নিজস্ব প্রতিবেদক :
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, হয় আপনারা বিচার নিশ্চিত করুন, না হয় যাওয়ার পথ খুঁজে বের করুন। অন্যায় ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আবারও বিপ্লব হবে।’ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মানুষের অধিকার রক্ষায় সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাজধানীর বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে ‘আওয়ামী ফ্যাসিস্ট কতৃক সংঘঠিত সকল গুম খুন ও গণহত্যার বিচার দাবি’তে আয়োজিত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের যাতাকলে পৃষ্ঠ এই জাতিকে আল্লাহতালা আমাদের ছাত্র, শ্রমিক, যুব জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মাত্র দুটি বছর আগে আমাদের মুক্তি দিয়েছিলেন। সেই সময়ে যে দলটি আমাদের মতই মজলুম ছিল, নির্যাতিত ছিল। আজকে তারা ক্ষমতায়। তারা তখন প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছিল।
জামায়াত আমির বলেন, নির্বাচনের সময় তারা বলেছিল, নির্বাচিত হলে ফ্যাসিবাদের হাতে যতগুলো খুন হয়েছে, গুম হয়েছে, নির্যাতন হয়েছে, সবগুলার বিচার তারা করবে। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর এখন তাদের সুর পাল্টে গেছে। বিচার তো তারা করছেই না। গত চার মাসে ৬০০ জনের বেশি মানুষ নির্ভমভাবে বাংলার মাটিতে খুন হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দুঃখজনক, এই দলটি নিজেরা নিজেদের কর্মীই খুন করেছে। যাদের নিজেদের কর্মীদের সম্পর্কে নিজেদেরই কোনো দায় এবং দরদ থাকে না। ২০ কোটি মানুষের জন্য তাদের কী দায় এবং দরদ থাকবে? আমরা কোনো লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না।
তিনি বলেন, লজ্জার বিষয় বিএনপি ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হওয়ার কথা বলে ঠিক ফ্যাসিবাদের রাজপথ ধরেই তারা এখন হাঁটা শুরু করেছেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের জাতাকলে পিষ্ট এই জাতিকে আল্লাহ তাআলা আমাদের ছাত্র, শ্রমিক, যুব ও জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মাত্র দুই বছর আগে মুক্তি দিয়েছিলেন। সেই সময় যে দলটি আমাদের মতোই মজলুম ছিল, নির্যাতিত ছিল, আজকে তারা ক্ষমতায় আছে’—মন্তব্য করে জামায়াত আমির বলেন, ‘তারা তখন প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছিল। নির্বাচনের সময় তারা বলেছিল, নির্বাচিত হলে যত হত্যা ও নির্যাতন হয়েছে সবগুলোর বিচার করবে। ক্ষমতায় বসার পর এখন তাদের সুর পাল্টে গেছে।
সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আমিরে জামায়াত বলেন, লজ্জার বিষয়, সরকার ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হওয়ার কথা বলে ঠিক ফ্যাসিবাদের রাজপথ ধরেই তারা এখন হাঁটা শুরু করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিভিন্ন ব্যাংকে অযাচিত হস্তক্ষেপ, বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজগুলো দলীয় অনুগতদের দিয়ে দখল করা, জেলায় জেলায় প্রশাসক বসিয়ে দেওয়া, এমনকি খেলার মাঠটাও পর্যন্ত তারা দলমুক্ত রাখতে পারলেন না। এইভাবে তারা আবার কার্যত একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ কিন্তু বারবার বিপ্লবের সাক্ষী। আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, আপনারা বিচার নিশ্চিত করুন না হয় আপনারা যাওয়ার রাস্তা খুঁজে বের করুন। আপনারা যে পথে হাঁটছেন, সংসদে আমরা প্রত্যেকটি বিষয় সেখানে আমরা প্রতিবাদ করছি। দুই তৃতীয়াংশ ভোট কীভাবে পেয়েছেন আপনারাই ভালো জানেন। আর এ দেশের জনগণও জানে এবং এই ব্যাপারে কিছু রাজ সাক্ষীও ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। আপনাদের দলের ভেতর থেকে পাওয়া গেছে। বিগত সরকারের মধ্য থেকেও পাওয়া গেছে।
বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে জামায়াতের আমির বলেন, বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করব। মজলুম ছিলেন, জালেম হবেন না। মেহেরবানী করে বিচারগুলো নিশ্চিত করুন। শুধু ফ্যাসিবাদের হাতে কেন? এই রাস্তায় আমাদের কলিজার টুকরা বিপ্লবের প্রতীক শরিফ উসমান হাদিকে হত্যা করে তার বিচার ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এখন পর্যন্ত মামলার চার্জশিট দেওয়া হয় নাই। কাকে খুশি করার জন্য, কোন সত্যকে আড়াল করার জন্য, এটা করা হচ্ছে জনগণ জানতে চায়।
