পাঁচ বছরে বিমানবন্দর থেকে ফেরত সাড়ে ৮১ হাজার বিদেশগামী

  • প্রতিনিধির নাম
  • প্রকাশের সময় : ০১:৩৭:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১৮০ জন দেখেছেন

বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছেও গন্তব্যে যেতে পারছেন না হাজার হাজার বাংলাদেশী। ভিসা এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ক্লিয়ারেন্সে অসংগতি, জাল কাগজপত্র, ভিসার শর্তভঙ্গ কিংবা ইমিগ্রেশনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তথ্যের গরমিলসহ নানা কারণে আটকে যাচ্ছে তাদের বিদেশযাত্রা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রমবাজার বন্ধ বা সীমিত থাকার পরও বিকল্প পথে প্রবেশের চেষ্টা ধরা পড়ছে।

পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশের বিমানবন্দর থেকে মোট ৮১ হাজার ৫০০ যাত্রীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে ২ কোটি ৯১ লাখের বেশি বিদেশে গেছেন। অর্থাৎ একদিকে বিদেশে কর্মসংস্থানসহ নানা কাজের জন্য বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী প্রতি বছর দেশ ছাড়ছেন, অন্যদিকে তাদের একটি অংশ বিমানবন্দরের শেষ ধাপেই আটকে যাচ্ছেন নানাভাবে প্রতারিত হয়ে।

বিদেশ যেতে সম্প্রতি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে আসেন তাসলিমা বেগম (ছদ্মনাম)। দাবি অনুযায়ী, ওমানে থাকা স্বামীর কাছে যাচ্ছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিল বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সও। সাধারণ চোখে বিদেশযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্রের ঘাটতি ছিল না। কিন্তু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার কয়েকটি প্রশ্নেই বদলে যায় পরিস্থিতি। কেননা দেশটিতে বর্তমানে সাধারণ কর্মী ভিসা ও নারী গৃহকর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে।

ওমানে স্বামী কত বছর ধরে আছেন—জবাবে তাসলিমা বলেন, প্রায় পাঁচ বছর। এরপর জানতে চাওয়া হয় তাদের বিয়ের সময়কাল। তিনি জানান, তাদের বিয়ে হয়েছে ‘মোবাইলে’। দেখাতে বলা হলে তিনি একটি বিয়ের ছবি উপস্থাপন করেন। কিন্তু নিবন্ধিত নিকাহনামা বা বিয়ের বৈধ কোনো নথি ছিল না তার কাছে।

ছবিটি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার পর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সন্দেহ আরো বাড়ে। পর্যবেক্ষণে দেখা যায় ছবিটি ফটোশপ দিয়ে তৈরি। পরবর্তী সময়ে ইমিগ্রেশন পুলিশ ডিজিটাল রেকর্ড ও আগের নথি অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখতে পান এক অবিশ্বাস্য জালিয়াতি। তাসলিমার স্বামী পরিচয়ে ব্যবহৃত একই স্পাউস ভিসা অনুমোদনপত্র দিয়ে ভিন্ন সময়ে আলাদা পাসপোর্টে মোট পাঁচ নারীকে ওমানে পাঠানোর তথ্য মেলে। এরপর বাতিল করা হয় তার বিদেশযাত্রা।

ইমিগ্রেশন-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বন্ধ থাকা শ্রমবাজারে প্রবেশের চেষ্টা, ভিসা জালিয়াতি ও অবৈধ অভিবাসন এখন বিমানবন্দরে নথি যাচাইয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব ঘটনায় সরকারি সিল, স্বাক্ষর ও বিভিন্ন অনুমোদনপত্র জাল করে তৈরি হচ্ছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। ফলে সেগুলোর পেছনের তথ্য ও ডিজিটাল রেকর্ড যাচাই না করলে জালিয়াতি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ইমিগ্রেশন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দর থেকে বিদেশযাত্রা বাতিল বা ফেরত পাঠানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভিসা জালিয়াতি ও অবৈধ অভিবাসনের ঘটনায় অন্তত ২৩টি দেশের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে থাইল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়া, চীন, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, পাকিস্তান, মিসর, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, মেক্সিকো, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, লিবিয়া, সাইপ্রাস, সৌদি আরব ও দক্ষিণ আফ্রিকা।

