আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হলো। কয়েক দশকের বাম ও তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী।
শনিবার (৯ মে) স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এ শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
এই দিন শুভেন্দুর পাশাপাশি শপথ নিয়েছেন আরও ৫ জন। তারা হলেন—দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক এবং ক্ষুদিরাম টুডু। শুভেন্দুর পর শপথ নেন দিলীপ ঘোষ। তার পর অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, ক্ষুদিরাম টুডু এবং নিশীথ প্রামাণিক।
রাজ্যপাল আর এন রবির উপস্থিতিতে শপথ নেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এরপর এগিয়ে গেলে তার পিঠ চাপড়ে অভিবাদন জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু জয়ী হয়েছেন ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম থেকে। খড়্গপুর সদর থেকে জয়ী হয়েছেন দিলীপ ঘোষ। আসানসোল দক্ষিণ থেকে জয়ী হয়েছেন বিধায়ক অগ্নিমিত্রা। বনগাঁ উত্তর থেকে জয়ী হয়েছেন অশোক কীর্তনিয়া, বাঁকুড়ার রানিবাঁধ কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন ক্ষুদিরাম টুডু এবং কোচবিহারের মাথাভাঙা থেকে জয়ী হয়েছেন নিশীথ প্রামাণিক।
এর আগে ছাদ খোলা গাড়িতে শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকে নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে আসেন মোদী। তিনি শপথ মঞ্চে উঠেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর দেশটির জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।

কড়া নিরাপত্তায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানস্থলে আগেই হাজির হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মঞ্চে ছিলেন—বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডু, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধরি, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবীশ, অগ্নিমিত্রা পাল, মিঠুন চক্রবর্তীসহ কেন্দ্র ও রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতারা।
বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী দলের ২০৭ জন জয়ী প্রার্থীর সঙ্গে শুক্রবার বৈঠক করে শুভেন্দুকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার পরিষদীয় দলনেতা ঘোষণা করেন বিজেপি নেতা অমিত শাহ। নিয়ম অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের পরিষদীয় দলনেতাই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন।
ভারতের যে কোনো রাজ্যে নির্বাচনের পর বিধানসভার পরিষদীয় দলনেতা বাছাইয়ের সময় কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের সেই রাজ্যে পাঠায় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। এ বার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রধান পর্যবেক্ষক করা হয়েছিল অমিত শাহকে। তার সঙ্গে সহকারী পর্যবেক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি। তাদের তত্ত্বাবধানে শুক্রবার বিকেলে কলকাতার নিউ টাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে নির্বাচিত বিধায়কদের বৈঠক হয়।
গত পাঁচ বছর ধরে বিধানসভায় প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীই ছিলেন রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের বিরুদ্ধে বিজেপির আন্দোলন সংগ্রামের প্রধান মুখ। রাজ্যে সন্ত্রাস, ‘অনুপ্রবেশ’, অবৈধ অভিবাসী, দুর্নীতিসহ নানা ইস্যুতে ‘ঝাঁঝালো’ মন্তব্য করে বারবার খবরের শিরোনাম হয়েছেন তিনি।
গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল হওয়া বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু প্রার্থী হয়েছিলেন ২০০৭ সালে কৃষক ‘বিদ্রোহের’ জন্য বিখ্যাত নন্দীগ্রাম ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত ভবানীপুর আসনে। দুটি আসনেই জিতেছেন তিনি। ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত হেভিওয়েট প্রার্থীকে হারিয়েছেন ১৫ হাজারের বেশি ভোটে।
এর আগেও ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু নিজের কেন্দ্র নন্দীগ্রাম থেকে মমতার বিরুদ্ধে লড়ে জিতেছিলেন ১৯৫৬ ভোটে। অর্থাৎ, পরপর দুইবার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে নির্বাচনে হারিয়ে শুভেন্দু নিজের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করেন।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৯৩টির ভোটের ফল জানা গেছে গত ৪ মে। এর মধ্যে ২০৭টিতে জিতে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
তৃণমূল ৮০টি আসনে জিতেছে এবং ৬টি আসন পেয়েছে বাম, কংগ্রেস ও অন্যান্য দলগুলো। রাজ্যের দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা কেন্দ্রে মে ২১ পুনর্র্নিবাচন হবে।

এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এবার বিজেপির গেরুয়া সুনামিতে ভেসে গেছে তৃণমূল কংগ্রেসের নীল দুর্গ। টানা ১৫ বছর ধরে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসকে ধসিয়ে দিয়ে ইতিহাস গড়েছে বিজেপি।
