান জানান।

শিক্ষামন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, চীনা কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে চলমান এই সহযোগিতা বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী মানবসম্পদ উন্নয়নে অবদান রাখবে।

চীনের ১১টি শীর্ষ কারিগরি ও প্রযুক্তিগত কলেজের যৌথ উদ্যোগে এই অনুষ্ঠান হয়। কলেজগুলো হলো এনপিং ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন সেন্টার, গুয়াংডং লিটারেচার অ্যান্ড আর্ট ভোকেশনাল কলেজ, গুয়াংডং নানহুয়া ভোকেশনাল কলেজ অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড কমার্স, গুয়াংডং পলিটেকনিক অব সায়েন্স অ্যান্ড ট্রেড, গুয়াংডং টিচার্স কলেজ অব ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যান্ড আর্টস, গুয়াংডং ইঞ্জিনিয়ারিং পলিটেকনিক, গুয়াংডং কান্ট্রি গার্ডেন ভোকেশনাল কলেজ, গুয়াংডং জিয়াংমেন প্রিস্কুল এডুকেশন কলেজ, কিংইয়ুয়ান পলিটেকনিক, গুয়াংডং লিংনান ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল কলেজ এবং গুয়াংঝু প্রিস্কুল এডুকেশন কলেজ।

এ সময় বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ও উপদেষ্টা ‘বেইডৌ+’ ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ল্যাবরেটরি ঘুরে দেখেন এবং রোবোটিক্স, রোবট ডগের প্রোগ্রামিং এবং চীনা চা সংস্কৃতির প্রদর্শনী পর্যবেক্ষণ করেন।

বিশ্বব্যাপী কারিগরি শিক্ষার প্রসারে গুয়াংডং ‘চায়নিজ + ভোকেশনাল স্কিলস’ ইন্ডাস্ট্রি-এডুকেশন ইন্টিগ্রেশন অ্যালায়েন্স চালু করা এ আয়োজনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল। এটি কারিগরি শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্প-শিক্ষার সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সহযোগিতার এক নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।

উভয়পক্ষই এই আলোচনাকে বাস্তবসম্মত ও টেকসই অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করার মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শেষ করেন, যা কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্পের সাথে সংযুক্ত প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করবে।
সিম্পোজিয়ামে বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া। এছাড়া চীনের বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও প্রতিনিধিবৃন্দ, বিশিষ্ট শিক্ষক-গবেষক, শিক্ষার্থী ও চীনের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।