২০২১ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে বিভিন্ন ভিসায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী বিদেশ গেছেন। তবে বিমানে ওঠার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্নের পরও ইমিগ্রেশনে এসে নথিপত্রের জটিলতা, মানব পাচারের শঙ্কা, অবৈধ অভিবাসন ও নিরাপত্তার কারণে বহু যাত্রীর বিদেশযাত্রা আটকে যায়।

এসবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ২৬ লাখ ২২ হাজার ৭১১ বাংলাদেশী বিভিন্ন ভিসায় বিদেশে গেছেন। তবে নথিপত্রে অসংগতি কিংবা ইমিগ্রেশনের কড়াকড়ির কারণে এ সময়ে ৭ হাজার ৮১৯ যাত্রীকে বিমানবন্দর থেকেই ফেরত পাঠানো হয়। এর আগের বছর বিদেশ গমন করেন মোট ৫৭ লাখ ৮ হাজার ১৩২ যাত্রী। একই বছর আবার নানা জটিলতার কারণে বিমানবন্দরে আটকে দেয়া হয় ১৫ হাজার ৫১৬ জনের বিদেশযাত্রা।

বিগত বছরগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালে ৬৪ লাখ ২৮ হাজার ৯৩ বিদেশে গমন করেন। এ সময় দেশের বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয় ১৮ হাজার ৯ জনকে। ২০২৩ সালে রেকর্ড ৬৯ লাখ ৯২ হাজার ২৫৩ যাত্রী বিদেশে গেলেও ইমিগ্রেশন পার হতে ব্যর্থ হয়ে ৯ হাজার ৮৭২ জনকে ফেরত আসতে হয়। ২০২২ সালে বিদেশ যান ৫২ লাখ ৯৯ হাজার ৩১৩ যাত্রী। আর এ সময় সর্বাধিক ১৮ হাজার ৭৫৬ জনকে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়। ২০ লাখ ৬০ হাজার ৬৮৩ জন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যান ২০২১ সালে। ওই বছর আবার ১১ হাজার ৫২৮ বাংলাদেশীকে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয় বিভিন্ন কারণে। সব মিলিয়ে সাড়ে পাঁচ বছরে মোট ২ কোটি ৯১ লাখের বেশি বাংলাদেশী বিদেশে গেছেন। এর বিপরীতে নথিপত্রের ত্রুটি ও নিরাপত্তার কারণে মোট ৮১ হাজার ৫০০ জনের যাত্রা বাতিল করা হয় দেশের বিমানবন্দর থেকে।

ইমিগ্রেশন পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ইতালিতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের পারিবারিক ভিসা অনুমোদনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক অভিনব ও সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্র। ইতালীয় সরকারের দেয়া ভিসা সুবিধার সুযোগ নিয়ে চক্রটি ‘পেজ সাবস্টিটিউশন’ (পৃষ্ঠা প্রতিস্থাপন) কৌশলে ভুয়া ভিসা জালিয়াতি চালিয়ে আসছে। বিগত বছরে রেকর্ড ১২ হাজার ৫০০টি বাংলাদেশী পারিবারিক ভিসা দেয়া হয়েছে, যা একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ। এ সুযোগকেই হাতিয়ার বানিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র।

প্রথমে চক্রটি একজন প্রকৃত ভিসাগ্রহীতাকে ইতালিতে পাঠায়। ভ্রমণ সম্পন্ন হওয়ার পর প্রথম ব্যক্তির পাসপোর্টে থাকা ইতালীয় ভিসা, বাংলাদেশের ‘ডিপার্চার সিল’ এবং ইতালির ‘অ্যারাইভাল সিল’ হুবহু নকল করা হয়। ডেটাবেজের তথ্যের সঙ্গে মিল রাখতে জালিয়াত চক্রটি সম্পূর্ণ ভিসা পৃষ্ঠাটি কেটে ফেলে দ্বিতীয় একজন ব্যক্তির পাসপোর্টে প্রতিস্থাপন করে দেয়। দ্বিতীয় ব্যক্তির ছবি ও চেহারা প্রথম ব্যক্তির সঙ্গে মিলিয়ে বেছে নেয়া হয়, যাতে প্রথম দর্শনে কোনো সন্দেহ না জাগে।

পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) এক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ফ্রান্সে বসবাসরত এক বাংলাদেশী প্রায় ১০ হাজার ইউরো খরচ করে ভুয়া সুইস পাসপোর্ট বানিয়ে দেশে ফিরলে তা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে ধরা পড়ে। মূলত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আকারের চেয়ে পাসপোর্টটি বড় পাওয়ায় প্রাথমিকভাবে সন্দেহ হয়, পরবর্তী সময়ে ডিভাইস স্ক্যানিংয়ে বায়োমেট্রিক চিপের সংকেত না পাওয়া এবং বিভিন্ন ধাপের যাচাইয়ে শতভাগ নকল সুইস পাসপোর্টের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে সুবিধাজনক প্রবেশের উদ্দেশ্যে তিনি এটি তৈরি করেন বলে জানান।

এ কর্মকর্তা আরো জানান, দক্ষিণ আফ্রিকার জঙ্গল কিংবা লিবিয়ার জলপথ পেরিয়ে ইউরোপে প্রবেশের ট্র্যাজেডি এতদিন সংবাদের শিরোনাম হলেও নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলের তরুণদের একটি বড় অংশ এখন ব্রাজিল ও মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে পৌঁছার ঘটনা আমাদের নজরে এসেছে। ওই দুই জেলার বহু পরিবার আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে সেটেল্ড থাকায় স্থানীয় তরুণদের মধ্যে যেকোনো মূল্যে সেখানে পৌঁছার তাড়না রয়েছে। ৫০ লাখ টাকা খরচ করেও অনেকে এ পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। তাই ব্রাজিল ও মেক্সিকোয় প্রবেশের চেষ্টা করা বিদেশগামীদের বিষয়ে আলাদাভাবে নজর দেয়া হচ্ছে।

তবে কেবল জালিয়াতি করা ব্যক্তি বা দালাল চক্রকে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর। তার মতে, বিদেশগামী কর্মীর নথিপত্র যাচাই ও প্রাথমিক অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে বিএমইটি এবং বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর লেবার উইংয়ের যাচাইপ্রক্রিয়ায় আরো কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

বণিক বার্তাকে আসিফ মুনীর বলেন, বিদেশে শুধু কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধির মানসিকতা থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমন্বিত ও স্বয়ংক্রিয় তথ্য যাচাইকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে কালো তালিকাভুক্ত এজেন্সি, কোনো মিশন বা শ্রম চুক্তি না থাকা দেশ কিংবা সন্দেহজনক রুটের ক্ষেত্রে একটি ডিজিটাল অ্যালার্ট সিস্টেমের মাধ্যমে বিমানবন্দরে যাওয়ার আগেই ক্রস চেক সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। আর সেটি চালু হলে তা অসাধু চক্রের সুযোগ বন্ধ করে প্রকৃত ও নিরাপদ অভিবাসনের পথ শক্তিশালী করবে।

তবে সব ক্ষেত্রে জালিয়াতি নয়, বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও ভ্রমণে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে প্রথমবারের মতো থাইল্যান্ড ভ্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন তালহা রহমান। পাসপোর্টের সঠিক মেয়াদ, প্রয়োজনীয় ভিসা ও ভ্রমণসংক্রান্ত সব কাগজপত্র সঙ্গে থাকলেও ইমিগ্রেশন কাউন্টারে অস্বাভাবিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ক্ষিপ্ত হয়ে জানতে চান, ‘শিক্ষার্থী হয়ে প্রথম বিদেশ ভ্রমণে ভারত না গিয়ে কেন থাইল্যান্ড যাচ্ছেন?

যুক্তিসংগত কোনো কারণ ছাড়াই তাকে আটকে দিয়ে নেয়া হয় ইমিগ্রেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কক্ষে। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা তাকে প্রথম দফায় বিদেশ ভ্রমণে বাতিলের ইঙ্গিত দেন। তবে তালহা তার বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করা মাত্রই কর্মকর্তার মনোভাব বদলে যায় এবং তাকে বিমানে ওঠার অনুমতি দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়া ভ্রমণের সময়ও একই ধরনের জটিলতার সম্মুখীন হলে তিনি একই উপায় অবলম্বন করে পার পান বলে জানান।