উল্লেখ্য, শুভেন্দু অধিকারী একজন ভারতীয় রাজনীতিবিদ, যিনি ভারতীয় জনতা পার্টির সদস্য। তিনি ২০২১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়াও, তিনি ২০২১ সাল থেকে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক এবং ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কাঁথি দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন।
তিনি এর আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবহন মন্ত্রী হিসেবে ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এবং ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সেচ ও জলসম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তমলুক লোকসভা কেন্দ্রের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং ২০২০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ভারতীয় পাট নিগমের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য এবং ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। তিনি শিশির অধিকারীর পুত্র, যিনি একজন সংসদ সদস্য এবং মনমোহন সিং সরকারের পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন।
শুভেন্দু অধিকারী ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭০ সালে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁকুলিতে মাহিষ্য ক্ষত্রিয় জনগোষ্ঠীর শিশির অধিকারী ও গায়ত্রী অধিকারীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। শিশির অধিকারী একজন রাজনীতিবিদ এবং দ্বিতীয় মনমোহন সিং মন্ত্রিসভায় প্রাক্তন রাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ২০১৯ সালে কাঁথি লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন। শুভেন্দু অধিকারী অবিবাহিত।
শুভেন্দুর ভাইদের মধ্যে একজন সৌমেন্দু অধিকারী কাঁথি পৌরসভার চেয়ারম্যান। দিব্যেন্দু অধিকারী, যিনি ২০১৯ সালে তমলুক লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন, তিনিও তার ভাই।
অধিকারী নেতাজি সুভাষ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার অব আর্টস (এম.এ.) ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি শহরের বাসিন্দা শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবন পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীঘার নিকটবর্তী এই অঞ্চল থেকে উঠে আসা অধিকারী পরিবার দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক পটভূমি মূলত কংগ্রেস ঘরানার। তার বাবা শিশির অধিকারী একসময় মেদিনীপুর জেলার প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা ছিলেন এবং পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। তৃণমূল গঠনের পর তিনি দলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বাবার পথ অনুসরণ করে শুভেন্দু অধিকারীও রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করেন কংগ্রেসের মাধ্যমে। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে তিনি কাঁথি পৌরসভার কাউন্সিলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন এবং দলের সংগঠনে দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেন।
২০০৬ সালে তিনি কাঁথি দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। ওই সময় থেকেই নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক পরিচিতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। শিল্পায়ন ও জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যা রাজ্য রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে।
২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি সিপিআই(এম)-এর প্রভাবশালী নেতা লক্ষ্মণ শেঠকে পরাজিত করে সাংসদ নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে তিনি পরিবহন ও সেচ দফতরের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি দলের যুব সংগঠনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তবে দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্য এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে ২০২০ সালে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগ করে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দেন। এরপর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন এবং রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অধিকারীর উত্থান পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। প্রশাসনিক ইস্যু, দুর্নীতির অভিযোগ, আইন-শৃঙ্খলা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে তিনি নিয়মিতভাবে শাসক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
তবে তার রাজনৈতিক জীবন বিতর্কমুক্ত নয়। বিভিন্ন সময়ে তার বক্তব্য ও অবস্থানকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিরোধীরা তাকে বিভাজনমূলক রাজনীতির প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করলেও সমর্থকরা তাকে পরিবর্তনের মুখ হিসেবে দেখেন।
সম্প্রতি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। একই সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব, উন্নয়ন ও রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও বৃদ্ধি পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 



















