কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :
অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড করেছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানের টাকা। গণনা শেষে এবার পাওয়া গেছে ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা। এর পাশাপাশি মিলেছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার।
শনিবার (২৭ জুন) সকাল ৭টায় খোলা হয় মসজিদের ১৩টি দানবাক্স। এতে মিলে রেকর্ড ৪৩ বস্তা টাকা। ৯টার পর শুরু হয় গণনা। চলে রাত পৌনে ৯টা পর্যন্ত।
জেলা প্রশাসন ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটি গণনা শেষে মোট টাকা পাওয়ার তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।
জানা গেছে, প্রতি তিন থেকে চার মাস পরপর পাগলা মসজিদের দানবাক্সগুলো খোলা হলেও এবার ছয় মাস পর খোলা হয়েছে। এতে রেকর্ড সংখ্যক টাকা পাওয়া গেছে। এছাড়াও স্বর্ণালংকার, বৈদেশিক মুদ্রাসহ নানা সামগ্রী পাওয়া গেছে।
বস্তাভর্তি টাকা গণনার কাজে অংশ নেন মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য, মসজিদ কমপ্লেক্সে অবস্থিত মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পাশের জামিয়া এমদাদিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী, রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ৫৯০ জন মানুষ।
মসজিদ পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানা গেছে, মসজিদের দান থেকে পাওয়া এসব অর্থ সংশ্লিষ্ট মসজিদসহ জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানার পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হয়।
মসজিদটিতে এবার আন্তর্জাতিক মানের দৃষ্টিনন্দন ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত এর কাজ শুরু হবে। যার নামকরণ হবে ‘পাগলা মসজিদ ইসলামিক কমপ্লেক্স’। এটি নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৫ কোটি টাকা। সেখানে ৪০ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন।
জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইশতিয়াক ইমন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাহিদ হাসনা খান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদ, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান মারুফসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দানবাক্সগুলো খোলা হয়।
ময়মনসিংহের গফরগাঁও থেকে আসা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলেটার বিয়ের পর পাঁচ বছর কোনো সন্তান হচ্ছিল না। অনেক ডাক্তার দেখিয়েও যখন কাজ হয়নি, তখন এই পাগলা মসজিদে এসে আল্লাহর ওয়াস্তে মানত করেছিলাম—যদি আমার ঘরে নাতি-নাতনি আসে, তবে এসে বড় অঙ্কের টাকা দান করব। আল্লাহ আমার মানত কবুল করেছেন, গত মাসে আমার ঘরে ফুটফুটে এক নাতনি এসেছে। আজ সেই মানতের টাকা দিতেই এখানে এসেছি।’
মসজিদের দানবাক্সে শুধু মুসলিমরা নন, নিয়মিত দান করেন অন্য ধর্মের লোকেরাও।
নেত্রকোনার দুর্গাপুর থেকে আসা বাসন্তী রানী বর্মন বলেন, ‘আমার মেজ মেয়েটা এক জটিল রোগে ভুগছিল, কোনো চিকিৎসাতেই কাজ হচ্ছিল না। তখন পরিচিত কয়েকজনের মুখে শুনে মনে মনে মানত করেছিলাম, মেয়েটা সুস্থ হলে পাগলা মসজিদে গিয়ে সোনার গয়না দান করব। ভগবান আমার দিকে তাকিয়েছেন, মেয়েটা এখন পুরোপুরি সুস্থ। আজ সেই মানত পূরণ করতেই নিজের কানের সোনার দুল দান করে গেলাম।’
জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন বলেন, পাগলা মসজিদের প্রতি মানুষের এক গভীর আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। যার প্রতিফলন দেখা যায় এই দানবাক্সগুলোয়। মানুষের এই আমানত অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত মসজিদের সরাসরি দানের ১১৪ কোটি টাকা এবং চলতি বছরের ২৬ জুন পর্যন্ত অনলাইনে দানের ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮২ টাকা ব্যাংকে জমা রয়েছে। এ ছাড়া মানুষের দান করা বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার ও রুপা জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে সম্পূর্ণ নিরাপদ হেফাজতে রাখা হয়েছে।
সোহানা নাসরিন আরও বলেন, এই দানের টাকা কোনো ব্যক্তিগত খাতে ব্যবহারের সুযোগ নেই। জমা করা এই বিশাল অর্থ জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার উন্নয়ন ও পরিচালনায় অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি অসহায়, দরিদ্র ও জটিল রোগে আক্রান্ত মুমূর্ষু মানুষের চিকিৎসায় এবং কল্যাণে এই তহবিল থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তা করা হয়ে থাকে।
এর আগে গত ২৭ ডিসেম্বর সর্বশেষ পাগলা মসজিদের দানবাক্সগুলো খোলা হয়েছিল। ১৩টি সিন্দুকে সেসময় ৩৫ বস্তা টাকা পাওয়া গিয়েছিল। গণনা শেষে মোট টাকার সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা। এছাড়াও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করা হয়েছিল।
শনিবার দানবাক্স খোলা শেষে এক ব্রিফিংয়ে জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন বলেন, পাগলা মসজিদের দানের ১১৪ কোটি ১৩ লাখ ৭ হাজার ৩৫২টাকা রূপালী ব্যাংক লিমিটেডে জমা রয়েছে। (সর্বশেষ দানবাক্স খোলার আগ পর্যন্ত)। এছাড়াও স্বর্ণালঙ্কার ও বৈদেশিক মুদ্রা সিলগালাকৃত অবস্থায় জেলা ট্রেজারিতে জমা রয়েছে। পাগলা মসজিদে দানবাক্সের পাশাপাশি অনলাইনেও দান-খয়রত গ্রহণ করা হয়। এ পর্যন্ত অনলাইনে ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮২টাকা জমা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি 





