‘পাওয়ারফুল কানেকশন’ থাকলে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া ভ্রমণ হওয়ায় আশিকুর রহমানের (ছদ্মনাম) কাছে বৈধ ভিসা, বিএমইটি ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় সব নথি থাকা সত্ত্বেও বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়। এ বিষয়ে তিনি জানান, ইমিগ্রেশন থেকে তাকে বিমানে উঠতে না দিয়ে পাসপোর্ট রেখে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিষয়টিতে ইমিগ্রেশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়। তাৎক্ষণিকভাবে ইমিগ্রেশন ইনচার্জকে ভিডিও কল দিলে তিনি আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বলেন, আরে ভাই, সরাসরি স্যারকে ফোন দেয়ার কী দরকার ছিল? যান, বিমানে ওঠেন।

অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচার রুখতে ইমিগ্রেশন পুলিশকে সক্রিয় রাখা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বর্তমানে আকাশপথের পাশাপাশি নৌপথেও নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়ছে। তাই অবৈধ অভিবাসন ও পাচার রুখতে ইমিগ্রেশন পুলিশকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় রাখা হয়েছে। যাত্রীদের আচরণ দেখেই মূলত বোঝা যায় কে আসলে কোথায় এবং কী উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন। ইমিগ্রেশন পুলিশকে সে ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তবে পুলিশকে টাকা দিয়ে পার পেয়ে যাওয়া কিংবা অন্যায্যভাবে আটকে দেয়ার যে অভিযোগগুলো উঠছে, তার মধ্যে কিছু বিষয় যে সত্য তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ বলেন, যে দেশেই কর্মী পাঠানো হোক না কেন, বিএমইটি যেন কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সঠিক যাচাই-বাছাই করেই ছাড়পত্রের অনুমোদন দেয়, যাতে কোনো কর্মীকে আবার দেশ থেকে বা বিদেশ থেকে ফেরত আসতে না হয়। যেসব দেশকে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছি, যেখানে অবৈধ অভিবাসন বা মানব পাচারের ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে বহির্গমন ছাড়পত্রের অনুমোদন দিতে বিএমইটিকে আরো অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে।

বিমানবন্দরে একটি যাত্রা থেমে যাওয়ার দৃশ্যের পেছনে তাই কেবল একজন যাত্রীর হতাশা থাকে না। থাকে একটি পরিবারের হিসাব, ধার করা অর্থ, বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা এবং কখনো কখনো কয়েক মাসের প্রস্তুতি। প্রশ্নটি এখন শুধু কতজনকে ফেরত পাঠানো হলো, তা নয়। প্রশ্ন হলো কেন তারা বিমানবন্দর পর্যন্ত এসে যাত্রা করতে পারলেন না, সমস্যাটি কোন পর্যায়ে তৈরি হয়েছিল এবং বিদেশযাত্রার পুরো প্রক্রিয়ায় সে ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করার সুযোগ ছিল কিনা।

অবৈধ অভিবাসন ও ভিসা জালিয়াতি রোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ও কাজ করছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। তিনি বলেন, বাস্তবতা হলো আমাদের মন্ত্রণালয় মূলত ডিমান্ড লেটার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলে লোকবলের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে। ভিসা যাচাইয়ের প্রকৃত অথরিটি বিএমইটিরও নেই। মাত্র চার-পাঁচটি দেশের ভিসা যাচাইয়ের অ্যাকসেস তাদের রয়েছে, বাকিগুলোর কোনো অ্যাকসেস নেই। এ সীমাবদ্ধতাকে অনেকে ব্যবহার করছে। নকল নথিপত্রে বহির্গম ছাড়পত্র দেয়ার সঙ্গে বিএমইটির কিছু অসাধু কর্মকর্তাও জড়িত, যারা চোখ বুজে ক্লিয়ারেন্স দিয়ে থাকেন। বিষয়টি আমারও দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এর আগে সার্বিয়াতে ভুয়া ভিসায় বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স দেয়ার একটি ঘটনা সামনে এসেছে এবং এরই মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, যেসব দেশকে আমরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছি যেমন সার্বিয়া, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও লিবিয়া—সেসব দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভিসা কঠোরভাবে ভেরিফাই করতে বলা হয়েছে। বিএমইটিতে পুরোপুরি ভিসা চেকিং সিস্টেম চালু করতে পারলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। যৌথভাবে ভিসা ভেরিফিকেশনের কাজটি সঠিকভাবে করার জন্য বিএমইটিতে ইমিগ্রেশনের একটি টিমকে বসানোর বিষয়ে আলোচনা করছি। শিগগিরই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে : লাভের আশায় ১১টি ট্রেন ইজারা দেবে রেল