তিনি বলেন, এদেশের মানুষের অন্তরে, কলিজায়, হৃদয়ে, মগজে সব জায়গায় বসে আছে মজবুত ভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ। এই আদর্শকে নির্মূল করার চিন্তা করবেন না। যদিও আপনাদের একজন সিনিয়র নেতা ঘোষণা করে দিয়েছেন নির্মূল করবেন। অতীতে যারা নির্মূল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা নিজেরাই আজকে নির্মূল হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, বেশি নির্মূল, নির্মূল করবেন না। এটা এক ধরনের ভাইরাস। এই ফ্যাসিবাদের ভাইরাস, চাঁদাবাজির ভাইরাস, দুর্নীতির ভাইরাস, দলীয় শাসনের ভাইরাস, এই সব ভাইরাস মুক্ত করার জন্য আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
জামায়াত আমির বলেন, গাইবান্ধায় ছাত্রশিবিরের এক তরুণ নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করে একজন মানুষকে দুনিয়া থেকে সরানো যায়, কিন্তু কোনো আদর্শকে নির্মূল করা যায় না।
তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ এ দেশের মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে। কোনো শক্তিই সেই আদর্শকে মুছে ফেলতে পারবে না।
সরকারের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, মজলুম ছিলেন, জালেম হবেন না। মেহেরবানি করে বিচারগুলো নিশ্চিত করুন।
নতুন করে আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অন্যায় ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আবারও বিপ্লব হবে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মানুষের অধিকার রক্ষায় সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, পুরাতন-নতুন কোনো ফ্যাসিবাদই আমরা মেনে নেব না। জীবন একটাই- সেই জীবন আল্লাহর জন্য, মানুষের জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত আছি।
সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই হত্যাকাণ্ড, শাপলা হত্যাকাণ্ড, পিলখানা হত্যাকাণ্ডসহ সকল গুম-খুন এবং শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার অবিলম্বে নিশ্চিত করতে হবে। বিচার যদি নিশ্চিত না করা হয়, এই সরকার কোনোভাবেই পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবে না।’
নাহিদ বলেন, নতুন সরকার গঠনের পর গত চার মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কোনো নতুন রায় হয়নি এবং নতুন কোনো তদন্ত প্রতিবেদনও জমা পড়েনি। ‘এটা স্পষ্ট যে, যেই চিফ প্রসিকিউটরকে বসানো হয়েছে তিনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। অবিলম্বে তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে,’ বলেন নাহিদ ইসলাম।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা নাকচ করে নাহিদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের দেশে আসার, রাজনীতি করার সুযোগ বাংলাদেশে ৫ আগস্টেই সমাপ্ত হয়েছে। যারা সমঝোতা করছে, যারা নতুন করে স্বপ্ন দেখছে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার, তাদের পরিণতি আওয়ামী লীগের মতই হবে।’
সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আইনমন্ত্রী বিচার না করার কারণে স্পষ্ট ব্যর্থ হয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিরাপত্তা দিতে না পারায় ব্যর্থ হয়েছেন। তথ্যমন্ত্রীও ব্যর্থ হয়েছেন, কারণ তিনি আওয়ামী লীগের সুশীল সমাজকে মিডিয়ায় স্পেস দিচ্ছেন।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, ‘শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকারীরা ভারতে গিয়ে জামাই আদরে প্রতিপালিত হচ্ছে। ভারত সরকারকে বলতে চাই, হাদি হত্যার বিচার করার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। সেই হত্যাকারীদের বাংলাদেশে হস্তান্তর করুন।’
মামুনুল হক বলেন, ‘যে ফ্যাসিবাদ বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে তারা পুরোনো রূপেও ফিরবে না, আর নতুন রূপেও ফিরতে দেব না আমরা।’
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর নিয়ে সরকার টালবাহানা করছে বলেও অভিযোগ করেন মামুনুল হক। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘মনে রেখো, জুলাই বিপ্লবের পিঠে যদি ছুরিকাঘাতের চেষ্টা করো, তবে ইতিহাস থেকে নির্মূল হয়ে যাবে।’
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় জোটের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন এবং মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