পাঁচ বছরে বিমানবন্দর থেকে ফেরত সাড়ে ৮১ হাজার বিদেশগামী

প্রকাশের সময় : ০১:৩৭:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছেও গন্তব্যে যেতে পারছেন না হাজার হাজার বাংলাদেশী। ভিসা এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ক্লিয়ারেন্সে অসংগতি, জাল কাগজপত্র, ভিসার শর্তভঙ্গ কিংবা ইমিগ্রেশনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তথ্যের গরমিলসহ নানা কারণে আটকে যাচ্ছে তাদের বিদেশযাত্রা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রমবাজার বন্ধ বা সীমিত থাকার পরও বিকল্প পথে প্রবেশের চেষ্টা ধরা পড়ছে।

পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশের বিমানবন্দর থেকে মোট ৮১ হাজার ৫০০ যাত্রীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে ২ কোটি ৯১ লাখের বেশি বিদেশে গেছেন। অর্থাৎ একদিকে বিদেশে কর্মসংস্থানসহ নানা কাজের জন্য বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী প্রতি বছর দেশ ছাড়ছেন, অন্যদিকে তাদের একটি অংশ বিমানবন্দরের শেষ ধাপেই আটকে যাচ্ছেন নানাভাবে প্রতারিত হয়ে।

বিদেশ যেতে সম্প্রতি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে আসেন তাসলিমা বেগম (ছদ্মনাম)। দাবি অনুযায়ী, ওমানে থাকা স্বামীর কাছে যাচ্ছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিল বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সও। সাধারণ চোখে বিদেশযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্রের ঘাটতি ছিল না। কিন্তু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার কয়েকটি প্রশ্নেই বদলে যায় পরিস্থিতি। কেননা দেশটিতে বর্তমানে সাধারণ কর্মী ভিসা ও নারী গৃহকর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে।

ওমানে স্বামী কত বছর ধরে আছেন—জবাবে তাসলিমা বলেন, প্রায় পাঁচ বছর। এরপর জানতে চাওয়া হয় তাদের বিয়ের সময়কাল। তিনি জানান, তাদের বিয়ে হয়েছে ‘মোবাইলে’। দেখাতে বলা হলে তিনি একটি বিয়ের ছবি উপস্থাপন করেন। কিন্তু নিবন্ধিত নিকাহনামা বা বিয়ের বৈধ কোনো নথি ছিল না তার কাছে।

ছবিটি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার পর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সন্দেহ আরো বাড়ে। পর্যবেক্ষণে দেখা যায় ছবিটি ফটোশপ দিয়ে তৈরি। পরবর্তী সময়ে ইমিগ্রেশন পুলিশ ডিজিটাল রেকর্ড ও আগের নথি অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখতে পান এক অবিশ্বাস্য জালিয়াতি। তাসলিমার স্বামী পরিচয়ে ব্যবহৃত একই স্পাউস ভিসা অনুমোদনপত্র দিয়ে ভিন্ন সময়ে আলাদা পাসপোর্টে মোট পাঁচ নারীকে ওমানে পাঠানোর তথ্য মেলে। এরপর বাতিল করা হয় তার বিদেশযাত্রা।

ইমিগ্রেশন-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বন্ধ থাকা শ্রমবাজারে প্রবেশের চেষ্টা, ভিসা জালিয়াতি ও অবৈধ অভিবাসন এখন বিমানবন্দরে নথি যাচাইয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব ঘটনায় সরকারি সিল, স্বাক্ষর ও বিভিন্ন অনুমোদনপত্র জাল করে তৈরি হচ্ছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। ফলে সেগুলোর পেছনের তথ্য ও ডিজিটাল রেকর্ড যাচাই না করলে জালিয়াতি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ইমিগ্রেশন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দর থেকে বিদেশযাত্রা বাতিল বা ফেরত পাঠানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভিসা জালিয়াতি ও অবৈধ অভিবাসনের ঘটনায় অন্তত ২৩টি দেশের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে থাইল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়া, চীন, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, পাকিস্তান, মিসর, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, মেক্সিকো, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, লিবিয়া, সাইপ্রাস, সৌদি আরব ও দক্ষিণ আফ্রিকা।

২০২১ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে বিভিন্ন ভিসায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী বিদেশ গেছেন। তবে বিমানে ওঠার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্নের পরও ইমিগ্রেশনে এসে নথিপত্রের জটিলতা, মানব পাচারের শঙ্কা, অবৈধ অভিবাসন ও নিরাপত্তার কারণে বহু যাত্রীর বিদেশযাত্রা আটকে যায়।

এসবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ২৬ লাখ ২২ হাজার ৭১১ বাংলাদেশী বিভিন্ন ভিসায় বিদেশে গেছেন। তবে নথিপত্রে অসংগতি কিংবা ইমিগ্রেশনের কড়াকড়ির কারণে এ সময়ে ৭ হাজার ৮১৯ যাত্রীকে বিমানবন্দর থেকেই ফেরত পাঠানো হয়। এর আগের বছর বিদেশ গমন করেন মোট ৫৭ লাখ ৮ হাজার ১৩২ যাত্রী। একই বছর আবার নানা জটিলতার কারণে বিমানবন্দরে আটকে দেয়া হয় ১৫ হাজার ৫১৬ জনের বিদেশযাত্রা।

বিগত বছরগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালে ৬৪ লাখ ২৮ হাজার ৯৩ বিদেশে গমন করেন। এ সময় দেশের বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয় ১৮ হাজার ৯ জনকে। ২০২৩ সালে রেকর্ড ৬৯ লাখ ৯২ হাজার ২৫৩ যাত্রী বিদেশে গেলেও ইমিগ্রেশন পার হতে ব্যর্থ হয়ে ৯ হাজার ৮৭২ জনকে ফেরত আসতে হয়। ২০২২ সালে বিদেশ যান ৫২ লাখ ৯৯ হাজার ৩১৩ যাত্রী। আর এ সময় সর্বাধিক ১৮ হাজার ৭৫৬ জনকে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়। ২০ লাখ ৬০ হাজার ৬৮৩ জন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যান ২০২১ সালে। ওই বছর আবার ১১ হাজার ৫২৮ বাংলাদেশীকে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয় বিভিন্ন কারণে। সব মিলিয়ে সাড়ে পাঁচ বছরে মোট ২ কোটি ৯১ লাখের বেশি বাংলাদেশী বিদেশে গেছেন। এর বিপরীতে নথিপত্রের ত্রুটি ও নিরাপত্তার কারণে মোট ৮১ হাজার ৫০০ জনের যাত্রা বাতিল করা হয় দেশের বিমানবন্দর থেকে।

ইমিগ্রেশন পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ইতালিতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের পারিবারিক ভিসা অনুমোদনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক অভিনব ও সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্র। ইতালীয় সরকারের দেয়া ভিসা সুবিধার সুযোগ নিয়ে চক্রটি ‘পেজ সাবস্টিটিউশন’ (পৃষ্ঠা প্রতিস্থাপন) কৌশলে ভুয়া ভিসা জালিয়াতি চালিয়ে আসছে। বিগত বছরে রেকর্ড ১২ হাজার ৫০০টি বাংলাদেশী পারিবারিক ভিসা দেয়া হয়েছে, যা একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ। এ সুযোগকেই হাতিয়ার বানিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র।

প্রথমে চক্রটি একজন প্রকৃত ভিসাগ্রহীতাকে ইতালিতে পাঠায়। ভ্রমণ সম্পন্ন হওয়ার পর প্রথম ব্যক্তির পাসপোর্টে থাকা ইতালীয় ভিসা, বাংলাদেশের ‘ডিপার্চার সিল’ এবং ইতালির ‘অ্যারাইভাল সিল’ হুবহু নকল করা হয়। ডেটাবেজের তথ্যের সঙ্গে মিল রাখতে জালিয়াত চক্রটি সম্পূর্ণ ভিসা পৃষ্ঠাটি কেটে ফেলে দ্বিতীয় একজন ব্যক্তির পাসপোর্টে প্রতিস্থাপন করে দেয়। দ্বিতীয় ব্যক্তির ছবি ও চেহারা প্রথম ব্যক্তির সঙ্গে মিলিয়ে বেছে নেয়া হয়, যাতে প্রথম দর্শনে কোনো সন্দেহ না জাগে।

পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) এক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ফ্রান্সে বসবাসরত এক বাংলাদেশী প্রায় ১০ হাজার ইউরো খরচ করে ভুয়া সুইস পাসপোর্ট বানিয়ে দেশে ফিরলে তা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে ধরা পড়ে। মূলত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আকারের চেয়ে পাসপোর্টটি বড় পাওয়ায় প্রাথমিকভাবে সন্দেহ হয়, পরবর্তী সময়ে ডিভাইস স্ক্যানিংয়ে বায়োমেট্রিক চিপের সংকেত না পাওয়া এবং বিভিন্ন ধাপের যাচাইয়ে শতভাগ নকল সুইস পাসপোর্টের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে সুবিধাজনক প্রবেশের উদ্দেশ্যে তিনি এটি তৈরি করেন বলে জানান।

এ কর্মকর্তা আরো জানান, দক্ষিণ আফ্রিকার জঙ্গল কিংবা লিবিয়ার জলপথ পেরিয়ে ইউরোপে প্রবেশের ট্র্যাজেডি এতদিন সংবাদের শিরোনাম হলেও নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলের তরুণদের একটি বড় অংশ এখন ব্রাজিল ও মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে পৌঁছার ঘটনা আমাদের নজরে এসেছে। ওই দুই জেলার বহু পরিবার আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে সেটেল্ড থাকায় স্থানীয় তরুণদের মধ্যে যেকোনো মূল্যে সেখানে পৌঁছার তাড়না রয়েছে। ৫০ লাখ টাকা খরচ করেও অনেকে এ পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। তাই ব্রাজিল ও মেক্সিকোয় প্রবেশের চেষ্টা করা বিদেশগামীদের বিষয়ে আলাদাভাবে নজর দেয়া হচ্ছে।

তবে কেবল জালিয়াতি করা ব্যক্তি বা দালাল চক্রকে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর। তার মতে, বিদেশগামী কর্মীর নথিপত্র যাচাই ও প্রাথমিক অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে বিএমইটি এবং বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর লেবার উইংয়ের যাচাইপ্রক্রিয়ায় আরো কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

বণিক বার্তাকে আসিফ মুনীর বলেন, বিদেশে শুধু কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধির মানসিকতা থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমন্বিত ও স্বয়ংক্রিয় তথ্য যাচাইকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে কালো তালিকাভুক্ত এজেন্সি, কোনো মিশন বা শ্রম চুক্তি না থাকা দেশ কিংবা সন্দেহজনক রুটের ক্ষেত্রে একটি ডিজিটাল অ্যালার্ট সিস্টেমের মাধ্যমে বিমানবন্দরে যাওয়ার আগেই ক্রস চেক সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। আর সেটি চালু হলে তা অসাধু চক্রের সুযোগ বন্ধ করে প্রকৃত ও নিরাপদ অভিবাসনের পথ শক্তিশালী করবে।

তবে সব ক্ষেত্রে জালিয়াতি নয়, বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও ভ্রমণে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে প্রথমবারের মতো থাইল্যান্ড ভ্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন তালহা রহমান। পাসপোর্টের সঠিক মেয়াদ, প্রয়োজনীয় ভিসা ও ভ্রমণসংক্রান্ত সব কাগজপত্র সঙ্গে থাকলেও ইমিগ্রেশন কাউন্টারে অস্বাভাবিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ক্ষিপ্ত হয়ে জানতে চান, ‘শিক্ষার্থী হয়ে প্রথম বিদেশ ভ্রমণে ভারত না গিয়ে কেন থাইল্যান্ড যাচ্ছেন?

যুক্তিসংগত কোনো কারণ ছাড়াই তাকে আটকে দিয়ে নেয়া হয় ইমিগ্রেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কক্ষে। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা তাকে প্রথম দফায় বিদেশ ভ্রমণে বাতিলের ইঙ্গিত দেন। তবে তালহা তার বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করা মাত্রই কর্মকর্তার মনোভাব বদলে যায় এবং তাকে বিমানে ওঠার অনুমতি দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়া ভ্রমণের সময়ও একই ধরনের জটিলতার সম্মুখীন হলে তিনি একই উপায় অবলম্বন করে পার পান বলে জানান।

‘পাওয়ারফুল কানেকশন’ থাকলে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া ভ্রমণ হওয়ায় আশিকুর রহমানের (ছদ্মনাম) কাছে বৈধ ভিসা, বিএমইটি ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় সব নথি থাকা সত্ত্বেও বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়। এ বিষয়ে তিনি জানান, ইমিগ্রেশন থেকে তাকে বিমানে উঠতে না দিয়ে পাসপোর্ট রেখে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিষয়টিতে ইমিগ্রেশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়। তাৎক্ষণিকভাবে ইমিগ্রেশন ইনচার্জকে ভিডিও কল দিলে তিনি আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বলেন, আরে ভাই, সরাসরি স্যারকে ফোন দেয়ার কী দরকার ছিল? যান, বিমানে ওঠেন।

অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচার রুখতে ইমিগ্রেশন পুলিশকে সক্রিয় রাখা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বর্তমানে আকাশপথের পাশাপাশি নৌপথেও নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়ছে। তাই অবৈধ অভিবাসন ও পাচার রুখতে ইমিগ্রেশন পুলিশকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় রাখা হয়েছে। যাত্রীদের আচরণ দেখেই মূলত বোঝা যায় কে আসলে কোথায় এবং কী উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন। ইমিগ্রেশন পুলিশকে সে ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তবে পুলিশকে টাকা দিয়ে পার পেয়ে যাওয়া কিংবা অন্যায্যভাবে আটকে দেয়ার যে অভিযোগগুলো উঠছে, তার মধ্যে কিছু বিষয় যে সত্য তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ বলেন, যে দেশেই কর্মী পাঠানো হোক না কেন, বিএমইটি যেন কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সঠিক যাচাই-বাছাই করেই ছাড়পত্রের অনুমোদন দেয়, যাতে কোনো কর্মীকে আবার দেশ থেকে বা বিদেশ থেকে ফেরত আসতে না হয়। যেসব দেশকে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছি, যেখানে অবৈধ অভিবাসন বা মানব পাচারের ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে বহির্গমন ছাড়পত্রের অনুমোদন দিতে বিএমইটিকে আরো অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে।

বিমানবন্দরে একটি যাত্রা থেমে যাওয়ার দৃশ্যের পেছনে তাই কেবল একজন যাত্রীর হতাশা থাকে না। থাকে একটি পরিবারের হিসাব, ধার করা অর্থ, বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা এবং কখনো কখনো কয়েক মাসের প্রস্তুতি। প্রশ্নটি এখন শুধু কতজনকে ফেরত পাঠানো হলো, তা নয়। প্রশ্ন হলো কেন তারা বিমানবন্দর পর্যন্ত এসে যাত্রা করতে পারলেন না, সমস্যাটি কোন পর্যায়ে তৈরি হয়েছিল এবং বিদেশযাত্রার পুরো প্রক্রিয়ায় সে ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করার সুযোগ ছিল কিনা।

অবৈধ অভিবাসন ও ভিসা জালিয়াতি রোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ও কাজ করছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। তিনি বলেন, বাস্তবতা হলো আমাদের মন্ত্রণালয় মূলত ডিমান্ড লেটার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলে লোকবলের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে। ভিসা যাচাইয়ের প্রকৃত অথরিটি বিএমইটিরও নেই। মাত্র চার-পাঁচটি দেশের ভিসা যাচাইয়ের অ্যাকসেস তাদের রয়েছে, বাকিগুলোর কোনো অ্যাকসেস নেই। এ সীমাবদ্ধতাকে অনেকে ব্যবহার করছে। নকল নথিপত্রে বহির্গম ছাড়পত্র দেয়ার সঙ্গে বিএমইটির কিছু অসাধু কর্মকর্তাও জড়িত, যারা চোখ বুজে ক্লিয়ারেন্স দিয়ে থাকেন। বিষয়টি আমারও দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এর আগে সার্বিয়াতে ভুয়া ভিসায় বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স দেয়ার একটি ঘটনা সামনে এসেছে এবং এরই মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, যেসব দেশকে আমরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছি যেমন সার্বিয়া, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও লিবিয়া—সেসব দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভিসা কঠোরভাবে ভেরিফাই করতে বলা হয়েছে। বিএমইটিতে পুরোপুরি ভিসা চেকিং সিস্টেম চালু করতে পারলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। যৌথভাবে ভিসা ভেরিফিকেশনের কাজটি সঠিকভাবে করার জন্য বিএমইটিতে ইমিগ্রেশনের একটি টিমকে বসানোর বিষয়ে আলোচনা করছি। শিগগিরই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।